প্রেমচন্দ, দানসাগর আর আমাদের শিল্প সুকৃতি

এম এম ঘোষ রোডে আমরা একটা বাড়িতে ভাড়া ছিলাম। ছিলাম মানে হয় মাস ছয়েক হবে। কিন্তু বাড়ির মালিকদের সাথে প্রায় তিন দশকের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সত্তরের আশির দশকে সেই বাড়ির ছেলে, যাকে আমি মামা ডাকতাম, স্বপ্ন দেখতো – নাটকের মাধ্যমে বড় হবে।

 

সেই সময়টা খুব গোলমেলে। বাণিজ্যিক থিয়েটার আর অন্য ধারার গ্রূপ থিয়েটার নিজেদের নিজেদের দর্শক তৈরী করে ফেলেছে। কিছু লোক আবার দুই রকম নাটক দেখতে ভালোবাসে। শ্যামবাজার পাড়ার হলগুলিতে ভাটার টান লাগতে তখনও কিছুটা বাকি আছে। বিশ্বরূপায় রমরমিয়ে চলছে ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’। বিবিধ ভারতীতে নাটকের বিজ্ঞাপন বাজছে। দক্ষিণের তপন থিয়েটারে চলছে নহবত। এছাড়াও রঙ্গনা, ষ্টার থিয়েটারে জমিয়ে অভিনয় হচ্ছে ‘সমাধান’-এর মতো নাটক।

 

ওদিকে নান্দীকার, বহুরূপীর প্রোডাকশনগুলি ছাড়াও পঞ্চম বৈদিকের ‘নাথবতী অনাথবৎ’ -এর মতো ফর্ম ভাঙা নাটকও জনপ্রিয় হচ্ছে। দমদম থেকে দু’বার বাস বদলে লোকে মুক্তাঙ্গনে ‘পাতা ঝরে যায়’ – দেখতে যেত।

 

সমস্যা প্রথম বোঝা গেল সারকারিনায়। দর্শক টানার জন্য মিস শেফালির ক্যাবারে জুড়ে দিতে হলো নাটকে। খবরের কাগজের দ্বিতীয় পাতায় সিনেমার সাথে ছাপা হতো নাটকের বিজ্ঞাপন। তাতে সরকারিনার বিজ্ঞাপনে একটা বৃত্তের মধ্যে ইংরেজি ‘এ’ লেখা থাকতো। আমরা তখন বোধহয় ফাইভে পড়ি। স্বপ্নাদি ক্লাসে পুং লিঙ্গ – স্ত্রী লিঙ্গ পড়াচ্ছেন। প্রশ্ন করলেন “সম্রাটের স্ত্রীলিঙ্গ কি হবে?” অতি উৎসাহে বিশ্বেন্দু মন্ডল দাঁড়িয়ে উঠে বললো – “আমি জানি মিস ! সম্রাটের স্ত্রীলিঙ্গ হলো সুন্দরী !” ‘সম্রাট ও সুন্দরী’ নাটকের বিজ্ঞাপন অপ্রাপ্তবয়স্কদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

 

সংস্কৃতি মনস্ক হওয়ার সাথে সাথে ‘আপওয়ার্ডলি মোবাইল’ বাঙালি মধ্যবিত্তের মধ্যে ফাউ হয়ে উদয় আনুসাঙ্গিক উন্নাসিকতা। শ্যামবাজারে থিয়েটার দেখা খুব ঘৃণ্য একটা কাজ হিসাবে মনে করা হতো সেই সব সমাজে। আমার এক মামাতো দিদির বিয়ের সম্মন্ধ যে পরিবারে হলো, তারা আবার সংস্কৃতিবান হওয়ার অহংকার মাদুলি করে চলতেন। সাথে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ আধিকারিকের ঘরণী হওয়ার সুবাদে আমার হবু জামাইবাবুর দিদির হাঁটাচলা মাটির ইঞ্চি দু’য়েক উপর দিয়েই হতো। আমার দিদি সারা জীবন আসাম আর উত্তর বঙ্গে কাটিয়েছে। কলকাতার হাল-হাকিকত ভালো জানতো না। আর আমাদের বাড়িতে বাইরের কোনো আত্মীয় এলেই তাকে নিয়ে থিয়েটার দেখার রেওয়াজ ছিল। তাই দিদিকে নিয়ে আমরা একদিন স্টারে সমাধান নাটক দেখতে গেলাম। পরের দিন মেয়ে দেখতে এসে সেই ভদ্রমহিলা একথা-সেকথায় যেই শুনলেন যে আমরা শ্যামবাজারে থিয়েটার দেখি, এমন মুখ বাঁকালেন যে আমরা ভাবলাম সম্মন্ধ বোধয় কেচেই গেলো। রামকৃষ্ণ ভাবধারায় দীক্ষিত আমার সেই দিদি কিন্তু গিরিশ ঘোষ, বিনোদিনী আর যুগপুরুষের প্রসঙ্গ বলে উঠতে পারেনি সেদিন। আর সেই পরিস্থিতিতে পারা সম্ভবও ছিল না তার পক্ষে। যাই হোক সেই সমন্ধ থেকেই বিয়ে হয়েছিল – কিন্তু আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি আরো একটু ভারী হয়েছিল।

 

গিরিশ ঘোষ বলতে বাগবাজারের গিরিশ মঞ্চের কথা মনে আসে। আমার বন্ধু রুবনের ভাই যখন গিরিশ মঞ্চের পাশের দোকান দিলো, তখন অনেক নাটকের টিকিট কেটে রাখতো। ‘দায়বদ্ধ’ এখানেই দেখেছি। গিরিশ মঞ্চ বলতে আর একটা অভিজ্ঞতার কথা মনে পরে। বাদল সরকারের ‘ভোমা’ আর ‘হা হা হাহাকার’ এখানেই দেখেছিলাম। আমাদের পাশেই বসে নাটক দেখছিলেন গৌরকিশোর ঘোষ। নাটক শেষ হতে তিনজন অভিনেতা ও স্বয়ং বাদল সরকার একটা চাদর চারদিকে ধরে দর্শকদের মধ্যে ঘুরলেন। যে যা পারলো টাকা পয়সা দিলো – সেটাই টিকিটের দাম !!

 

ভালো নাটক দেখার সুযোগের অভাব হয়নি কখনো। এই মধ্যমগ্রামেও যেখানে পচ্ছন্দসই চাপাতা পাওয়া যায়না বলে নাগেরবাজার ছুটতে হয়, সেখানেও কিন্তু নাটক দেখার দেদার সুযোগ। সারা বছর আর বিশেষ করে শীতকালে সারা ভারতের আর এমনকি বাংলাদেশের নামী গ্রূপগুলির প্রযোজনা দেখা যায়।

 

আবার আগের কোথায় ফিরে যাই। শুরুর আগেও তো একটা শুরু থাকে! আমাদের সেই বাড়িওলার ছেলে, যাকে আমি মামা ডাকতাম, একটা গ্রূপে নাটক করতে শুরু করলো। দলের নাম ‘থিয়েটার কমিউন’। সেই মামার বদান্যতায় প্রচুর নাটক দেখেছি। ‘পরবর্তী বিমান আক্রমণ’, ‘জুলিয়াস সিজারের শেষ সাত দিন’, ‘দানসাগর’।

 

অনেক পরেও দানসাগর আরেকবার দেখেছি। বাঙালি দর্শকদের কাছে প্রেমচন্দকে পরিচয় করিয়েছিল এই নাটক। স্ত্রীর সৎকারের জন্য তোলা চাঁদা দিয়ে মোচ্ছব করা অন্ত্যজ মানুষগুলির দানসাগর হয়ে ওঠার গল্প। পেঁয়াজের মতো পরতে পরতে উন্মোচিত হয় মানুষের মনস্তত্বের গভীর অন্ধিসন্ধি। সেগুলিই জ্যান্ত হয়ে ওঠে স্টেজের আলো আঁধারিতে। অন্ত্যজ আর সুবিধাভোগী মানুষের সামাজিক আর মানসিক অবস্থানের সুক্ষ টানাপোড়েনে বোনা হতে থাকে গল্প। বিহার ইউপি-র চামারটোলার সাথে বিনিসুতোয় সম্পর্ক তৈরী হয় দর্শকের। একটি ছেলে দর্শকের মধ্যে বসে কখন হয়ে যায় মাধো কখনও ভিখিরি আবার কখনো জমিদার।

 

বহু বছর বাদে একবার হায়দ্রাবাদ থেকে ফিরছি। ট্রেনের সহযাত্রীদের সাথে কথায় কথায় সিনেমা থিয়েটার নিয়ে কথা উঠলো। কথা উঠলো থিয়েটার কমিউনের। নামটা শুনেই ভদ্রলোক কিছুক্ষণ থম মেরে গেলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন – ‘আমাকে চিনতে পারছো না? আমিই তো জুলিয়াস সিজার’ !!

 

সঙ্গের ছবি দানসাগর নাটকের বিজ্ঞাপন (সংগৃহিত) আর প্রেমচন্দের বার্ষিকীতে গুগুল ডুডুল।
296914_477410445616010_1127186961_n
Picture1

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s