চৈত্র_সংক্রান্তি ৩

চৈত্র মাস পড়লেই বাড়ির সামনে হাঁক শোনা যেত – “বাবা তারোকনাথের চরণে সেবা লাগে – মহাদেব “। এঁরা গাজনের সন্ন্যাসী। এই উচ্চারণের একটি আলাদা ধাঁচ ছিল। “বাবা তারোকনাথের চরণে” টেনে টেনে বলতো (মোটামুটি দশ মাত্রা) আর তারপর দুই মাত্রার মধ্যে “সেবা লাগে”। শেষের “”ম-হা-দে-এ-এ-ব”” কথাটার উপর একটা লম্বা মীড়। এই নির্দিষ্ট উচ্চারণের ধরণের জন্যই মনে আছে গাজনের সন্ন্যাসীদের। এই ইউনিক স্টাইলটার মতোই এই ডাকের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের সামাজিক বিবর্তনের একটা ইউনিক ইতিহাস।

সাধারণত দেখা যায় যে গাজনের সন্ন্যাস সংক্রান্ত প্রথায় অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের সামগ্রিক অংশগ্রহণ। তথাকথিত ভদ্রজনেরা এই অনুষ্ঠানে দর্শকের ভূমিকাই পালন করে এসেছেন। চড়ক গাছে ঝোলা বা পিঠে কাঁটা ফোঁড়ার মধ্যে উচ্চশ্রেণীর মানুষকে অংশগ্রহন করতে খুব একটা দেখা যায় না। এমন কি এখনো যারা এই চৈত্র বা শ্রাবনে বাঁক নিয়ে তারকেশ্বর যায় অথবা লোকনাথ বাবার জন্য অধুনা জনপ্রিয় চাকলা বা কচুয়ায় যায় জন্মাষ্টমীর সময় যায়, তাদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষের সামাজিক অবস্থান লক্ষ্য করলেও এই বিষয়টা নজরে পড়বে।

অনুমান করা হয় যে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব হ্রাসের পর যখন ধর্মঠাকুরের অভ্যুত্থান হলো, আর হাড়ি বাগ্দীদের মধ্যে এই ধর্মঠাকুরের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ক’লকাতার ধর্মতলা বলে জায়গার উৎপত্তির মধ্যেও ধর্মঠাকুরের থানের উৎস নির্দেশ করেছেন ঐতিহাসিকরা। এই সূত্র ধরেই গাজনের প্রচলন। ধর্মঠাকুরের একটা পুরোনো ছড়া পড়েছিলাম, যা এই তত্ত্বটির সমর্থনে উল্লেখ করা যায় :
“ধর্মঠাকুর যেটা সেটা ফিরিঙ্গি কি গোরা
বামুনের হাতে খায় না পুজো – পূজুরী তার ডোম ব্যাটারা ”

শিব দূর্গা ইত্যাদি দেবতা সেজে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা নেওয়ার রেওয়াজও ছিল এই সেদিন পর্যন্ত শহরতলীর বিভিন্ন পাড়ায়। তারপর ক্রমে সেই সব প্রথা ধীরে ধীরে উঠে গেলো। আমরা মধ্যমগ্রামে আসার পরেও দেখেছি যে আমাদের পাড়ায় সারা বছর আইসক্রিম বিক্রি করতো মন্টু বলে একটা ছেলে। চৈত্র মাসে সে সন্ন্যাস নিতো আর সেই গেরুয়া কাপড় পরেই আইসক্রিম বিক্রি করতে আসতো। সংক্রান্তির আগে মা’র কাছে থেকে ভিক্ষা নিয়ে যেত। এক জায়গায় পড়েছিলাম যে গাজনের সন্ন্যাসীদের ভিক্ষা করার প্রথাটাও বৌদ্ধ সংঘের প্রাত্যহিক আচারের প্রভাবেই গড়ে উঠেছে।

তবে গাজনের সন্ন্যাসীদের কাছে এই মাঙন বা ভিক্ষা করতে যাওয়ার পর্বটি সবসময় এতো নিরুপদ্রব ছিল না। বেশ পুরোনো সময়ে এই শহর কলকাতার শৈশব অবস্থায় দেখতে পাই যে কোনো পাড়ায় সন্ন্যাসীরা ঢাক বাজিয়ে ভিক্ষা করতে ঢুকলেই সেখানকার “দামাল” ছেলেরা একটা দাগ কেটে দিতো আর সন্ন্যাসীদের নানা রকম ধাঁধা জিজ্ঞেস করতো। ধাঁধার উত্তর না দিতে পারলে সেই দাগ পেরিয়ে যেতে পারতো না সন্ন্যাসীরা। তাদের অন্য পথে চলে যেতে হতো। এই রকম একটা ধাঁধার উদাহরণ দেখা যাক –
“শুনরে সন্ন্যাসী ভাই আমার বাখান
উত্তর দিয়া তুমি যাও অন্যস্থান।
এরণ্ড-র থাম খুঁটি, ভেরেণ্ডার বেড়া,
তার মাঝে পরে আছে মস্ত এক নোড়া।
বাটনা বাটিতে শিবের পুঁটকি হল ক্ষয়,
সেই শিবকে গড় করিলে কি পুন্য হয় ?”
তারকেশ্বরের মন্দিরের প্রথম দিকের অবস্থার কথা বোধহয় বলা হচ্ছে এই ছড়ায়। এই রকম বিভিন্ন ছড়া কেটে গাজনের সন্ন্যাসীদের পরীক্ষা করার চল ছিল। পরীক্ষা নাকি ভিক্ষা না দেওয়ার ছুঁতো? ঠিক যে ভাবে সরস্বতী পুজোর চাঁদা দেওয়ার সময় বানান জিজ্ঞেস করে থাকেন অনেকে!!

সিলেটেও গাজনের প্রচলন দেখা যায়। সন্ন্যাসীরা সারা মাস ধরেই ভিক্ষা করে গৃহস্থের বাড়ি। অনেকে শিব, শিবের সখি, হনুমান ইত্যাদি সেজেও নাচ গান করে। চড়কপূজা শুরু হয় অধিবাসের মধ্যে দিয়ে – আগের দিন। তারপরের দিন কাঁটা বা বাণ ফোঁড়া, চরকি পাক, বঁটি ঝাঁপ এই সব হয়। সব শেষে মূল সন্ন্যাসি বলে ওঠে – “হর গৌরী প্রাণনাথ/ মাথার উপর জগন্নাথ / এইবার উদ্ধার কর শিব হে / বোম ভোলানাথ” আর ধারালো রামদাঁর উপর দাঁড়িয়ে পরে। কিন্তু পা কাটে না। চড়ক উপলক্ষ্যে বড় মেলা বসে। সেখানে ধর্মমত নির্বিশেষে মানুষ যোগ দেয়। এই উৎসবের একটা আলাদা আকর্ষণ গাজনের গান। লোকগানের দল ‘দোহার’-এর সৌজন্যে সিলেটের একটি গাজনের গান হয়তো অনেকেই শুনেছেন – “গাঞ্জার (গাঁজার) চিরল চিরল পাত / তাই না খাইয়া মগ্ন হইয়া নাচে ভোলানাথ”।

দমদমে থাকার সময় কয়েকবার অর্জুনপুরের মাঠে চড়কের মেলা দেখতে গিয়েছিলাম। মোটামুটি উৎসবের সেই একই ছবি দেখা যেত – যা বিভিন্ন সময়ে নানা প্রজন্মের মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা নির্ভর বর্ণনায় লিখে গেছেন।

চড়ক পূজার আগের দিন এপার বাংলায় নীল পুজোর প্রচলন আছে । নীল – অর্থাৎ নীলকণ্ঠ মহাদেব। এমনকি আমার মা’ও দেখি বিভিন্ন সময়ে যারা প্রতিবেশী ছিলেন, তাদের কাছ থেকে শিখে এই পার্বন-টি উদযাপন শুরু করেছেন। সন্তানের মঙ্গল কামনায় নীলের ঘরে বাতি দেওয়ার প্রচলন আছে এই পার্বণে। কিন্তু সিলেটে গৃহস্থ বাড়িতে এই পূজার প্রচলন নেই। বরং চৈত্র সংক্রান্তির দিন পালন করা হয় হাড়ি বিষু। সেদিন নিরামিষ খাওয়া হয়। তেতো আর টক দিয়ে পুরোনো বছরকে বিদায় দেওয়ার রূপক হিসাবে সেদিন নিম-বেগুন আর টক-ডাল খাওয়ার বিধান আছে। এঁচোড়ের নিরামিষ তরকারিও খাওয়া হয়।

মালায়েলিদের নববর্ষ উৎসবের নাম ভিশু – কিন্তু বিষু কোথা থেকে এলো? একটু খোঁজ করতেই দেখলাম যে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উৎসব বৈসুক। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বর্ষবিদায় এবং বর্ষবরণ উৎসব ‘বিঝু’ বা ‘বিষু’। তিন দিন ব্যপি এই উৎসব পালন করে থাকে। বাংলাদেশের উত্তরপূর্ব সীমান্তবর্তী সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সিলেট বিভাগ ছাড়াও আসামের করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি ও কাছাড় জেলা, ত্রিপুরার ধর্মনগর, কৈলাসহর ও কমলপুর এবং মেঘালয়ের শিলং অঞ্চলে প্রচলিত। সেই প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে এমন নাম হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই এই চৈত্র সংক্রান্তিতে আবার নতুন করে বুঝতে পারলাম সংস্কৃতি একটা প্রবাহমান নদীর মতো। ভাঙবে গড়বে নিজের খেয়ালে। গ্রহণ করবে বর্জন করবে স্বেচ্ছায়। সেখানে বাঁধ দিতে যাওয়ার মতো পন্ডশ্রম বোধহয় আর কিছু হতে পারে না।

গত তিন পর্ব ধরে এই বকবক যারা পড়লেন, ও লাইক, কমেন্ট করলেন তাদের ধন্যবাদ। যারা পড়লেন ও লাইক কমেন্ট করলেন না – তাদেরও ধন্যবাদ সঙ্গে থাকার জন্য। সবার নতুন বছর খুব ভালো কাটুক !!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s