চৈত্র_সংক্রান্তি ১

যে কোনো মাসের শেষ দিনটাই সংক্রান্তি। তবে জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় তাৎপর্যের জন্য পৌষ সংক্রান্তি আর চৈত্র সংক্রান্তির কদর একটু বেশি। বড়দের মুখে শুনেছি দেশের বাড়িতে প্রতি মাসের সংক্রান্তির দিনই বিছানা বালিশের চাদর, পর্দা, মশারি সব কাচা হতো। কাপড়গুলি বড় পোড়া মাটির গামলায় সোডা দিয়ে সেদ্ধ করা হতো কাঠের জালে।

দেশে গ্রামের বাড়িতে চৈত্র মাসের ঝাড়-পোছ করার একটা কারণ অবশ্য ছিল বলে মনে হয়। কালবৈশাখীর ঝড়ে ঝুল কালি উড়বে – বিশেষ করে রান্না ঘরে – সেটা খাবারে পড়লে অসুখ করার সম্ভাবনা। তাই চৈত্রের শেষেই ঝুল নোংরা পরিষ্কার করার নিয়ম বোধ হয় চালু হয়েছিল। এখন তো চিমনি আর গ্যাসের জন্য সেই হ্যাপা আর নেই। তবু এই আগাপাশতলা ঝাড়-পোছের প্রয়োজন ফুরোয় নি। সেটা কাজে হাত দিলেই বোঝা যায়।

এখন সময় আর সুযোগের অভাবে এই মাসিক যজ্ঞটি আর আয়োজন করা সম্ভব হয় না। সময় আর প্রয়োজন মতো কাচাকাচি সেরে নেওয়া হয়। তবে আমাদের বাড়িতে এখনো বছরে দুইবার গণধোলাই পর্ব আয়োজন করা হয়। একবার দুর্গা পুজোর আগে আর একবার এই নববর্ষের আগে। শুধু বিছানা মশারি পর্দা নয় – পা মোছার পাপোশ থেকে টেলিফোনের ঢাকনা, হাত মোছার তোয়ালে থেকে কড়াই ধরার ন্যাকড়া – সব ধোয়া হয়। ভ্যাকিউম ক্লিনার দিয়ে বিছানা, দেওয়াল আলমারির পেছন থেকে ধুলো, ঝুল ধরা হয়। জানলা আর বারান্দার গ্রিল ভালো করে মোছা হয় – মোছা হয় জানলা দরজাগুলিও। প্রায় সাত দিন ধরে চলে এই রাজসূয় যজ্ঞ। একা মানুষ সবটা নিজের করতে হয় – নিজের রোজগারের ধান্দার ফাঁকে ফাঁকে।

অনেকে এই বসন্ত কালে ঘর ঝাড়ার প্রথাটির উৎস বলেন ইরানিদের নববর্ষ উৎসব নওরোজ থেকে এসেছে। নওরোজ কথাটির আক্ষরিক অর্থ “shaking the house”! আবার ইহুদিদের পাসওভার উৎসবের (যা বসন্ত কালেই উদযাপিত হয়) আগেও আগাপাশতলা বাড়ি পরিষ্কারের রেওয়াজ আছে। তার আবার ধর্মীয় ব্যাখ্যাও আছে। সেই কচ্কচিতে না গিয়ে মূল আলোচনায় ফিরে আসি।

কলেজে পড়ার সময় আমরা অনেকেই টিউশনি করতাম। কোচিং ক্লাসে নয়, বাড়ি গিয়ে ছাত্র পড়ানোর-ই বেশি চল ছিল। সেই সময় যারা খুব বেশি সংখ্যায় ছাত্র পড়াতো, তারা ছাত্র পড়ানো না বলে – বলতে লক্ষ্মী পুজো। ফুল ছিটিয়ে দুটো অং বং মন্ত্র আউড়েই পরের বাড়ির উদ্দেশ্যে দৌড় !! ঠিকে কাজের জন্য একজন আছেন বটে তবে তিনি ব্যাপারটাকে আমার সেই বন্ধুদের মতো লক্ষ্মী পুজোই ভাবেন। এদিকে কাজের লোকের যা আকাল, তাই কিছু বললে সমূহ বিপদ। বললেও যে খুব একটা কাজ হবে, সেই ভরসা নেই। মহিলা কাজে সদ্য জয়েন করার পর মা বোধ হয় একদিন ভালো করে ঘর মোছার কথা বলেছিলো। সেই কথা শুনে ধপ করে ন্যাতা বালতি ফেলে দিয়ে তিনি গালে হাত দিয়ে বসে পড়ে বললেন “এমন আলুক্কুনে কথা বোলো না দিদা। আমি আরেক বাড়ির মেঝে মুছে মুছে এমন পেলেন করে দিয়েছি যে সেই বাড়ির বৌদি পা সিলিপ পরে পড়ে দুই মাস বিছানায়। তাও তো বৌদি ছেলেমানুষ – তুমি বুড়ো মানুষ তোমার হলে কি হবে বোলো দেখি? এর পর বলাও চলে না আর দেখাও সম্ভব নয়। তাই তিনি যেমন কাজ করেন তেমনই চলছে।

এই বলা আর দেখা বন্ধ হওয়ার ফলে আমার খাটনিটা আরও বেড়ে গেছে। টিভিতে বাক্সের পেছনে, আলমারির সাইডে বা খাটের নিচে মনে হয় মান্ধাতার আমলের নোংরা। ধুলো, ঝুল, টিকটিকির নাদি। ও সব অস্থানে কুস্থানে মনে হয় না যে কোনোদিন ঝাঁটা পড়ে। সেই গত শতাব্দীতে কেনা ভ্যাকিউম ক্লিনারটাও অতিরিক্ত খাটনির জন্য প্রতিবাদ জানাচ্ছে। প্রতিবার চালানোর সাথে সাথেই ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। তাকেও বাবা বাছা করে কাজ চালাচ্ছি আর কি !

অবশ্য সব কিছুর-ই একটা ব্রাইট সাইড আছে। যেমন এই সব জায়গা পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা কুড়ি টাকার নোট আর খুচরো তিন টাকা পঞ্চাশ পয়সা আবিষ্কার হয়েছে। বাড়িতে পুরোনো শিশি বোতল প্লাস্টিক বিক্রি হলে সেই টাকা-টা মা’র ভাগে পড়ে। সেই যুক্তিতে এই সাড়ে তেইশ টাকাও সাথে সাথে লক্ষ্মীর ভাঁড়ে জমা দিতে হয়েছে। তবে খাটনি মা-কেও করতে হয়। রান্না ঘরের শিশি বোতল, মশলা রাখার কৌটো – সব পরিষ্কার হয় এই চৈত্র সংক্রান্তির সময়।

কয়েক বছর আগেও যারা ঠিকে কাজ করতো, তাদের এই পাইকারি পরিষ্কারের সময় সাহায্য পাওয়া যেত। দমদমের বাড়িতে আমাদের ঠিকে কাজের লোক আনওয়ারা প্রায় ১০ -১৫ বছর ধরে তো নিজে থেকেই এই পার্বনের পৌরোহিত্য করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতো। ওঁরও কটা অতিরিক্ত টাকা আয় হতো, আর আমাদেরও সাহায্য হতো, অনেকটা। সেই দিনও নেই সেই লোকও নেই।

এই ঘর পরিষ্কার করার জন্য টাকা দেওয়া নিয়ে একটা মজার ঘটনা বলি। সাধারণত কাউকে দিয়ে কাজ করলে, তাকে পারিশ্রমিক দিতে হয়। এই যেমন ধরুন কাপড় কাচালে বা ঘর পরিষ্কার করালে। কিন্তু এই খাস ক’লকাতায় এমন জায়গা আছে যেখানে আপনার ঘর পরিষ্কার করে দেওয়ার জন্য লোকে আপনাকে টাকা দিয়ে যাবে। জানেন ? তাহলে শুনুন।

দমদম স্টেশনের পেছনে সিঁথির দিকটায় বিধান পল্লী বলে একটা জায়গা আছে। আমার স্কুলে সিনিয়র কৌশিকদার বাড়ি (এবং অফিস) সেখানে। কৌশিকদার ব্যবসার কিছু প্রোডাক্টের ডিজাইন করার জন্য মাঝে বেশ কয়েকবার ওর বাড়ি যেতে হয়েছিল। প্রথম দিন দমদম স্টেশন থেকে রিকশা নিয়ে বললাম বিধান পল্লী যাবো। এ-গলি ও-গলি করে রিক্সা চলেছে। হঠাৎ একটা জায়গা থেকে দেখতে পেলাম প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনেই সাইন বোর্ড। তাতে ঘুরে ফিরে কয়েকটা শব্দ লেখা, যার সাথে আমার ঠিক পরিচয় নেই। – ‘এখানে তার / পাত টানা হয়’ কিংবা “এখানে চেন টানা হয় “।

কাজের কথা হয়ে যাওয়ার পর কৌশিকদাকে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপারটা কি? যা জানাগেল – তাতে তো আমার চোখ ছানাবড়া। ওই সব সাধারণ দেখতে বাড়ির ভেতর সোনার বার বা বিস্কুট থেকে তার এবং পাত তৈরির কাজ হয়। তার বা পাত ছাড়া নাকি গয়না বানানো যায় না। আর সব থেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে যে চৈত্র মাসে এই সব বাড়ির ধুলো ঝাড়ার জন্য কাজের লোকেরা রীতিমত টাকা দেয় বাড়ির মালিককে। এবং টাকাটা নেহাত মন্দ নয়। প্রমান মাপের বাড়ির জন্য প্রায় কয়েক হাজার । এই সব পাড়ায় নর্দমা পরিষ্কারের জন্যও রীতিমত অকশন হয়। কারণটা নিশ্চই বুঝতে পারছেন। ধুলো মাটির সাথে মিশে থাকা সোনার গুঁড়ো উদ্ধার করে ঠিকে কাজের লোকেদের বছর বছর এক-আধটা গয়না হয়েই যায় !!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s