দেশান্তরের যাত্রী ও একটি ভাইরাসের গল্প

দিল্লি।  উপমহাদেশের মুকুটের কোহিনুর।  ইন্দ্রপ্রস্থ, সূর্যকুন্ড, সিরি, লালকোট হয়ে তুঘলকাবাদ, শাজাহানাবাদ, থেকে ব্রিটিশদের শাসন পেরিয়ে স্বাধীন ভারতের রাজধানী।  শহর – রাজধানীর গরিমা পেরিয়ে কিছু দূরেই কিছু ছোট ছোট গ্রাম যা ক্রমে শহরের শরীরে বিলীন হয়ে যাবে- উন্নয়নের অমোঘ নিয়মে।

এমনি একটি গ্রাম তিহার। দিল্লি থেকে খুব দূরে নয়। আমার এই গল্পটা যখন আপনারা পড়বেন তখন কোনো কিছুই প্রমান করার দায় আমার থাকবে না।  তবু ইতিহাসের ফুটনোটের মতো কোথাও লেখা থাকে এই বৃত্তান্ত।

আমি শিরিন।  এই তিহারেই আমাদের পাঁচ পুরুষের বাস। চাষাবাদ আর শহরে ছোটোখাটো ব্যবসা করেই গ্রামের মানুষের গ্রাসাচ্ছাদন হয়।  সবাই সাধারণ মানুষ – দেশ রাজনীতি – জাতি খুব একটা বোঝে না কেউ।  চারিদিকে শোনা যাচ্ছে যে সাহেবরা দেশ ছেড়ে চলে যাবে, তাতে আমাদের কি লাভ হবে সেটা খুব বেশি লোকের কাছে স্পষ্ট নয়।

তবু দেশ কাল রাজনীতির আঁচ আমাদের গ্রামেও পৌঁছে যায়।  সবার অলক্ষে।  প্রথমে কানাঘুষো তার পর গুজব আর শেষ পর্যন্ত দু’একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ বর্ষার মেঘের মতো ঢেকে দেয় আমাদের গ্রাম। দিল্লির পুরানো কেল্লা ও হুমায়ুন মক্বরার এলাকায় জমা হতে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতার কথা আমারও কানে যায়। গ্রামের কুয়োয় জল আনতে গিয়ে সমবয়সী মেয়েদের মুখে দেখতে পাই যেন অচেনা আতঙ্কের ছায়া।  সেই পানির মটকা নিয়ে দুলে দুলে চলা শরীরগুলি যেন   আজকাল অনেক সতর্ক – সজাগ।  আত্মরক্ষার জন্য যেন সদা প্রস্তুত। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ছোট অস্ত্র রাখতেও শুরু করেছে পোশাকের ফাঁকে।

শহরে ব্যবসা বা অন্যান্য কাজে যারা যায় তাদের মুখেই শোনা যায় নতুন নতুন শব্দ।  কিছুর মানে বুঝি – কিছু বুঝি না – কিন্তু  পরিবেশের গুমোট আবহাওয়াটা টের পেতে অসুবিধা হয় না আমাদের।   খুব ভালো করে বুঝতে পারি যে পরিবেশ বদলে যাচ্ছে – কোথাও যেন পাল্টে যাচ্ছে আসেপাশের লোকের চোখের দৃষ্টি, কথার নিহিত অর্থ।

বদ্রি আলম আমাদের গ্রামের বড় জোতদার। তার জমিতেই আমাদের ঘর। আমাদের পরিবারের অধিকাংশ কর্মক্ষম মানুষই আলম সাহেবের খিদমতে নিযুক্ত। একদিন আমার আব্বু এসে বাড়ির সবাইকে ডাকলেন।  আর এমন একটা খবর দিলেন যার আশঙ্কাতেই আমরা হয়তো দিন গুনছিলাম।  আলম সাহেব নিজের জমি জোত্ ছেড়ে পাকিস্তান চলে যাওয়া ঠিক করেছেন।  আমাদেরও তার সঙ্গী হতে হবে।

পরিবারের সামান্য জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়ার কথা বলে হাতে উল্টো পিঠে চোখ  মুছতে মুছতে উঠে গেলেন উনি।  আমরা সবাই পাথরের মতো বসে রইলাম।  কতক্ষন জানি না।

আলম সাহেবের ১৩০০০ বিঘের মত জমি আছে তিহারে।  সেই জমি উনি ডেপুটি কমিশনার রান্ধাওয়া সাহেবের সাথে বিনিময় করে নিয়েছেন।  রান্ধাওয়া সাহেব ও তার পরিবার অনেকটা জমে হারিয়েছেন মলতানে। এই বিনিময় তার ক্ষতিপূরণ। আমাদের জায়গায় মুলতান থেকে বিস্থাপিত হিন্দু শরণার্থীদের পুনর্বাসন দেওয়া হবে।  এমনটাই কথা আছে।

আমাদের সাথে চামার টোলা আর হরিজনটোলার প্রায় দুশো ঘর মানুষ।  তাদেরও জায়গা খালি করে দেওয়ার আদেশ এসেছে।  তাদের ঠিক কি হবে কীয় জানে না। এই অবস্থায় নিজের প্রাণ বাঁচাতেই সবাই ব্যস্ত।  অন্যের কথা কার ভাববার ফুরসৎ আছে ?

সময় ভালো নয়।  হিংসা দাঙ্গা চলছেই। সেই কথা মাথায় রেখে গ্রামের বুজুর্গরা ঠিক করলেন যে আমাদের পুরানো কেল্লার ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়াই উচিত হবে।  তারপর বড়ো কাফিলা তৈরী করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রওয়ানা দিতে হবে পাকিস্তানের দিকে।

এই খবর পৌঁছে গেল শান্তি দলের স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে।  তার এসে আমাদের কাছে খোঁজ নিতে শুরু করলেন।  আমরা যা জানতাম তাদের বললাম।  আমরা যে ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে চাই না – সেটাও জানালাম।  কিন্তু তাদের কথা শুনে তো আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।  সরকারি স্তরে নাকি এমন ভাবে নাগরিকদের এক দেশ থেকে আরেক দেশে বিনিময়ের কোনো কথাই  নাকি হয়নি। সুতরাং এমন কোনো বন্দোবস্ত হলে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। গ্রামের বড়োরা আবার আলম সাহেবের সাথে পরামর্শ করতে বসলেন।

এই ঘটনার  ঘটনার পর একদিন দেখলাম আমাদের গ্রামে স্বয়ং বাপুকে এনে হাজির করলেন সেই স্বেচ্ছাসেবকরা।  তার সঙ্গে ছিলেন নেহেরুজীর কন্যা ।  তারা আমাদের অনেক করে বোঝালেন নিজের জায়গা না ছাড়তে।

সুভদ্রা জোশি নাম এক স্বেচ্ছাসেবিকা বেশ কয়েকদিন আমাদের সাথে রাত কাটলেন – যাতে আমরা আস্বস্ত হই।  কিন্তু একই সাথে জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে তুলে দেওয়ার তোড়জোড় থেমে থাকলো না।  রোজই কোনো না কোনো প্রশাসনিক কর্তা এসে পাকিস্তান চলে যাওয়ার সুবিধা বোঝাতেন।  এরপর শুরু হলো সামাজিক ও ব্যবসায়িক নাকাবন্দী।  বাইরের লোকেরা তিহারে ব্যবসা করতে আসা বন্ধ করে দিলেন। দিল্লিতেও যেন কেমন করে এই কথা ছড়িয়ে পড়লো যে তিহারের লোকজনের সাথে কেউ যেন ব্যবসায়িক সম্পর্ক না রাখেন।  এই চাপের মধ্যে প্রায় প্রতিদিন গ্রামের বাইরে দু’চারটে ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকতো সারা দিন – আমাদের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার জন্যে।  নিয়ম করে।  প্রথম কিছুদিন কেউ গেলো না।

তারপর দু-একটি করে পরিবার ট্রাকে উঠতে শুরু করলো।  স্বেচ্ছাসেবকরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বললেন।  কিন্তু তিনি উষ্মা প্রকাশ করে বললেন “গ্রামবাসীদের তো আমরা নিজেরা গিয়ে থাকতে বলে এসেছি।  তার জায়গা ছাড়ছেন কেন?” হায়! তিনি নিজেও কি জানতেন (নাকি জানতেন না ) যে তার সরকারের একটি অংশ তার বিশ্বাসের ও মতবাদের সাথে একমত নয় !!

একটা শেষ চেষ্টায় স্বেচ্ছাসেবকরা বাপুর সাথে গ্রামবাসীদের আরেকটা বৈঠকের ব্যবস্থা করলেন।  কিন্তু বৈঠকের আগের রাতে রান্ধহওয়া সাহেব এসে আবার বুজুর্গদের সাথে দেখা করলেন।  আব্বুর  শরীর খারাপ থাকায় আমি তার হয়ে সাহেবকে সেলাম জানাতে গেলাম।

খুব আন্তরিকতার সাথে রান্ধাওয়া সাহেব সেদিন কথা বললেন।  তার কথাগুলি এখনো আমার কানে বাজে।  “আমাকে সরকারি নোকোর হিসাবে যদি বলতে  বলো – তো আমাকে বলতে হবে যে তোমরা থেকে যাও ।  কিন্তু তোমাদের দোস্ত, শুভচিন্তক হিসাবে যদি বলতে বলে – তো আমার রায় হবে যে তোমাদের পাকিস্তানে চলে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।  নেতারা যাই বলুন, তোমাদের নিরাপত্তা দেওয়া এই পরিস্থিতিতে বেশ মুশকিল। ”

পরের দিন বাপুর সাথে বৈঠক শুরু হওয়ার আগেই আধা গ্রাম ক্যাম্পের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলো।  সেই ভোর রাত থেকেই ট্রাকগুলো অপেক্ষা করছিলো আমাদের।

বাকি গল্পটা আমি ক্যাম্পে থাকাকালীন শুনি সুভদ্রার মুখে।  যার সাথে এই ক’মাসে আমার বেশ বন্ধুত্ব  হয়ে গিয়েছিলো।

পরে স্বেচ্ছাসেবকরা গিয়ে দেখে যে পুরো গ্রাম ঘিরে রয়েছে জবরদস্ত পুলিশি বন্দোবস্ত।  চকখড়ির গন্ডি দিয়ে এলাকাটা ঘিরে রাখা হয়েছে।  গ্রামের দলিত পরিবারগুলি সীমানার বাইরে বসে আছে। তাদেরও উৎখাত করে দেওয়া হয়েছে।  কর্তব্যরত আধিকারিককে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলে যে তার কিছু করার নেই।  খোদ গৃহমন্ত্রণালয় থেকে হুকুম এসেছে !!

সুভদ্রার শেষ কথাটা আমার এখনো মনে আছে।  বাপুর কাছে নালিশ জানাতে গেলে উনি বলেছিলেন ” আর কেন – এবার আমি মরে গেলেই হয়!

Taaza khwaabhi dashtan gar daagh haaye seena ra

Gaahe gaahe baaz khwaan en qissa-e-pareena ra

—— Maulana Mohammad Ayyub Surti Qasmi

Source: Works of Ishtiaque Ahmed and Anis Kidwai

Image : diaspora

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s