নেমন্তন্ন বাড়ির খাওয়া দাওয়া

এই প্রজন্মের অনেকেই আশ্চর্য হবে শুনে যে খাদ্য আন্দোলনের সময় থেকে খাবার অপচয় বন্ধ করার জন্য রাজ্যে অতিথি নিয়ন্ত্রণ বিধি লাগু ছিল। আমাদের দেশের আরো পাঁচটা আইনের মত এই অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রকৃত অবস্থান ছিল সরকারি সার্কুলারের পাতায়। যে যার ইচ্ছে আর সাধ্য মত অতিথি নিমন্ত্রণ করত। তবে নিমন্ত্রল পত্রের নিচে গোটা গোটা অক্ষরে লিখতে ভূলত না “পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অতিথি নিয়ন্ত্রন বিধি প্রযোজ্য”। ৯০-এর দশকেও দেখেছি এই লাইনটা লেখা হত।
ধোয়া কলাপাতায় প্রথমেই পড়ত লেবু আর নুন। উপরের ডান দিকে। পাশে থাকত মাটির গ্লাসে জল। প্রথমে লম্বা করে ভাজা বেগুন। ছোলার ডাল। গরম গরম লুচি। এখান থেকেই শুরু হত খেলা- নেমন্তন্ন বাড়িতে খাওয়ার খেলা। এই আজ কাল যেমন Clash of Clans- ইত্যাদি স্ট্রেটেজি গেম পাওয়া যায়, সেই রকম। নিমন্ত্রনকারী ও নিমন্ত্রন রক্ষাকারীর (মানে যারা খেতে এসেছেন) তাদের মধ্যেই চলত এই স্ট্রাটেজি গেম। একপক্ষে মাইক ব্রিয়ারলি অন্য দিকে ইয়ান চ্যাপল। তারা সব পাকা খেলোয়াড়।
প্রথমে ভোজন বীরদের কথাই বলি। ওপেনিং ওভারগুলি দেখে শুনে খেলতেন। মানে যত বল খেলতেন, তার থেকে ছাড়তেন বেশি। মনে রাখতে হবে সেটা টেস্ট ক্রিকেটের যুগ।লুচি ইত্যাদি তারা প্রায় ছুয়েই দেখতেন না। এরা হাত খুলতেন ভাত / পোলাও আর মাছ পাতে পড়লে। ফ্রায়েড রাইস জিনিসটা মফস্বলী নেমন্তন্ন বাড়িতে খুব প্রচলিত ছিল না। ১০ – ২০ – ২৫ পিস পোনা মাছ অনেকের কাছেই কোনো ব্যাপার ছিল না। সাথে পরিমান মত পোলাও বা ভাত।
এরপর হত আসল খেলা। পাঁঠার মাংস। ব্রয়লার ছেড়ে দিন দেশী মুরগিও ছিল প্রায় অচ্ছুত। অনেক বাড়িতেই তখন রাম পাখির (মুরগি) প্রবেশ ছিল নিষেধ। সস্তা-গন্ডার বাজার হলে কি হবে, সেই আয়োজন করতেই গৃহস্থের নাভিশ্বাস ওঠার দশা। তার মধ্যে এই সব খেলোয়াড়-দের সামলানো। সেকি চাট্টি খানি ব্যাপার। মাংস দেওয়া হত হাতা দিয়ে। খুব একটা গোনার ব্যাপার থাকত না। তার মধ্যেও এক কোনা থেকে আওয়াজ শুনেছি – “বালতিটা রেখে যান!” মানে পুরো বালতির মাংসটাই লাগবে !!
এর পর চাটনি পাপড়। যেন খানিকটা ড্রিঙ্কস ব্রেক। তারপর আবার ধুন্ধুমার ব্যাটিং। দই রসগোল্লা সন্দেস এসে গেছে। আবার সেই ২৫ -৩০টার হিসেব।
পরিবেশনের দায়িত্বে থাকত পাড়ার ছেলেরাই। কোমরে গামছা আর হাতে বালতি নিয়ে ভাত – মাংস দেওয়ার দায়িত্ব পাওয়া ছিল প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার বেসরকারী ছাড়পত্র। তার আগে বেশ কয়েক বছর থাকতে হত শিক্ষানবিশ। তখন নুন – লেবু আর জল দেওয়ার অধিকার পাওয়া যেত।

পরিবেশকদের পরিচালক হিসাবে সব বাড়িতেই থাকতেন বর বা কনের মামাবাবু গোছের কোনো মাতব্বর। নিমন্ত্রণ কর্তার তিনিই ত্রান কর্তা।একাধারে কোচ – ক্যাপ্টেন – স্ট্র্যাটেজিস্ট। তার খেলা শুরু হত খেলা শুরুর অনেক আগে। অনুষ্ঠানের দিন সকালে, এমনকি আগের দিন রাত থেকে। বাজার করার সময় থেকেই তার গেমপ্ল্যান রূপায়ন শুরু হত। কোন বাজারে কি সস্তা – কোথায় গেলে ওজনে ঠকার সম্ভাবনা কম – কোথায় সেরা জিনিসটা পাওয়া যায় – সব থাকত তাদের নখদর্পনে। এমনিতে হয়তো সেই মামাবাবু কাজ করেন কোনো পঞ্চায়েত অফিসে কনিষ্ঠ কেরানি হিসাবে। কিন্তু অনুষ্টান বাড়ির দায়িত্ব পেলেই কেরানির খোলস খুলে বেরিয়ে আস্ত শার্দুল জারক খাঁ!! মোল্লার চকের দই – কিংবা বনগাঁর কাচাগোল্লা। মালোতিপুর বা মালঞ্চের চিংড়ি কিংবা মল্লিকঘাটের ফুল – সব গুণমান, দরদাম তাদের কন্ঠস্থ।

এমন-ই এক গুণী মানুষের কাছে প্রথম শুনেছিলাম যে পাইকারি মাছ কিনলে “ধলতা” বলে একটা জিনিস হয়। যেটা আসলে একটা ডিসকাউন্ট বা ছাড় যেটা পাইকার দেয় খুচরো বিক্রেতাকে। দাম নেওয়ার সময় গোটা মাছের ওজন থেকে একটা অংশ বাদ দেওয়া হয়। বাজারে কেটে মাছ বিক্রি করলে কানকো, পেটের নাড়িভুড়ি সহ যে অংশগুলি বিক্রি হয় না, সেগুলির ওজন বাদ দিয়ে দাম ধরা হয়। অনুষ্ঠান বাড়ির জন্য মাছ কিনতে গেলে এই ধলতা -র ডিসকাউন্ট নিতেই হবে।

যে সময়ের কথা বলছি, তখনও মনমোহন সিং রাজনীতিতে আসেননি। পাড়ায় পাড়ায় তখন গজিয়ে ওঠেনি সুতৃপ্তি, পরিতৃপ্তি, রসনাতৃপ্তি নামের ক্যাটারার সংস্থাগুলি। নেমন্তন্ন বাড়ির পুরো রান্নাটা বাড়িতেই করা হত। জ্ঞান ঠাকুর, ওঙ্কার ঠাকুর নামের রান্নার জাদুকররা বিশাল বিশাল উনুনে পেল্লাই লোহার কড়াই চাপিয়ে রান্না করতেন। ভাজাঘুজি রাখা হত কাঠের বারকোষে আর অন্য রান্না রাকাহ হত নৌকায়। হ্যা ঠিকই পড়ছেন। নৌকায়। এক ধারনার কানা উঁচু – কড়া দেওয়া লোহার বাসন।

গৃহকর্তার বাজেট বুঝে কাজ নামানো ছিল এই মামাবাবু – কাকাবাবুদের আর একটি কুশলতা। প্রথমেই তারা নিমন্ত্রিতের তালিকা ভলো করে খুঁটিয়ে দেদ্খে নিতেন। বয়স্ক ও শিশু কয়জন। কিশোর বা যুবক কয়জন। মেয়েদের মধ্যে বিবাহিত অবিবাহিতের সংখ্যার দিকেও নজর রাখতে হত। এই রকম একজনের কাছে জেনেছিলাম যে অবিবাহিত মেয়েরা কম খায়, কিন্তু বিবাহিত কম বয়সী মেয়েরা খুব খায়। এই ভাবে নিমন্ত্রেতদের প্রোফাইল বুঝে ফর্দ করতে বসতেন।
এর পরের অংশে থাকত রান্নার ঠাকুরের সাথে পার্টনারশীপ।আর আলোচনা। “বুঝলে ঠাকুর, গড়ে ১২৫ গ্রাম মাংস ধর। ২২৫ জন নিমন্ত্রিত আছে। তুমি ২০০ হিসাবেই চল। কিন্তু ছেলে ছোকরা প্রচুর। একটু বেশি করে চর্বি এনে দেব হয়ে যাবে। বেশি টানতে পারবে না। ঠাকুর হয়তো তার সাথে যোগ করলো – “পরিবেশনটা দেখে করবেন বাবু, যাতে নষ্ট না হয়। আমি ঝোল না হয় একটু বেশি ঝাল করে দেব।শর্ট ফেলতে দেব না বাবু ! আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন!”
এই সব ‘war room’ স্ট্রাটেজি। আর আপনি কোচ। কিন্তু খেলবে আপনার হয়ে পরিবেশনকারীরাই। তারা খেলবে এই মামাবাবুর শ্যেন দৃষ্টির নিচে। যে ব্যাচ মনে হবে মনে হবে বেশি টানছে, সেখানে মাংসর বালতিতে ঝোল বেশি আর মাংসের টুকরো কম থাকবে। কায়দা করে সেটাই চালাতে হবে। তবে না তুমি ষ্টার স্ট্রাইকার !

অন্যদিকে তার তীক্ষ্ণ নজর থাকবে ভাড়ারের দিকেও। ভাড়ারের জিনিস আর অবশিষ্ট কত জন খেতে বাকি – সেই অঙ্ক মনে মনে কষে চলতেন এই মহাপুরুষেরা। সেই বুঝে নির্ধারিত হত পরিবেশনের কৌশল।

আবার পাত পেরে যিনি খাচ্ছেন, তিনিও তো শিল্পী। ঝোল পরে থাকবে শুধু মাংসের টুকরো খাওয়া হবে। রসগোল্লা খাবেন একদম রস চিপে। যাতে আরো বেশি ‘টানা’ যায়। এমন অভিজ্ঞতাও হয়েছে যে ব্যাচের সবাই খাওয়া থামিয়ে দু’তিন জনের খাওয়া দেখছে।

পাশাপাশি দু’জন বসেছেন খেতে।মনে করুন ‘ক’ বাবু এবং ‘খ’ বাবু দু’জনেই ভালই টানছেন , তাই অপর পক্ষের নজরেও পড়েছেন। সেই জন্য দ্বিতীয় বার যাচাই করার সময় একটুকরো মাছ বা দুটো রসগোল্লা দিয়েই পরিবেশনকারী ছোকরা কেটে পড়েছে। কিন্তু এভাবে তো বসে থাকা যায় না। ‘ক’ বাবুই প্রথম বেশ জোরেই ছোকরাকে ডাকবেন। একবারে না শুনলে – আবার। এবার সে মাছ বা মিষ্টির ট্রে নিয়ে কাছে এলেই – ‘খ’ বাবু-কে দেখিয়ে বলবেন- “ওনাকে আরো কয়টা মাছ দাও!” এদিকে ‘খ’বাবুও ইঙ্গিতটা বুঝে এবং অবশ্যই কৃতজ্ঞতায় বলে উঠবেন “আরে দেখছ কি? ‘ক’বাবুর পাত তো দেখছি খালি। দাও,দাও ভালো দেখে ক’টা পেটির পিস দাও দেখি!”
দুই বাবু-ই ‘না – না ‘ করবেন। তবে এই ‘না-এর মানে ‘হ্যাঁ’-‘হ্যাঁ’। একটা শ্লোক শুনেছিলাম। যেটা আবার পরিবেশনকারীর জন্য কর্তব্যকর্মের নির্দেশও বলা যায়। শ্লোকটা ছিল :
হ্যাঁহ্যাঁ দদ্দ্যাৎ হুঁহুঁ দদ্দ্যাৎ
দদ্যাশ্চ হস্ত কম্পনে
শিরশি কম্পনে দদ্দ্যাৎ
না দদ্দ্যাৎ ব্যাঘ্র ঝম্পনে
অর্থাৎ অতিথিটির সামনে খাবার দেওয়ার সময় যদি দেখেন যে তিনি হাহা -হুহু করছেন, বা হাত নেড়ে আরো খাবার দিতে বারন করছে, তখন অবশ্যই দেবেন। তারপরেও যদি দেখেন যে মাথা নেড়ে না করছেন, তখনও দিতে ভুলবেন না। তবে যদি দেখেন যে বাঘের মতো ঝাঁপ দিয়ে পাত থেকে উঠে পড়ছেন, তখন আরো খাবার না দেওয়াই উচিত হবে।

পরিবেশনকারীদের মধ্যে স্পেশাল স্ট্যাটাস থাকত দই পরিবেশনকারীর। সবার হাতে দইয়ের হাঁড়ি ছাড়া যেত না। পাঁচ কিলোর ভাড় থেকে দই এমন ভাবে কেটে দিতে হবে, যেন সবাই মাথার অংশ পায় আবার ভাড় শেষ না হওয়া পর্যন্ত দই থেকে যেন জল কেটে না যায়!

এর মধ্যে নিমন্ত্রণ কর্তা বার দুই ঘুরে যাবেন। তিনি পরিবেশনকারীদের নির্দেশ দেবেন – “এইযে তোমরা একটু সরকার বাবুকে একটু দেখো। ওনার পাতা তো একদম খালি !!” অবশ্য খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে যে পাতের এক পাশে মোটামুটি মাছের কাঁটা আর মাংসর হারের ছোট একটা পাহাড় জমিয়ে ফেলেছেন তিনি ইতিমধ্যে। জনে জনে জিজ্ঞেস করবেন – “রান্না ভালো হয়েছে তো?” মাংস সেদ্ধ ঠিক ছিল? ঝাল বেশি হয় নি তো?” আর এদিকে ঝালে জিভ জ্বলে গেলেও এক ঢোক জল খেলে বলতে না “না – না – দারুন রান্না!”

এই যুদ্ধের বাজারে কাহিনীতে অনেক সময় থাকত আরো সাব-প্লট। বিয়ে বা বৌভাতের অনুষ্ঠানে ‘বরযাত্রী ব্যাচ’ বা ‘কনেযাত্রী ব্যাচ’ বলে একটা ব্যাচ থাকত। সাধারন নিমন্ত্রিতদের সেখানে প্রবেশাধিকার থাকত না। বিশেষ করে বর যাত্রীর ব্যাচে। একমাত্র বিশেষ অতিথিদের ক্ষেত্রে ছাড় থাকলেও থাকতে পারত – যেমন নিমন্ত্রণ কর্তার বড় ছেলের অফিসের বড়বাবু বা খবরের কাগজের রিপোর্টার মেশোমশাই, ইত্যাদি কেষ্ট, বিষ্টুরা। তার একটি কারন যেমন ছিল নতুন আত্মীয়দের বিশেষ আপ্যায়ন, তেমনি আর একটি কারণ ছিল স্পেশাল মেনু। সর্বসাধারণের জন্য যদি লুচি থাকে, কনেযাত্রীদের জন্য রাধাবাল্লাভি। সকালের জন্য শুধু মাংস হয়ে থাকলে, বরযাত্রীদের জন্য মাছের কালিয়ার অতিরিক্ত পদ। আবার সাথে কাঁচাগোল্লা। অনটনের মধ্যে সামাজিক লৌকিকতা রক্ষায় মধ্যবিত্ত গৃহস্থকে কত কিম্ভূত নিয়মই যে আবিষ্কার করতে হত !!

শেষ পাতে পান মুখে দিয়ে ফেরার পথে গৃহকর্তার কাছে বিদায় নেওয়ার সময় আর একবার বলা দস্তুর ছিল – “আরে দত্তবাবু, মাছটা যা ভালো হয়েছিল না !” আর দত্তবাবু মনে মনে বলবেন “হ্যা ভালো তো হবেই, আমার হীরের আংটিটা যে ওতেই গেল!!”

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s