কার্সিভ হ্যান্ড রাইটিং

বাড়িগুলি এতো উঁচু হতো না তখন। মানুষের বুক পকেটে থাকতো ঝর্ণা কলম।
হাতে কলমে – ধাপে ধাপে – স্টেপ বাই স্টেপ – এমনই ছিল আটপৌরে জীবন।

দুটো নীল সমান্তরাল লাইন । মাঝে একটু ফাঁক। তাদের দুদিকে একটু বেশি দূরত্বে সমান্তরাল দুটি লাল রেখা। এই প্যাটার্ন সারা পাতা জুড়ে। স্কুলের ভর্তি হওয়ার পর নতুন বই খাতার লিস্ট মিলিয়ে যে জিনিসগুলি এলো – তার মধ্যে ছিল এই অদ্ভুত খাতা – পরিভাষায় হ্যান্ড রাইটিং এক্সারসাইজ বুক। ইংরেজি হাতের লেখা মকশো করার জন্য। তার সাথে শিখলাম নতুন একটা শব্দ – কার্সিভ রাইটিং

ছোট হাতের অক্ষর নীল লাইনের মাঝ বরাবর। বড় হাতের অক্ষর ছোঁবে উপরের লাল লাইন আর ‘লুপ’ যুক্ত অক্ষরগুলি ছোঁবে নিচের লাল দাগ। ছোট হাতের অক্ষর দিয়ে শুরু শব্দগুলির আগে থাকবে একটি নাতিদীর্ঘ ‘স্ট্রোক’। শব্দগুলি হেলে থাকতো ডান দিকে। অক্ষরগুলি থাকতো একে অপরের হাত ধরে। যেমন আমরা থাকতাম যৌথ পরিবারে – সুখ দুঃখে একে অপরকে ছুঁয়ে।

পাড়ায় খেলার সাথীরা হাসতো – হাতের লেখার পরীক্ষা। কিন্তু সত্যি – হাতের লেখার পরীক্ষা হতো, নম্বর নয়, গ্রেড দেওয়া হতো। কিন্তু একদিন পরীক্ষা হতো। একটু উঁচু ক্লাসে হাতের লেখার পরীক্ষা হয়তো হতো না, কিন্তু পরিষ্কার খাতা আর ভালো হাতের লেখার জন্য আলাদা নম্বর পাওয়া যেত। ঠিক মনে নেই, বোধ হয় ক্লাস ফোর বা ফাইভ হবে। পেন দিয়ে লেখার অনুমতি পাওয়া গেলো। তার আগে শুধু পেন্সিল দিয়েই লেখা চলতো। তাও ফাউন্টেন পেন। বল পয়েন্ট পেন (আমরা বলতাম ডট পেন) – নৈব নৈব চ। পেন্সিলে লিখলে হাতের লেখা ভালো হয়।

ক্লাস চলার সময় নিজেদের মধ্যে কথা বলার উপর ছিল কড়া নিষেধাজ্ঞা। ধরা পড়লে শাস্তিও পেতে হতো। এক’শ বার লিখতে হতো “I shall never talk in class” – কার্সিভ রাইটিংয়ে। আরো একটা বাক্য “The quick brown fox jumped  slyly over a lazy dog” – আমাদের প্রায়ই লিখতে দেওয়া হতো কারণ এর মধ্যে ইংরেজি ভাষার প্রতিটি অক্ষর আছে। একটি বাক্য লিখলেই প্রতিটি অক্ষর লেখা অভ্যাস হতো।

আমার ঠাকুমা বিশেষ পড়াশোনা জানতেন না, কিন্তু অক্ষর জ্ঞান ছিল – শুধু বাংলার। চিঠি লিখতে পারতেন – মুক্তোর মতো হস্তাক্ষরে। হাতের লেখা ভালো করার জন্য উৎসাহ দিতেন। আমিও চেষ্টা করতাম। এক সময় লেখার অভ্যাস যেন নেশার মতো হয়ে গেলো। ক্লাসে ব্যবহার হয়ে যাওয়া পুরোনো খাতাগুলো থেকে ইরেজার দিয়ে লেখা মুছে আবার লিখতাম। কার্সিভে। শুধু প্রাকটিস করার জন্য আলাদা খাতা কেনা সমস্যা ছিল।

তারপর ধীরে ধীরে উঁচু ক্লাসে হাতের লেখার গুরুত্ব কমতে লাগলো আর এই পাগলামিটা কমে গেলো। ক্লাসের বন্ধুদের নিজের নিজের চরিত্র অনুযায়ী হাতের লেখার বিকাশ হতে থাকলো। কেউ লিখতো খুব খুদে খুদে অক্ষরে – কারো লেখা আবার বেশ বড়।কিন্তু জয়ন্তদীপের হাতের লেখার কথা এখনো মনে পরে। ক্লাস সেভেন বা এইটে আমাদের স্কুল ছেড়ে ও অন্য স্কুলে চলে যায় কিন্তু রেখে যায় তার অসম্ভব সুন্দর কার্সিভ রাইটিং-র স্মৃতি।

আমার হাতের লেখা খুব একটা বদলায়নি- যেমন আমার চেহারা । প্যাটার্নটা একই আছে। শুধু অক্ষরগুলির উচ্চতা কমে গেছে জীবনের ঘষ্টানি খেয়ে। অনেকদিন বাদে কার্সিভ রাইটিংয়ের কথা এক আলোচনায় শুনতে পেলাম সেদিন। একজন বিশেষজ্ঞ বলছিলেন – অটিজমের মত সমস্যা আছে যে বিশেষ শিশুদের, তাদের কার্সিভ শেখানো হলে কগনিটিভ ফ্যাংশনের উন্নতি হতে পারে। আবার মনে পড়লো – পপুলার লাইব্রেরি থেকে কেনা নীল লাল লাইন টানা খাতা – ব্রাউন পেপারের মলাট, কোনের ক্লাসরুম আর সেই কার্সিভ হ্যান্ড রাইটিং।

One comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s