চৈত্র_সংক্রান্তি ২

স্বাধীনতা দিবস প্রজাতন্ত্র দিবসের মত জাতীয় তাৎপর্যপূর্ণ দিনগুলি তখনো গুঁতিয়ে বেচার অনুষ্ঠান হয়ে ওঠেনি। প্রাকৃতিক ঋতুচক্রের নিয়মে গ্রীষ্ম বা বর্ষা আসার তুরীয় আনন্দে দোকানে দোকানে “বাই ওয়ান গেট ওয়ান ফ্রি” বা ৫০% ডিসকাউন্টের পেশী আস্ফালন শুরু হয় নি তখনও। Bargain বা লোভনীয় ছাড়ে কেনাকাটা করার সুযোগ বলতে একমাত্র চৈত্র সেল।

আমি জন্মাবধি মফস্বলের বাসিন্দা। নাগেরবাজার – মধ্যমগ্রামের বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে ধারণা অত্যন্ত সীমিত। আর খুব বেশি হলে 79B বা 30D বাসে চড়ে মোল্লার দৌড় সেল বাজারের শ্যামবাজার হাতিবাগান পর্যন্ত। তাই গড়িয়াহাটের ভুবনমোহিনী সেল সম্পর্কে আলোচনায় যেতে চাই না। তবে জ্ঞান হওয়া ইস্তক দেখে আসছি যে ছাপোষা গৃহস্থের জন্য চৈত্র সংক্রান্তির একটি বিশেষ উদযাপন যে এই চৈত্র সেল – সে কথা হলফ করে বলতে পারি।

সেলের বাজার বসত রাস্তার দুধারে, বিশেষ করে বিকেলে। চটি জুতো থেকে জামা গেঞ্জি, বিছানার চাদর, টেবিলের ঢাকনা – সব পাওয়া যেত সেলের বাজারে – মানে ডিস্কাউন্টে। আজকালকার মতো বেড়ালের হাঁচি বা ব্যাঙের কাশিতে ডিসকাউন্ট দেওয়ার চল না থাকায় সারা বছর এই সেলের অপেক্ষায় থাকত মানুষ।

সেল শিকারে যাওয়ার সময়টা সন্ধ্যের পর। আবছা আলো আঁধারিতে ভালো সেল শিকারির থাকতে হতো দু’টো গুণ। দরদাম করতে পারার দক্ষতা তো থাকতেই হবে, তার সাথে থাকতে হবে জিনিস পরখ করার তীক্ষ্ণ নজর। চৈত্র সেলের আর একটা নাম চালু ছিল – “স্টক ক্লিয়ারেন্স”। পুরোনো স্টকের মাল কম দামে পাওয়ার সুবর্ন সুযোগ এই চৈত্র সেল। মনে করুন কোনো – নতুন একটা শাড়ির উপর ময়লা দাগ লেগেছে। এমনিতে খুঁতখুঁতে বৌদি সেটি কখনোই কিনবেন না। কিন্তু সেলের বাজারে সেই শাড়িটাই এক নজরে দেখে নিয়ে বুঝতে পারবেন যে এক বার ধুলেই সেই দাগ উঠে গিয়ে শাড়ি একদম নতুন। অথচ দাম প্রায় অর্ধেক ! কিংবা একটা বিছানার চাদরের মাথার দিকে একটু ছেঁড়া। নিপুন গিন্নি সহজেই সেটা মেরামত করতে পারবেন। তাই নতুনের থেকে অনেক কম দামে সেই জিনিস চিনে নেবে তার জহুরির চোখ।

তবে আনাড়ি ক্রেতা হলে ঠকে যাওয়ার সমূহ সম্ভবনা। হয়তো সামান্য দাগ দেখে কোনো কাপড় কিনলেন সেলে। তারপর জলে দিতেই দেখলেন কাপড়টা পুরো পচা – তিন দিনেই ন্যাকড়া হয়ে যাবে। অথবা হয়তো সেলের মাল কিনে এনে দেখলেন রং এমন কাঁচা রং যে প্রথম কাচাতেই সব ফর্সা। অথবা সেল থেকে কেনা নতুন জুতো পরে পয়লা বৈশাখ হালখাতা করতে বেরিয়ে ফেরার সময় হালখাতার প্যাকেটের সাথে নতুন জুতো বগলে নিয়ে খালি পায়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হলেন !

জুতো বলতে মনে হল – আর একটা জিনিস সেল বাজারের বিবর্তনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আগে সেলের জুতোর দোকানে দুই পাটি জুতোই রাখা হতো। ভিড় আর হুড়াহুড়ির ছুঁতোয় যখন দেখা গেল যে অনেক জুতো মাননীয় ক্রেতারা আপন মনে করে দাম না দিয়েই নিয়ে যাচ্ছেন, তখন তারা শুধু একপাটি জুতোই ডিসপ্লেতে রাখতে লাগলেন। এবার দ্যাখ কেমন লাগে!

চৈত্র সেলের কেনাকাটায় আর একটা মোক্ষম প্যাচ হল – নো রিটার্ন। বিক্রি করা মাল ফেরত নেন না দোকানদার। এবং অধিকাংশ সময় সেলের জিনিসের কোনো রশিদও দেওয়া হয় না। সুতরাং “ক্রেতা সাবধান” নীতি অবলম্বন করে পা দিতে হয় সেলের বাজারে।

সেলের দোকান দু’রকম । একদম আগমার্ক সেল ওয়ালা। যাকে হিসাবশাস্ত্রের ভাষায় বলে ‘ভেঞ্চার” ব্যবসায়ী। বছরের অন্য সময় হয়তো অন্য কোনো কাজ করেন আর চৈত্র মাসে মালপত্র নিয়ে বসে পড়েন ফুটপাথে। আর দ্বিতীয় শ্রেণী – বড় দোকানি যারা সেলে নিজেদের পুরোনো স্টক বিক্রি করে মূলধন তুলে নিতে সচেষ্ট হন। প্রথম প্রথম বড় দোকানদারদের সাথে সেলওয়ালাদের আকচাআকচি থাকতো। কিন্তু পরে দেখা গেল যে তারাও দোকানের সামনে টেবিল লাগিয়ে নিজেদের মাল সেলের বাজারে বিক্রি করতে লাগলেন।

চৈত্রের গরমে ঘেমে-নেয়ে আরো দশ জনের গুঁতো সামলে দরদাম করতে পারাটাও একটা উন্নত দক্ষতা। সেলের এই ডিস্কাউন্টেড দামের উপরেও দরদাম করার রেওয়াজ। তবে যে জিনিসটা নিয়ে দর কষাকষি করছেন, সেটি হাতে নিয়ে দোকানদারের সাথে কথা চালাতে হবে। যদি শাড়ি বা বিছানার চাদরের মতো বড় জিনিস হয়, তবে একটা কোনা হাতে ধরে রাখুন। না হলে আপনি দরদাম করতে থাকবেন আর অন্য কেউ আপনার সেই পছন্দের মাল নিয়ে নেবে। সুতরাং এখানেও রেশনের দোকানের মতো লাইনের হকের দিকে নজর রাখতে হয়। তবে দরকষাকষিতে বিরক্ত হয়েই বোধহয় ফুটের দোকানদাররাও একটা সময় চৈত্র সেলেও “একদর” লেখা সাইন সেঁটে ব্যবসা করতে শুরু করলো।

তবে লিখলেই কি আর সেলের বাজার একদর হয়? সেই চিরন্তন বেড়াল – ইঁদুরের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার অভিনীত হতে থাকে চৈত্র সেলের বাজারে। অভিনয় দিয়েই তো খেলা শুরু। দোকানদার যে দাম বলবে, সেটা শুনেই আপনাকে প্রথমে আকাশ থেকে পড়তে হবে, যদিও আপনি মনে মনে জানেন যে সে খুব একটা ভুল দাম চাইছেন না। সেই থেকেই চাপ সৃষ্টির খেলা শুরু। মনের মধ্যে সব সময় সন্দেহ রাখুন যে দাম বাড়িয়ে তারপর ছাড় দিচ্ছে দোকানদার। এবার আপনি দোকানিকে বোঝাবার চেষ্টা করুন যে জিনিসটার কত রকম খুঁত। আপনি ভালো মানুষ তাই কিনছেন – না হলে এই মাল বিক্রি হওয়া মুশকিল। আর হ্যাঁ, কখনোই যেন আপনার হাবেভাবে প্রকাশ না হয় যে জিনিসটি আপনার পছন্দ হয়েছে। ব্যবসায়ী যদি একবার আপনার দুর্বলতা বুঝে যায়, তবে এই খেলায় আপনার হার নিশ্চিত। এত করেও যদি ঘাঘু দোকানদার কাবু না হয়, তবে ছাড়ুন আপনার শেষ ব্রহ্মাস্ত্র। ঝাঁঝ দেখিয়ে সোজা হাঁটা লাগাবার ভাব করুন। একেবারে লোকসান না হলে, দোকানি আপনাকে ফেরাবার চেষ্টা করবে। সেই সুযোগে কাউন্টার অ্যাটাক করুন !! আপনার জিত আটকায় কে? আমার পরিচিতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এই সাবজেক্টে ডক্টরেট করেছেন। তাদের মধ্যে অনেকে তো ক’লকাতায় বাৎসরিক ঢুঁ মারার সময়টাই ফেলেন এই চৈত্রের গরমে। তারপর আত্মীয়দের বাড়ি বুড়ি ছোঁয়া করেই গড়িয়া থেকে গড়িয়াহাট, নাগেরবাজার থেকে হাতিবাগান – সব সেলের বাজার চষে ফেলেন অদম্য উৎসাহে ! তাঁদেরই বাছাই করা কিছু টিপস আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম।

বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের মহিষাসুমর্দিনী ক্যাসেট সিডিতে বেরিয়ে যাওয়ার পর কাঠ ফাটা দুপুরে “বাজলো তোমার আলোর বেনু” শুনতে শুনতে মহালয়ার ভোরে সেই গীতি আলেখ্য শোনার আগ্রহ যেমন প্রভাবিত হয়, তেমনি হয়তো সারা বছর হ য ব র ল উপলক্ষে আমাজন, ফ্লিপকার্টের মত অনলাইন রিটেলার আর আধুনিক মলের নানা সেলের চাপে আমাদের পুরোনো ফুটপাথের সেল এখন একটু যেন কোনঠাসা।

তবু সন্ধ্যার সময় মধ্যমগ্রামে বসুনগর থেকে স্টেশন চত্বরে বেশ ঠাসা ভিড়। দোকানিদের হাঁক-ডাক আর ক্রেতাদের দরদামের চেঁচামেচিতে সরগরম এলাকা। তবে মল বিলাসী বাবু বিবিরা নন – সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরাই বেশি চোখে পড়ে এই ভিড়ে। দিগবাড়িয়া, কাঞ্চনতলা বা আরো দূরের কামদুনি থেকে মানুষ মোটর ভ্যান আর ট্রেকরে আসছে সেলের বাজার করতে। ডাই করে রাখা ৬০ টাকা দামের টি-শার্টের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়া কালো মাথা। ১৫০ টাকায় ছাপা শাড়ি ঘিরে চাপা ভিড়। হাজি গামছা, নাইটি, ছাপ ছাপ বেড কভার – একটু অন্য রকম রুচি, প্রয়োজন আর পছন্দের পসরা নিয়ে রাস্তার দুই ধারে সেলের বাজারেরও যেন অভিযোজন প্রক্রিয়া দেখতে পাই চোখের উপর।

কাল বাদ পরশু নববর্ষের দিন এই সব নতুন পোশাকেই নতুন বছরকে স্বাগত জানাবে গ্রাম ঘেঁষা মফস্বলের সাধারণ মানুষ। সেই সব মানুষ যাদের জীবন চক্র এখনো বাংলা মাসের হিসাবেই আবর্তিত হয়। পয়লা বৈশাখ যাদের জীবনে শুধুমাত্র একটি সৌখিন অনুসঙ্গ নয় – আক্ষরিক অর্থেই যাদের কাছে নতুন সূচনা।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s