বাস, কর্মী ও অন্যান্য

প্রতিদিন সকালে রেডিওতে  স্থানীয় সংবাদ শুরু হওয়ার ছিল স্কুলের জন্য বের হওয়ার সময়।  মানে লাল দাগ – এর থেকে দেরী হয়ে যাওয়া মানে ৮.২০-র মধ্যে এসেম্বলিতে দাঁড়ানো মুশকিল হয়ে যাবে।   নাগেরবাজার` মোড় থেকে লীলা সিনেমা।  দশ পয়সার টিকিট।  রুট ৩০বি।    ১৯৭৫ – ৭৬  সালে দমদম রোডে মানুষ ছিল সীমিত।  কিন্তু সেই তুলনাতেও বাস  ছিল খুব কম।  রিক্সা ছিল – কিন্তু পারতে রিক্সায় ওঠা হত না।  একে তো বাস তাড়াতাড়ি যাবে আর ভাড়াও অনেক কম।

অদ্ভুত রুট ছিল এই ৩০বি। প্রতিদিন ঠেলাঠেলি – ভিড়। প্রতিদিন নামার সময় লোকের ভিড়ে পিঠের ব্যাগ আটকে যাওয়া।  ধস্তাধস্তিতে পালিশ করা বুটের দফারফা – গোজা শার্ট প্যান্টের উপরে – পুরো ঝড়ো কাকের মত চেহারা নিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে নেপালি দারোয়ানজিকে পেরিয়ে  ৮.১০-এর আগে বিশাল সবুজ গেট-টার ওপারে পৌছনো। এই ছিল দৈনন্দিন রুটিন।

বাসের কন্ডাক্টারকে কাকু বলার রেওয়াজ ছিল।  আর সেই কাকুদের চেষ্টা থাকত বাসে ওঠা থেকেই প্যাসেঞ্জারদের বাসের মাঝের দিকে পাঠানো। তাই তাদের মুখের বুলি ছিল “ভেতর দিকে ঢুকে যান! গেটটা খালি রাখুন!’  যত ভিড়-ই থাক তারা সব সময় বাসের মাঝখানে গড়ের মাঠ দেখতে পেতেন।

গেট খালি রাখার চেষ্টা-টা এখনো একই আছে।  কিন্তু এক গেট বিশিষ্ট বাস হওয়াতে তাদের বক্তব্য খানিকটা বদলে গেছে।  এখন বাসে উঠলে শুনতে পাই – “দাদা – পেছন দিকে এগিয়ে যান!”  এক এক সময় হাসি পায় – সত্যি তো, আমরা কি পেছন দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?

অল্প দুরত্বের যাত্রীরা কখনই ভেতরে ঢুকতে চান না।  তাই তাদের মুখেও কমন ডায়লগ- “ঢুকব না – সামনেই নামব !” তবে বৃষ্টির দিনগুলিতে কন্ডাকটারের এই সমস্যা খানিকটা সুরাহা হয় – কারন গেটে দাঁড়িয়ে কেউ-ই ভিজতে চায় না !

কন্ডাক্টার ভালো হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে।  খারাপ মানে যাত্রীদের সাথে ব্যবহার খারাপ করা, খুচরো নিয়ে ঝগড়া করা, সময় মত স্টপেজে না ডেকে দেওয়া, সুযোগ মত বেশি ভাড়া চাওয়া, ইত্যাদি।

আমাদের দেশের মত সারা পৃথিবীতেই ভালো খারাপ কন্ডাক্টার আছে।খারাপ কন্ডাক্টার হওয়ার উপযোগিতাও আছে।  সেটাই প্রথমে বলি।  কোনো এক দেশে এমন-ই এক  খারাপ কন্ডাক্টারকে কোনো ভয়ানক অপরাধের জন্য আদালত বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মৃত্যুদন্ডের বিধান দিলেন।  কিন্তু আদেশ কার্যকর করার সময় তাকে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে যতই শক দেওয়া হয়, কিছুতেই তার কিছু হয় না।  এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন?   উত্তরটি খুব সোজা। কারন আসামী ছিলেন  খারাপ বা ‘ব্যাড কন্ডাক্টার’ (অর্থাত বিদ্যুত পরিবাহী) তাই বিদ্যুত তাকে স্পর্শ করতে পারছিল না।!

এই পচা রসিকতার পর একটা দারুন অভিজ্ঞতার গল্প বলি। এক শীতের দিন  – পৌষ সংক্রান্তির আগেই হবে। হাওড়া থেকে নাগেরবাজারের মিনি বাসে উঠেছি।   কিছুক্ষণ পর এক বয়স্ক মহিলা উঠলো বাসে। কন্ডাক্টার ভাড়া চাইল – “মাসিমা টিকিট-টিকিট!” কি জানি কেন এই কথা শুনেই মহিলা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। “মাসি আবার কি ? দিদি বলতে পারো না? অসভ্য ছেলে কোথাকার!” যাই হোক, কন্ডাক্টার  তখনকার মত চুপ করে গেল।  কিন্তু সুযোগ এল একটু পরেই।  এক বিশাল জটাধারী সাধু  বসে উঠতেই – কন্ডাক্টার সবাইকে শুনিয়ে বলে উঠল – “আসুন আসুন জামাইবাবু – ঐখানে দিদির পাশে ফাঁকা সিটে বসে পড়ুন !!” সাধু মহারাজ এই অস্বাভাবিক আপ্যায়ন দেখে কি বুঝলো কে জানে – – তবে সহযাত্রীরা হেসে গড়িয়ে পড়ল!

কন্ডাকটারের সাথে  অম্ল-মধুর সংলাপের অভিজ্ঞাতা এই মহিলা বা অন্য অনেকের মত বহু বিখ্যাত লোকেরও হয়েছে বা হতে পারে।  যেমন ভুবন বিখ্যাত  বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোসের একবার হয়েছিল। প্রফেসর বোস সাধারণ জীবনযাপন করতেন।  বাসে চলাফেরা করতেন।   একবার বাস থেকে নামার সময়, তার পাঞ্জাবির পকেট আটকে গেল বাসের হ্যান্ডেলে।  কিছুতেই ছাড়াতে পারছেন না – এদিকে ওনার নামার স্টপেজ প্রায় ছেড়ে যায়।  শেষে কন্ডাকটারের  সাহায্যে কোনক্রমে পকেট ছাড়িয়ে চলন্ত বাস থেকে নামতে পারলন।  নেমেই চলন্ত বাস থেকে কন্ডাকটারের সুভাসিত শুনতে পেলেন – “এত বয়স হয়ে গেল, এখনো ব্রেনটা ঠিকমত খাটাতে শিখলেন না?”

তবে বাসের সাথে যে শুধু ড্রাইভার, কন্ডাক্টার আর খালাসী হেলপার যুক্ত থাকে তাই নয়, আরো থাকে বাস রুটের স্টার্টার টিম কিপার।  তেমনই একজন – বিষ্ণুদা, বিষ্ণু ঘটক।  কাজ করতেন নাগেরবাজার – হাওড়া মিনি বাস রুটে। আমার দেখা প্রথম আধুনিক কবিতা লেখক।তাছাড়াও নাট্যকার, ব্রতচারী সংগঠক।   সেই প্রতিভার দাম সরকার – সমাজ থেকে না পেয়ে, শেষ পর্যন্ত উল্টো রামায়ন লেখায় হাত দিয়েছিলেন।  উল্টো মানে আক্ষরিক অর্থে উল্টো।  আয়নায় হরফগুলি যেমন দেখায়, তেমন ভাবে লেখার চেষ্টা কৃত্তিবাসী মহাকাব্য !

আরেক জনের কথা এই সুত্রে মনে পড়ছে – কিন্তু নামটা ভুলে গেছি।  ভদ্রলোকের সাক্ষাত্কার একবার দুরদর্শন কলকাতা প্রচার করেছিল।  উনি ‘কিক্লস’ (যার অর্থ ‘চক্র’)নামক একটি ক্লাবের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং গ্রিক ভাষায় কবিতা লিখতেন।  দক্ষিণ দমদমের এই ব্যতিক্রমী ক্লাবে গ্রিক ভাষার চর্চা হয়! সাক্ষাতকারে উনি বলেছিলেন যে ওনার কবিতার প্রশংসা খোদ গ্রিস থেকেও এসেছিল। এই গুণী মানুষটি ৪৪ নং রুটের বাস চালাতেন!

তেলেঙ্গানা আন্দোলনের সময় একজনের কাছে একটা হায়দ্রাবাদী ওয়ান লাইনার শুনেছিলাম।  খুচরো নিয়ে কন্ডাক্টার যাত্রীকে বলছে – “Change cannot be given to you every time – you have to bring change” !!

বাস কন্ডাক্টারদের প্রতিভার আলোচনায় জনৈক শিবাজি রাও গাইকোযাদের কথা একটু না ছুয়ে যাওয়া খুব অন্যায় হবে। ব্যাঙ্গালোর  শহরের (তখনও বেনালুরু হয়নি) এই কন্ডাক্টার নিজের অননুকরনীয় স্টাইলে টিকিট কাটতেন – খুচরো ফেরৎ দিতেন। এবং তা করতেন অত্যন্ত দ্রুততায়।  তার সাথে থাকত অদ্ভুত কায়দায় সামনের চুলগুলি কপালের উপর থেকে সরানো।  এই পারফরমেন্স দেখার জন্য যাত্রীরা  আগের বাস ছেড়ে দিত অপেক্ষা করত শিবাজি রাওয়ের জন্য। আজ সেই কন্ডাক্টার শুধু তার যাত্রীদের কাছে নয় সারা ভারতে বিখ্যাত। অভিনয় জগতের একজন আইকন। আজ লোকে তাকে রজনীকান্ত নামেই চেনে।

বাসের কর্মীদের নিয়ে অনেক কথা হলো।  শেষ করার আগে বাস নিয়ে কিছু আলোচনা হয়ে যাক।

BS-III, IV আসার আগে অবধি প্রায় ৩০ -৩৫ বছর প্রাইভেট বাসে বসার ব্যবস্থা প্রায় অপরিবর্তিত ছিল।  বাঁ দিকে টানা লেডিস সিট্ আর ডান দিকে টানা জেন্টস সিট্।  মাঝে দুই দিকেই একটা করে দুজনের বসার মত কাটা সিট্।  আর একদম পেছনের সারিতে লম্বা জেন্টস সিট্ আর ড্রাইভারের পেছনে টানা লেডিস সিট। সেই সব বাসে গেট থাকত দুটি।  লেডিস   সিট্ – জেন্টস  সিট্ বললাম  বটে –  কারণ সেই ভাবেই আমরা জানতাম। বিশেষ ভাবে মাতৃভূমি লোকালে পুরুষ ও মহিলা যাত্রীদের মধ্যে সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে এই জ্ঞান পরিমার্জনের দরকার হ’ল। এখন শুনি লেডিস – সিটগুলি মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত – তবে বাকিগুলি সাধারণ আসন – সবাই বসতে পারে। এই সংরক্ষেনের চক্করে অনেক সময় দেখা যায় মুশকো পুরুষরা গ্যাট হয়ে সিটে বসে আর কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে মহিলারা দাঁড়িয়ে আছে।  ফাদার দ্যাতিয়েন লিজের লেখায় জানাচ্ছেন যে বাসে ট্রেনের এই  সাধারণ দৃশ্য দেখে এ দেশে আসার পর তার সাংঘাতিক কালচারেল শক লেগেছিল।

কাটা সিট দুটি ছিল – যাকে বলে ‘প্রাইম প্রপার্টি’। কারন সামনে দাঁড়ানো লোকেরা আপনার গায়ের উপর পরবে না বাসের ঝাঁকুনিতে আপনিও পাশের লোকের উপর পরবেন না। ঘাড়ে ব্যথা না ধরিয়ে জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখার জন্যও এই সিট ছিল আদর্শ।

সেই অর্থে একদম পেছনের লম্বা টানা সিটটি ছিল দুয়োরানি। ঝাঁকুনির জন্য সবাই ওই জায়গায় বসা সবাই এড়িয়ে চলত।  মিস্ত্রী মজুররা তাদের যন্ত্রপাতি নিয়ে বরং জমিয়ে বসত এই জায়গায়।

বাসের ভেতর লেখা নানা আইন – উপদেশ – সতর্কবাণী – এই সব মন দিয়ে খুটিয়ে পড়ার অভ্যাস আমার ছোট বেলা থেকেই। প্রথমে বানান করে করে পড়তাম – ‘পকেটমার হইতে সাবধান’ – ‘৩ বৎসরের উর্ধে পুরা ভাড়া লাগিবে’ – ‘মালের দায়িত্ব আরোহীর’ – ‘ধুমপান নিষেধ’।  আমার বাংলা অক্ষর পরিচয়ে এই সব টুকরো বাক্যের ভূমিকাও স্বীকার করতে হবে। সব থেকে বিভ্রান্ত হতাম ‘উর্ধে’ বানানটা নিয়ে – অন্তত ৩-৪ রকমের বানান হরদম দেখা যেত।

বানান ঠিক থাক বা ভুল, খেয়াল করবেন – সবকটি বাক্য-ই সাধু ভাষায় লেখা। তারপর সময়ের সাথে সাথে সাধু ভাষার গরিমাও গেল অস্তাচলে।  তখন  লেখা হতে লাগল – ‘ সাবধান – পকেটমার’ , ‘মাল নিজ দায়িত্বে রাখুন’ , ‘বয়স যদি তিন, পুরো ভাড়া  দিন’।

তবে সব থেকে ইন্টারেস্টিং শব্দ গুচ্ছের দেখা মিলত গেটের উপর।  সেখানে লেখা থাকত ‘নামিবার সময় টিকিট দেখাইবেন’। কিন্তু দুষ্টু ছেলেদের কৌশলী হাতের ছোয়ায় সেটা হয়ে যেত ‘নামিবার সময় টিকি দেখাইবেন’ – কিংবা কোনো কোনো বসে ‘টিকি খাইবেন’! সাধু  অথবা চলিত, যে ভাষাতেই লিখুন, মানে কিন্তু বদলায় না।

 

image credit:  www.pret-a-voyager.com

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s