কাকু, বন্যা আর ….

একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন দেখে প্রথমে ভাবলাম ধরবো না। ভাবলাম কোনো বিজ্ঞাপনের ফোন। একবার কেটে যাওয়ার পর আরেকবার বাজতে লাগলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তুলে বললাম – হ্যালো। ওপারের কণ্ঠস্বর বলে উঠলো – আমি কাকিমা বলছি রে!

গলাটা চিনতে বেশ কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো। তার মধ্যেই ভেসে উঠলো কত স্মৃতির বুদ্বুদ।

১৯৭৮-এর বন্যার প্রথম দিন।দমদমের মধ্যে মিউনিসিপাল অফিস লেন, রাষ্ট্রগুরু এভিনিউ – এগুলি উঁচু জায়গা। তাই সারা রাত বৃষ্টির পর সকালে বোঝা যায়নি কি ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি হতে যাচ্ছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যেই স্কুলে যাওয়ার জন্য বেরোনো হলো। বাসের জন্য অপেক্ষা না করে রিক্সা করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন অভিভাবক। বৃষ্টির ছাঁটের ভেতর দিয়ে টুকটুক করে এগোতে লাগলো রিক্সা। আর যেন গুহ রোড, মতিঝিল কোয়ার্টার, প্রাইভেট রোড – সব রাস্তাগুলি তখনি জলের তলায়। সব থেকে ভয়ঙ্কর অবস্থা বাগজোলা খালের সামনে। খালের জল রাস্তায় উঠে এসেছে। এক পাহাড়ি নদীর মতো স্রোতে বয়ে চলেছে বাগজোলা খাল দমদম রোডের উপর দিয়ে। কচুরিপানার উত্তরে উঠে দুটো জলঢোড়া সাপ সেই স্রোত বেয়ে চলেছে বিদ্যাধরীর দিকে। ঘোষপাড়ার খাটালগুলির ভেতর তখনি জল উঠে গেছে। গবাদি পশুগুলিকে নিরাপদ স্থান মানে বড় রাস্তায় সরানো শুরু হয়েছে। লোকজন অন্যত্র সরে গেছে আগেই।

স্কুলে পৌঁছুনোর পর দেখলাম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্কুল বন্ধ। স্কুলে বোধহয় রিলিফ ক্যাম্প খোলা হয়েছিল। আশপাশের নিচু এলাকার লোকেদের নিরাপদ আশ্রয় হয়েছিল আমাদের ক্লাসরুমগুলি।

ফেরার সময় একই ছবি – শুধু বন্যার ভয়ঙ্করতা যেন আরো বেড়ে গেছে। মাথায় বোঁচকা কোলে শিশু নিয়ে মানুষ চলেছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। দমদম রোড ধরে।

বাগজোলা র স্রোতের টান সাংঘাতিক বেড়ে গেছে এই মধ্যে কয় মিনিটে। রিক্সার ফুটবোর্ড অবধি জল উঠে গেছে। রিক্সাওয়ালা প্যাডেল চালানো বন্ধ করে স্রোতের ওপারে টেনে নিয়ে যেতে চেষ্টা করলেন আরোহীসমেত রিক্সা। ভদ্রলোকের অভিজ্ঞতা ছিল এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার। জপুরের দিকে নিয়ে গেলেন রিক্সাটা – রাস্তা ক্রস করে। তারপর উত্তরমুখী স্রোতের মধ্যে দিয়ে টেনে নিয়ে গেলেন। । স্রোতের টান এড়িয়ে ওপারে যাওয়া যাবে নাকি সবাই গিয়ে পর্বে খালের স্রোতে ? টানটান উত্তেজনায় দুটি শিশুকে জাপ্টে ধরে বসে থাকা সন্ত্রস্ত অভিভাবক।
শেষ পর্যন্ত খাল পেরিয়ে আমরা যখন ওপারে পৌছুলাম তখন স্রোতের টানে রাস্তার ডানদিকের রিক্সা বাঁদিকে – মানে ওয়েস্ম্যান কারখানার গেটের সামনে !!

চিরদীপ-রা থাকতো পাশের পাড়ায়। পড়তো আমাদের ক্লাসের অপর সেকশনে। স্কুল জীবনের একটা বড় সময় আমরা একসাথে যাতায়াত করেছি। ওর মা বাবা আর আমার মা বাবা ভাগ করে এই পৌঁছে দেওয়া আর নিয়ে আসার দায়িত্ব পালন করতেন।

তারপর অনেকদিন স্কুল বন্ধ ছিল। আমরা এমএম ঘোষ রোডে একজনের বাড়িতে যেতাম। জল নেমে যাওয়ার পর তাদের বাড়ির প্রায় একতলার ছাদের সমান সমান দেখেছিলাম জলের দাগ। তাহলেই ভিজতে পারবেন কতটা ভয়াবহ ছিল ‘৭৮-এর বন্যা।

মনে পরে যে স্কুল খোলার পর অনেক অভিভাবক ব্রাদারদের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এই স্কুলে রিলিফ ক্যাম্প করতে দেওয়ার জন্য। যেমন সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ হয় আর কি। কারণ আর কিছু না – শরণার্থীরা চলে যাওয়ার পর ক্লাসগুলি অপরিচ্ছন্ন হয়ে ছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ পরিষ্কার করতে দুদিন সময় নিয়েছিলেন। এই সব কথার দৃঢ় প্রতিবাদ করতে দেখেছিলাম চিরদীপের বাবা – মানে কাকুকে। সেই দিনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে আমার অন্য বন্ধুদের মা বাবাকে বোঝাতে চেষ্টা করছিলেন মানুষের কর্তব্য। পেরেছিলেন কি না জানি না।

তবে আমি অনেক কিছু জেনেছি ওনার কাছ থেকে। এই যাওয়া আসার ফাঁকে। রিক্সার মধ্যে কথপোকথনে। একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব ব্যাপারটা বোঝাচ্ছিলেন কাকু । শেক্সপিয়ার খুব ভালো সাহিত্যিক – কিন্তু ওনার ভূতের বিশ্বাস, অলৌকিকে আস্থা – এগুলি কে শুধু রূপকার্থে নিতে হবে – তার সময়ের প্রতিফলন হিসাবে দেখতে হবে। এই দুধ আর জল আলাদা করে চিনতে পারাই আসল সাংস্কৃতিক বিপ্লব।

কাকু মারা গেছেন প্রায় বছর দুয়েক।চিরদীপের সাথেও যোগাযোগ নেই বললেই হয়। আজ কাকিমার ফোনটা সেই বর্ষার দিনটার করিয়ে দিলো।

 

(Representative Image:  Source:http://www.thehindu.com/todays-paper/tp-national/tp-newdelhi/haryana-demands-action/article513070.ece)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s