তোমার আমার প্রেম – রিজেক্ট

রজনী সেন রোডের ঠিকানা জিজ্ঞেস করলেই কি মনে হয় বলুন তো? হ্যাঁ ঠিক বলেছেন ফেলুদা ওরফে শ্রী প্রদোষ চন্দ্র মিত্তিরের বাড়ি এই রাস্তাতেই।  সেখানেই এক অফিসে  কাজে যোগ দিলাম গত শতাব্দীর শেষ বছরে। তবে মুদায়লি এলাকার এই রাস্তায়  ফেলুদার অপরাধী ধরার কোনো ঘটনা  দেখিনি।  বরং নিজেই প্রায় আসামি হয়ে এক রাত্তিরে আটক হয়েছিলাম।  সেই গল্পে পরে আসছি।

বিশাল কোম্পানি – অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের একদিনের ক্রিকেট সিরিজ স্পন্সর করে।  আমেরিকান ডিপোজিটরি রিসিট ইস্যু করেছে।  সুপারস্টার কামাল হাসান কোম্পানির একজন ডিরেক্টার। কয়েক একর জায়গা নিয়ে চেন্নাইয়ের লাগোয়া কেলামবাক্কামে মূল অফিস।  মুদিয়ালিতে ক’লকাতার শাখা।  ইউপিএসসি বিশাল বাড়িটা ছাড়িয়ে টালিগঞ্জ যাওয়ার পথে বাঁ হাতের গলি।  বাংলা চালচিত্র জগতের প্রবাদপ্রতিম পরিচালকের বাড়িতেই তৈরী স্টুডিওটি অফিস হিসাবে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল।  সেই আমলেই ভাড়া ছয় অংকে।

নতুন দুনিয়ার নতুন প্রযুক্তিকে শিক্ষা আর বিনোদনের কাজে লাগিয়ে প্রচুর প্রোডাক্ট ও প্রজেক্ট নিয়ে এসেছিলো কোম্পানিটি। সিডি বা কম্প্যাক্ট ডিস্ক বাজারে প্রথম বেরোচ্ছে সেই সময়।  চেন্নাইয়ে কোম্পানির সিডি তৈরির একটা প্লান্ট ছিল।  বিভিন্ন ছায়াছবির কপিরাইট সত্বাধিকারীরা তখন সবে সিডি ফরম্যাটে সেগুলি বাজারে আনছেন।  অফিসের একজনের সহকর্মী – রানাদার দায়িত্ব ছিল সেই অর্ডার সংগ্রহ করে চেন্নাই পাঠানোর  আর সেখান থেকে সিডি তৈরী হয়ে এলে সেগুলি ডেলিভারি করার ।  অর্ডারের সাথে মূল ছবিটি ‘ইউম্যাটিক টেপে’ পাঠানো হতো।  সেই টেপ অনেক সময় প্লান্টে সঠিক ভাবে চলতো না।  ফলে নতুন ইনপুট চেয়ে পাঠানো হতো একটি মেমোর মাধ্যমে। একবার একটা মেমো এলো  ‘তোমার আমার প্রেম – রিজেক্ট’। বুঝতেই পারছেন, তোমার আমার প্রেম হল সিনেমার নাম।  ইনপুট পাঠানোর প্রায় দুমাস বাদে এল এই খবর।  রানাদা তো ভয়েই অস্থির।  কারণ যে গুজরাটি ভদ্রলোক অর্ডারটি  দিয়েছিলেন, তিনি বিখ্যাত ছিলেন নিজের মুখের ভাষার জন্য। আমাকে রানাদা ধরলেন তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য – শোক সংবাদটি জানাতে । ধর্মতলা কফি হাউসের পাশে তার অফিসে ঢুকলাম। যতটা দুঃখিত মুখে খবরটা দেওয়া যায়, সেটা বলা হলো।  খবর শুনে তিনি শুধু একটা কথাই বললেন – ঠিক আছে রানাদা.  তোমার আমার প্রেমও রিজেক্ট। সেখানেই ব্যবসার ইতি।

আমার সরাসরি দায়িত্ব ছিল টিউটোরিয়াল সিডি মার্কেটিংয়ের।  বিভিন্ন সফ্টওয়ার যেমন মাইক্রোসফট উইন্ডোস, অফিস, ফটোশপ ইত্যাদি শেখার টিউটোরিয়াল দেওয়া থাকতো সিডিতে।  যেটা দেখে একজন ব্যবহারকারী নিজের থেকেই সফটওয়্যারগুলি শিখতে পারে। সাথে কিছু বেসিক ইলেকট্রনিক্সের আর প্রোগ্রামিংয়ের সিডিও ছিল। কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী প্রথমেই শহরের কিছু সিডি বিক্রেতাকে ডিলার বানানো হলো।  তাদের কাছে কিছু মাল ঠেলে দেওয়া হলো। এবার কোম্পানি বিভিন্ন জায়গায় প্রচার শুরু করলো ও যা অর্ডার পাওয়া যেত,  তা এই ডিলারদের মাধ্যমে সাপ্লাই করা হতে লাগলো।  কিছু বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো।  আরপিজি নেটকম একটি কেবল রেডিও চ্যানেল চালাতো।  সেখানেও রোববার করে দুঘন্টার প্রোগ্রাম করতাম আমি।  সেখানেও কোম্পানির বিভিন্ন পরিষেবার কথা জানানো হতো। তা ছাড়াও আইস স্কেটিং রিঙ্ক,  নেতাজি ইন্দোর প্রভৃতি জায়গায় কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক্সের মেলায় স্টল দিয়ে বিক্রি করা হতো।

যাই হোক টুকটাক ব্যবসা চলছিল। কিন্তু কোম্পানির ঘরে জমা হয়ে যাচ্ছিল প্রচুর সিডি। এর মধ্যে সারা ভারতে এই সিডির ব্যবসা দেখার জন্য হেড অফিসে এক বড় বাবু এলেন।  এসেই নিয়ে এলেন মিলিনিয়াম অফার। নতুন সহস্রাব্দ উপলক্ষে স্টক ক্লিয়ারেশন সেল।  মূল দামের থেকে প্রায় ৬০% ডিস্কাউন্টে ডিলারদের দেওয়া হল অফার।  সমস্ত ডিলাররা কিছু কিছু করে স্টক তুললো।  কিন্তু আমাদের আশ্চর্য্য করে এক মাড়োয়ারি ডিলার প্রচুর স্টক তুললেন। আমরাও মহানন্দে সাপ্লাই করে দিলাম। কিন্তু  ম্যানেজারের সাথে কথা বলে ডিলার নিজের জন্য ৩০ দিনের ক্রেডিটের ব্যবস্থা করে ফেলল। এবার মিলিনিয়াম অফার শেষ হওয়ার পরে আবার বাজার ফিরে এলো তার নিজের স্বাভাবিক ছন্দে।  আবার সেই মেলায় অংশ নেওয়া।  ডিলারদের কাছে বিক্রি করা।  এবার আর সেই ডিলার দেখি আর স্টক তোলে না। সবসময় বলে স্টক আছে। ওদিকে আগে মালের দামও দেয় না। এই নিয়ে একটু মনমালিন্য হয়ে গেল আমার বসের সাথে।   এর মধ্যে এসে গেল আইস স্কেটিং রিঙ্কের মেলা।  সেখানে সেই ডিলার ভদ্রলোকও আলাদা স্টল দিলেন।  শুধু দিলেন না – আমরা যেখানে ১০% ছাড় দিছিলাম, সেখানে তিনি  ৫০% ছাড় দিয়ে প্রায় পুরো মাল বিক্রি করে দিলেন।  আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আঙ্গুল চুষতে থাকলাম।

এই সব ডামাডোলের মধ্যে আমাদের কোম্পানি একটা অ্যানিমেশন ছবি তৈরী করে বাজারে ছাড়লেন। “পাণ্ডব” । সেই বিষয়ে কথা বলার জন্য বোম্বে থেকে এক অফিসার এলেন। যোগাযোগ করে ডিস্ট্রিবিউটরের সাথে কথা বোলাতে নিয়ে গেলাম। প্যারাডাইস হলে ছবি মুক্তি পেল।এক সপ্তাহ পরেই উঠে গেল। সেই বাজারেই ছবি তৈরী করতে নাকি কোটি টাকা খরচ হয়েছিল।  সেই অফিসারকে অনেকদিন পরে সিনেমার পর্দায় দেখলাম। ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘রেনকোট’ ছবিতে অজয় দেবগনের বন্ধুর চরিত্রে।

একবার পুজোর আগে হেড অফিস থেকে নির্দেশ এলো যে কোলকাতার পুজো নেট কাস্টিং করা হবে।  ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর মানুষ কলকাতার পুজো সরাসরি দেখতে পাবে।  খেয়াল রাখুন সেটা ২০০০ সালের কাছাকাছি ঘটনা।  তার জন্য হুড়মুড় করে লোক নিয়োগ হয়ে গেলো। সেই কর্মচারীও পুজো কমিটির সাথে যোগাযোগ করে টাকাপয়সার কথা প্রায় পাকা করে ফেললো।  তারপর হটাৎ করে এক সকালে খবর এল যে এই বছর প্রযুক্তিগত কারণে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত করা যাচ্ছে না।  নিয়োগের এক মাসের মাথায় ছেলেটিকে জানিয়ে দেওয়া হল – ভাই পরের মাস থেকে আর তোমার কাজে এসে কাজ নেই।

এই ভাবে  প্রায় দুটো বছর ঘুরে গেলো। প্রথম অ্যানুয়েল অ্যাপ্রেজালের সময় এসে গেলো।  সবার নামেই খাম বন্ধ চিঠি এলো চেন্নাই থেকে।  আমার খাম খুলে চিঠিটা পড়তে লাগলাম।

“মহাশয়,

আপনার সারা বছরের কাজের মূল্যায়ন করিয়া সংস্থার পরিচালন পর্ষদ অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাইতেছেন  যে আপনি অত্যন্ত কুশলতার সহিত নিজের নির্দিষ্ট দায়িত্ব সম্পাদন করিয়াছেন।  নিজের কর্মসম্পাদন দক্ষতাকে আরো উত্তম করিবার হেতু উৎসাহ প্রদান করা হইতেছে।

তবে যেহেতু ব্যবসায় মন্দা চলিতেছে, সেই হেতু আপনার মাসিক বেতন ও অন্যান্য সুবিধাদি কোম্পানির পক্ষে হইতে ছাঁটাই করিয়া নিম্নরূপ করা হইলো: …..”

এর মধ্যে আবার কোথাও একটা মেলা উপলক্ষে স্টল নেওয়া হলো। মেলার প্রথম দিন ভিড় দেখে অফিস থেকে আরো দুটো কম্পিউটার নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হলো।  ডেমোন্সট্রেশন দিতে সুবিধা হবে।  সেই মতো সন্ধ্যে বেলা একটা ট্যাক্সি ডেকে অফিস থেকে দুটো মেশিন বের করে ট্যাক্সিতে তুলছিলাম।   একটা মনিটর তুলেছি কি তুলিনি, হৈ হৈ করে দু-তিনজন পাড়ার লোক ঘিরে ধরলো।  যতই তাদের বোঝাই যে অফিসের জিনিস মেলায় যাচ্ছে – তারা কিছুতেই শুনতে রাজি নন।  পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাড়িওয়ালা সেই বিখ্যাত পরিচালক (যার বাবা ছিলেন বাংলা সিনেমার প্রবাদ) ও তার ছেলে (তিনিও পরিচালক!)  এসে কলার ধরে অফিসে ঢুকিয়ে অভিযোগ করলেন যে আমরা ভাড়া না দিয়ে পালাচ্ছি।  এদিকে অফিস বাড়ির যে ভাড়া বাকি পড়েছে সেই খবর আমাদের কাছে ছিল না। থাকারও কথা নয়।  ম্যানেজারকে ফোন করি – ওনার ফোন বন্ধ।  বাকি সহকর্মীরাও ততক্ষণে বাড়ি চলে গেছে।পাড়ার আরো দুচারজন এর মধ্যে অফিসে জড়ো হয়েছে রগড় দেখতে।তার মধ্যেই সৃষ্টিশীল মানুষদের উত্তেজিত বাক্যবাণ ছুটেই চলেছে।  আমি মাথা নিচু করে বসে আছি।  এই ভাবে বেশ কিছুক্ষণ চললো। যখন বুঝতে পারলেন যে এই নাটকে নাট্য মুহূর্ত বিশেষ নেই, তখন একজন দুজন করে সুধী দর্শক কেটে পড়তে লাগলেন।  কিন্তু পরিচালক ধৈর্যশীল মানুষ।  সেই দিনই ভাড়ার টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে বসে রইলেন। শেষে বয়স্ক মানুষটি সোফা ছেড়ে উঠলেন প্রায় রাত বারোটায়। তার তরুণ পরিচালক পুত্রও  রণে ভঙ্গ দিলেন যখন বুঝলেন যে এই জামিন কর্মচারীকে মুক্ত করতে কোনো কামাল হাসান-ই  আসবেন না,  তখন বাজে রাত দুটো। নিজের তালা লাগিয়ে আমাকে অফিস থেকে বের করে দিয়ে গুটি গুটি নিজের ঘরে চলে গেলেন। বলে দিয়ে গেলেন যে ভাড়া পুরো না মেটালে অফিসের দরজা আর খুলবে না।

সৌভাগ্যবশত যোধপুর পার্কে এক আত্মীয়ার বাড়ি ছিল। মাঝ রাতে হেঁটে হেঁটে গিয়ে গৃহস্থের ঘুম ভাঙিয়ে আশ্রয় চাইলাম।  পথে দেখলাম ছেঁড়া পোস্টারের ভেতর থেকে তাকিয়ে কামাল হাসান হাসছেন। ছবির নাম বোধহয় ছিল “হে রাম” !!

(Image Source:  Internet)

2 comments

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s