ডাক্তারের খপ্পরে

এই বছরের প্রথম ছ’টা মাস বাড়ি- হাসপাতাল- ডাক্তারের চেম্বার – ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করতে করতেই কেটে গেলো। জানি না ডাক্তারবাবু পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনা নিয়েছেন কি না – তবে এখনো হিসাবের খাতা দেখাচ্ছে ‘ওয়ার্ক ইন প্রগ্রেস’। ওদিকে ক্যাশ ব্যালেন্স প্রায় নেগেটিভ !!
এর মাঝে এসে গেলো ডক্টর্স ডে – পয়লা জুলাই। হানি সিং থেকে নিমপাতা খান সকালেই তাদের চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে – তাদের সুস্থ করে তোলার জন্য। দুর্ভাগ্যবশত আমি এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছতে পারিনি – তাই ‘থ্যাংক্যু’-টার ডিউ স্লিপ দিয়ে আপাতত কটা ডাক্তারি রসিকতা শোনাই।
খুব পুরোনো গল্প – কখন ডাক্তার বিধান রায় – কখনো ডাক্তার নীলরতন সরকারের নামে চালানো হয়েছে। ডাক্তারবাবু একদিন এক রোগীর বাড়ি গেছেন কলে। রোগীর শারীরিক ও আর্থিক – দুই অবস্থাই সঙ্গিন। ঘরের মধ্যে দারিদ্রের চিহ্ন সর্বত্র। কিন্তু বাড়ির বাইরে অস্পষ্ঠ বোর্ড দেখা যাচ্ছে – ডাক্তার অমুক চন্দ্র অমুক – এল এম এফ প্রখ্যাত চিকিৎসক। আমাদের ডাক্তারবাবু রোগী দেখে বেরিয়ে আসছেন এমন সময় বাড়ির গিন্নি ময়লা শাড়ির আঁচল থেকে ততোধিক ময়লা কটি টাকা বের করে ভিজিট দিতে গেলেন – কিন্তু ডাক্তারবাবু সেই ভিজিট প্রত্যাখান করে ওনার হাতে প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে সোজা বেরিয়ে এলেন ও গাড়িতে উঠে বসলেন। এই পুরো ব্যাপাটা ঘটে যাওয়ার পর ডাক্তারবাবুর সহকারী ফেরার পথে জিজ্ঞেস করলেন – “ভিজিট নিলেন না? ”
ডাক্তারবাবু বললনে- “হ্যা, দেখলেই তো – একে তো খুব খারাপ আর্থিক অবস্থা তার উপর উনিও ডাক্তার, একি পেশার মানুষ। তাই থাকে।”
সহকারী কিঞ্চিৎ বিরিক্ত হয়েই উনি সেই আদ্যিকালের এলএমএফ – হাতুড়ে ছাড়া কি ? এদের কি চিকিৎসক বলা যায় ?
ডাক্তারবাবু মাথা নেড়ে জবাব দিলেন – “খুব বেশি ফারাক নেই হে – আমরা রোগীদের হত্যা করি আর ওনারা রোগীদের মরতে সাহায্য করেন।”
ডাক্তারদের সাথে সাধারণত মানুষের সম্পর্ক হয় অসুখ করলেই। তবে ডাক্তারদের সাথে সম্পর্ক হওয়ার ফলে অসুস্থ হয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা খুব বেশি মানুষ বলতে পারবে না। আমার সেই অভিজ্ঞতা হয়েছিল ২০০৭ সালে ডাক্তারদের এক সর্ব ভারতীয় কনফারেন্স আয়োজন করার দুর্ভাগ্য স্বরূপ। সত্যি কথা বলতে কি তারপর থেকে আর নোবেল প্রফেশন ট্রফেশন এই সব কথার খুব একটা মূল্য নেই আমার কাছে। সেই গল্প এক দিন পরে হবে।
নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি – এক রাজমিস্ত্রি আরেক রাজমিস্ত্রির কাজের খুঁত বের করবেই। ডাক্তাররাও সেইরকম। পাশাপাশি পাড়ায় দুই ডাক্তারবাবুর প্রাকটিস। এক প্রতিবেশী একজনের চেম্বারে এসেছেন।
এতদিন ডাক্তার ক-কেই দেখছিলাম। তবে গতমাসে দেখলাম আমার উল্টোদিকের বাড়ির চ-বাবু মারা গেলেন নিউমোনিয়ায়। কিন্তু ডাক্তার বাবু ওনার টাইফয়েডের চিকিৎসা করছিলেন। তারপর ভাবলাম আপনাকে দেখাই।
এই কথা শুনে ডাক্তারবাবু বললেন – “শুনুন, আমি আপনাকে একটা গ্যারেন্টি দিতে পারি। আমি যদি আপনার নিউমোনিয়ার চিকিৎসা করি, তবে আপনি নিউমোনিয়ায়তেই মরবেন। ”

আরেক রোগী অনেকদিন হলো ডাক্তারবাবুর চেম্বারের চরকি কাটছেন। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা হলো কিন্তু রোগ কিছুতেই ধরা পড়ছে না। রোগীও বিরক্ত – ডাক্তার ততোধিক বিরক্ত। সে দিন একতারা রিপোর্ট নিয়ে রোগী এলেন চেম্বারে। ডাক্তারবাবু অনেকক্ষণ রিপোর্টগুলো দেখে চলেছেন। এই দুঃসহ নীরবতা ভেঙে রোগী প্রশ্ন করলেন – “ডাক্তারবাবু আমার কি হলো – কখন বোঝা যাবে?”
শানিত জবাব এলো “পোস্ট পোর্টেমের পর। ”

এই গল্পটা নিশ্চই কাল্পনিক। তবে তার থেকেও ভয়ঙ্কর কাল্পনিক গল্প আছে। প্রায় আষাঢ়ে।
ডাক্তার রোগীকে ফোন করেছেন।
“আরে শ্যামালবাবু আমি আপনার বাতের চিকিৎসা করার জন্য যে চেকটা দিয়েছিলেন, সেটা ব্যাংক থেকে ফেরত এসেছে ”
শ্যামালবাবু উত্তর দিলেন “সে তো হবেই আপনার চিকিৎসার পর বাতের ব্যাথাটাও যে ফেরত এসে গেছে !!”

ডাক্তার রোগীর সম্পর্ক অনেকটা টম-জেরির মত। সম্পর্ক রাখতেও হবে আবার এই সব খিচখিচও চলতে থাকবে। দমদমের এক ডাক্তারবাবুর চেম্বারের বাইরে লেখা দেখেছিলাম –
“হে প্রভু! আমার অমোঘ পরিস্থিতি / মানুষ অসুস্থ হলেই আমার পেশা চলে “

One comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s