আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের উত্তরাধিকার ও কিছু প্রশ্ন

জীবনে কোনোদিন কেমিস্ট্রিতে ৪৮-এর বেশি নম্বর পাইনি। তবু অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে পড়লাম ভারতের অন্যতম পথিকৃৎ রসায়নবিদের হাতে তৈরী প্রতিষ্ঠানের সাথে। আমার এক বৌদি বেঙ্গল কেমিক্যালের ফিনান্স কন্ট্রোলার হয়ে দায়িত্ব নিলেন।  সেই সময়ই কাকতালীয়ভাবে কেন্দ্রীয় সরকার কারখানার কর্মীদের একটা বকেয়া পাওয়না মঞ্জুর করলেন।  টাকার অঙ্কটা প্রায় কয়েক কোটি।  সারা ভারতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মীরা বকেয়া পাবেন। প্রত্যেক কর্মীর পাওনা  হিসেবে করে দিতে হবে।

সংস্থায় একটি ইডিপি (electronic data processing) বা কম্পিউটার বিভাগ আছে।  সরঞ্জামের কোনো অভাব নেই।  কিন্তু সেখানে যারা কাজ করেন – তারা এক কথায় অলস ও  অপদার্থ।  কি ভাবে চাকরি পেলেন ও কিভাবে সেই চাকরি করে চলেছেন সে এক  রহস্য।  যাই হোক সেই কম্পিউটার কেন্দ্রের কর্তা হাত তুলে জানিয়ে দিলেন যে এই পাওনা  হিসেবে করা তার আয়ত্তের বাইরে।  সুতরাং external vendor নিয়োগ করে outsourcing করে যেন কাজটা করিয়ে নেওয়া হয়।

আমি তখন একটি সফটওয়্যার সংস্থায় কাজ করি।অভিজ্ঞতা খুব কম। বড় কাজের খবর পেয়ে  কাজের জন্য কোটেশন জমা দিলাম।  (কি কুক্ষনেই !!)  তারপর পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার শেষে অর্ডার পেলাম।  বিশেষভাবে খেয়াল রাখবেন – টেকনিক্যাল ব্যাপারে কথা বললেন মানব সম্পদ বিভাগের কর্মীরা আর টাকাপয়সা নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করলেন সেই ইডিপি ইন-চার্জ !!

পুরোনো বছরের মাইনের তথ্য দিয়ে সাহায্য করবেন – এমন প্রতিশ্রুতি  দিলেন সেই ইডিপি’র ভদ্রলোক।  সেই হিসাবে আমাদের ডাটা এন্ট্রি কম করতে হবে এমন বুঝেই আমরা নিজেদের আর্থিক চাহিদাটা কমিয়ে ওনাদের দাবি মেনে পুনরায় কোটেশন জমা করলাম।

তারপর যা হওয়ার তাই হলো কাজ করতে গিয়ে ল্যাজে গোবরে অবস্থা।  প্রচন্ত প্যাচানো লজিক।  এক্সেপশনের ছড়াছড়ি। পাঠকের যদি প্রোগ্রামিং সম্পর্কে সামান্য ধারণা থাকে তাহলেই  বুঝতে পারবেন কি বাঁশ কাজ ! আর সর্বোপরি সেই প্রতিশ্রুত ডাটা বা তথ্য – পুরো ভুলে ভরা – আর অর্ধেক করাপ্ট।  ফলে পুনরায় এন্ট্রি করে আমাদের কাজ করতে হলো।

এদিকে ম্যানেকমেন্ট (মানে আমার বৌদি) সিটু ইউনিয়ন-কে একটা তারিখ দিয়ে দিয়েছেন – যার মধ্যে বকেয়া পাওনা কর্মীদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে।  এখন ২০১৬ সালে বললে লোকে কতটা বুঝবে জানি না।  সেই সময় ২০০২-৩ সালে একটা লাল শালুর উপর সিটু লিখে রোগীকে সকালবিকেল দুবার দেখলেই দুই দিনে ডিসেন্ট্রি – ডায়রিয়া বন্ধ হয়ে যেত – আর কারখানা তো সামান্য জিনিস।

দুপুরে সাবসিডাইজড ক্যান্টিন থেকে লাঞ্চ সেরে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে দুজন নেতা আমাদের কাছে এসে কাজের খোঁজ খবর নিতেন আর হালকা করে বলে যেতেন সময় মতো পাওনা না পেলে কি কি হতে পারে।  সাথে কিছু ইতিহাস চর্চা – এই আগের কোন ভেন্ডারের কি কি হয়েছে।  সাথে কান এঁটো করা হাসিটা থাকতো ফাউ।

এতো চাপ নিয়ে কোনো রকমে কাজটা শেষ করলাম।  কিছু ভুল এন্ট্রি হয়েছিল সেগুলো কারেকশন করার সময় দিলেন ইউনিয়ন ও ম্যানেজমেন্ট।  সেই সব ঠিক করে তিন মাস বাদে যখন পেমেন্ট পেলাম তখন দেখলাম লাভের গুড় পিঁপড়েতে খেয়ে চলে গেছে।

ওই কারেকশন করার সময় বেঙ্গল ক্যেমিকেলের মানিকতলা আর পানিহাটি কারখানা ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল।  একটা মানুষ নিজে মুড়ি খেয়ে কি পরিমান ত্যাগ স্বীকার করে এই সব সম্পত্তি বানিয়েছিলেন।  ওনার প্রতিভা নিষ্ঠা বা দক্ষতার বিষয়ে মন্তব্য করার স্পর্ধা নেই আমার।  কিন্তু যে দেশের মানুষগুলোর জন্য এই সম্পদ রেখে গেলেন তিনি – তা অপাত্রে দান বলেই মনে হয়।

প্রচুর প্রোডাক্টের মনোপলি ছিল সংস্থার।   যেমন আন্টি ভেনম বা সাপের বিষের ইনজেকশন।  সেই ইনজেকশন তৈরী হয় ঘোড়ার রক্তের সিরাম দিয়ে।  (ঘোড়ার শরীরে নির্দিষ্ট পরিমানে সাপের বিষ ঢুকিয়ে দিলে, ঘোড়ার রক্তে  বিষের আন্টি বডি তৈরী হয়) সেখানে আস্তাবলের জন্তুগুলির অবস্থা কি করুণ । বিঘের পর বিঘে জমি পতিত পরে আছে। আছে পুকুর – আমি জাম গাছের বাগান। অফিসের সময়ের মধ্যে কর্মীরা পুকুর ছিপ ফেলে মাছ ধরছে। আর মাসে মাসে মাইনে হয়ে যাচ্ছে !!

এই সময় আচার্য রায়ের লেখা ‘আ হিস্ট্রি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রি’ উল্টে পাল্টে দেখেছিলাম।  স্বদেশীয়ানাকে গুরুত্ব দিলেও, প্রফুল্লচন্দ্র কোনদিনই ‘দেশ-বিদেশ’ নিয়ে তেমন প্রতিবাদী হননি। প্রাচ্যবাদী এবং প্রতীচ্যবাদীদের তর্কে না ঢুকে তিনি বরাবরই বিজ্ঞান-গবেষণার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ বিজ্ঞান শিক্ষার পক্ষেই মত দিয়ে এসেছেন। তবে তিনি শিক্ষাকে ‘আত্মস্থ’ করার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের মতের প্রতিই তার সমর্থন ছিল। ভাষার কচকচিতে না ঢুকে বিজ্ঞান চর্চার ফল যেন দেশের  মানুষের কাজে লাগে – সেটাই ছিল তার উদ্দেশ্য।  লেখার ছত্রেছত্রে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর – নিজের  মতো করে চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ করেছেন।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই।  ঊনবিংশ শতকের শেষ এবং বিংশ শতকের শুরুতে নাম করা অনেক বিজ্ঞানীই ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজে। জগদীশচন্দ্র, চিকিৎসক নীলরতন সরকার, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ এমন অনেকেই। এই সমাজের কুসংস্কারমুক্ত মানসিকতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় উৎসাহ নিশ্চই এঁদের সাফল্যের পথে এগিয়ে দিয়েছিল। প্রফুল্লচন্দ্র ব্রাহ্ম সমাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেও নিজের মানসিকতাকে ভীষণভাবে বস্তুবাদী করে তুলেছিলেন। অন্য প্রমাণের কথা বাদ দিলেও বিদ্যাসাগরের প্রতি তাঁর টান এবং ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা এর উৎকৃষ্ট নির্দশন। স্বামী বিবেকানন্দের সহপাঠী ব্রজেন্দ্রনাথ ছিলেন আদ্যপান্ত বস্তুবাদী। তিনি তো ব্রাহ্ম ধর্ম ত্যাগই করেছিলেন বিজ্ঞানের জন্য। ফলে এই দুই মনীষীর প্রভাব প্রফুল্লচন্দ্রকে উপনিষদের মায়া সেভাবে বাঁধতে পারেনি। তাঁর রচনায় বার বার প্রকাশ পাচ্ছে বস্তুবাদের প্রতি আস্থা।

ভারতীয় সমাজের বিজ্ঞান চর্চায় যে অধঃপতন, তাকে তিনি যুক্ত করেছিলেন জাতিভেদ প্রথার সঙ্গে। সমাজের উচ্চবর্ণ যখন কায়িক শ্রমকে হীন মনে করতে শুরু করলো, মস্তিষ্কের চর্চাকে বিচ্ছিন্নভাবে মহান করে তুললো— তখনই শুরু হলো বিপর্যয়। নিম্নবর্ণের মানুষজন প্রচলিত কারিগরি ব্যাপারটা ঠিকঠাক চালিয়ে নিলেও যে কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতা ছিল তাদের মধ্যে। তার সাথে সংস্কৃত চর্চায় অব্রাহ্মণদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য পরিস্থিতি আরো ঘোরালো হয়ে উঠলো।  ফলে নতুন বিজ্ঞান তৈরি হলো না ভারতীয় সমাজে, থমকে রইলো প্রযুক্তি।

সুতরাং আজকের অবস্থায় দাঁড়িয়ে যে দলই প্রফুল্লচন্দ্রের উত্তরাধিকার দাবি করুক – ছাঁচে ফেলা তাকে খুবই মুশকিল। প্রচুর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।

তবে প্রশ্ন করবে কে – সেটাই আসল প্রশ্ন !!

 

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s