পংক্তি ভোজন

সেকালে লোকের খাওয়াও ছিল দেখার মতো। বিশেষ করে কিছু মানুষ এমন ছিলেন, যাদের ব্যাপার বাড়িতে খাওয়ার জন্যই বিশেষ ভাবে নিয়ে যাওয়া হতো। এক মণ খাদ্যদ্রব্য খেতে পারতেন এমন একজনের নাম ছিল “মুনকে রঘু”। যিনি অর্ধেক মণ সাঁটাতে পারতেন – তার নাম “আধমণি কৈলাস”। নিমন্ত্রণ খাওয়াই ছিল তাদের পেশা। বিশ্বাস হচ্ছে না? দেখুন বিমলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কি লিখে গিয়েছেন :
“এক মণ খাদ্য খেত একই বৈঠকে,
অদৃষ্টে হয়নি দেখা মুনকে রঘুকে।
আধমণি কৈলাস ব্রাহ্মণ আধাসিধে,
বিপুল খাবার রাশি খেয়ে মেতে ক্ষিধে।
রঙ্গপুর জমিদার তনয় বিবাহ,
কলিকাতা আসি কারও করেন নির্বাহ।
সেই উপলক্ষে বিপ্র পেয়ে নিমন্ত্রণ,
মোদের মেসেতে আসিয়া হাজির হন।
নানা ধনী গৃহে তিনি প্রত্যহ খেতেন,
নগদ বিদায় ধুতি চাদর পেতেন।
নিমন্ত্রণ খেয়ে তাঁর চলিত সংসার,
আক্ষেপ পারে না খেতে পুত্রগণ তাঁর। ”

শুধু যে শহর কলকাতায় এখন ভোজন পটু মানুষের দেখা পাওয়া যেত, এমন নয়। মা’র কাছে শুনেছি যে সিলেটের মৌলভীবাজারে তাঁদের গ্রামেও কমল ভট নামে এমনই এক ব্রাহ্মণ ছিলেন। আগে যেমন মাটিতে বাবু হয়ে বসে খাওয়া হতো, তেমন করে শুরু করতেন। তারপর ক্রমে এক পা ছড়িয়ে তারপর দুই পা ছড়িয়ে বসে খেতেন। খাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় শুয়েই পড়তেন ভদ্রলোক। “আরোগ্য নিকেতন” উপন্যাসেও এমন এক চরিত্রের সাথে পরিচয় করিয়েছেন তারাশঙ্কর। আর সাহিত্যকে যদি জীবনের প্রতিচ্ছবি বলে স্বীকৃতি দিয়ে থাকি তবে পোটলডাঙার টেনিদা-কে ভুলি কি করে – যার কাছে একবারে গোটা আষ্টেক সিঙ্গারা বা তিরিশটা পিঠে খাওয়া কোনো ব্যাপারই ছিল না।

মহেন্দ্রনাথ দত্ত জানাচ্ছেন যে সেই সময় মানুষের শারীরিক আয়তন এখনকার তুলনায় বিশালাকার ছিল এবং তারা প্রচুর পরিশ্রম করতেন। রাজপুর হরিনাভির মতো দূরদূরান্ত থেকে লোকে পায়ে হেঁটে ক’লকাতার অফিসে যাতায়াত করতো। এর ফলে লোকের খোরাকি বেশি ছিল। শহরের লোকেরা দিনে আড়াই পোয়া চালের ভাত খেত। আর রাতে আধ সের চালের ভাত। তার সঙ্গে পরিমান মতো তরকারি। অনেকের বাড়িতে গরু থাকত – তাছাড়ার অন্যরা গয়লার দুধ নিতো। সেই দুধও সস্তা। এর তুলনায় গ্রামের লোকেদের খাওয়া ছিল আরো বেশি। মহেন্দ্রনাথ বলছেন যে তাদের বাড়িতে যখন ক’লকাতার দক্ষিণ দেশ বা বর্ধমান থেকে কোনো লোক আসতো, তারা দুপুরবেলা তিন পোয়া চালের ভাত খেত – আর রাতে কিছু কম। আড়ালে তাদের রাক্ষুসে লোক বলা হতো। (০.৯৩৩১০ কিলো = ১ সের = ৪ পোয়া )

বিশেষ করে বরযাত্রীদের মধ্যে একদল ‘অশিষ্ট’ লোক থাকত – যাদের বিয়েবাড়িতে আসার উদ্দেশ্যই ছিল কন্যাপক্ষের অনিষ্ট করা। এই অনিষ্ট সাধনের একটি উপায় ছিল খাবার “শর্ট” ফেলে দেওয়া। এক এক জন ভোজন বীর এতো খাবার খেয়ে নিতেন যে পর্যাপ্ত আয়োজন করার পরেও খাবার কম পরে যেত। সে ছিল এক অদ্ভুত মর্ষকাম আনন্দ। যোগেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায় “স্মৃতিতে সেকাল” বইতে জানাচ্ছেন যে শুধু খাওয়াই নয়, খেতে বসে লুচি, মিষ্টি – জানলা দিয়ে ফেলে দিয়েও নষ্ট করত অনেকে। তারপর বাড়ি ফিরে বন্ধুবান্ধবদের কাছে পাঁচকাহন করে সেই সব “বীরত্বের” গল্প শোনাত। আর এমন করতে গিয়ে ধরা পড়লেই ঝগড়া, মারামারি অশান্তি।

খেতে বসে পড়লেই হলো না। ব্রাহ্মণদের সাথে এক পংতিতে বসে খাওয়ার অধিকার ছিলনা অব্রাহ্মণদের। হ্যাঁ, গত শতকের প্রথম অর্ধেও। খোদ শহরের এমন এক গল্প শুনিয়েছেন যোগেন্দ্রমোহন দত্ত – তার “যম দত্তের ডায়েরিতে” (কি যে অদ্ভুত এক বই !!)
“এঁড়েদার উমেশ মিত্রের পুত্র বড়দা মিত্র সেকেলে এল এম এস পাশ ডাক্তার। বাল্যকালে তাঁহার বড় ভূতের ভয় ছিল। যখন তাঁহার বয়স ১৩/১৪ বৎসর, তখন একবার পার্শ্ববর্তী বেলঘরিয়া গ্রামে নিমত্রন রক্ষা করিতে গিয়াছেন। গৃহস্থ যেমন বলিলেন ব্রাহ্মণদের পাতা হইয়াছে, বরদাবাবু অমনি তাড়াতাড়ি চাঁদের আলোয় আলোয় বাড়ি ফিরিবেন বলিয়া ব্রাহ্মণদের সহিত বসিয়া গেলেন। খাওয়া আরম্ভ হইয়াছে এমন সময় এক ব্যক্তি তাহাকে ব্রাহ্মণ নয় সন্দেহ কোরিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, – ওহে ছোকরা! তোমার নাম কি? বরদাবাবু অমনি অম্লানবদনে বলিলেন, আজ্ঞা আমার নাম শ্রী বরদাপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়। প্রশ্নকর্তা পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, কোন মেল? কাহার সন্তান? (কুলীন প্রথা ও মেল নিয়ে অন্য সময় বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে ) বরদাবাবুর শুনা ছিল খড়দহ মেল্, আর ধনপতি চাটুজ্যের সন্তান। তিনি তাহাই বলিলেন। প্রশ্নকর্তা চুপ করিয়া চলিয়ে গেলেন। কিন্তু তাহার সন্দেহ ঘুচে নাই।
ক্রমে খাওয়া শেষ হইয়া আসিল। পাতে দই, সন্দেশ পড়িতেছে। এমন সময় সেই প্রশ্নকর্তা এঁড়েদার অপর ব্যক্তিকে সঙ্গে করিয়া আসিয়া পুনরায় প্রশ্ন করিলেন – ছোকরা তোমার নাম কি? বরদাবাবু পূর্বের ন্যায় বলিলেন, শ্রী বরদাপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়। পিতার নাম? আজ্ঞে শ্রী উমেশচন্দ্র মিত্র !! প্রশ্নকর্তা রাগিয়া বলিলেন যে, আমার সঙ্গে ফাজলামি! বাপের নাম ভাড়াইতে লজ্জাবোধ হয় না। ”

পাশাপাশি আরেকটা ঘটনার কথা বলি। কোনো নিমন্ত্রণ বাড়িতে সমবয়সী বান্ধবীদেরএক সাথে খেতে বসেছে মেয়েটি । বন্ধু মানে গ্রামের সমবয়সী মেয়েরা – যারা সাথে একসাথে খেলাধুলা করে, পাঠশালায় যায়। ব্রাহ্মণ, অব্রাহ্মণ সকলেই আছে সেই দলে – যারা একসাথে পংক্তিতে বসেছে। খেতে খেতে কি একটা হাসির কথায় অব্রাহ্মণ মেয়েটি সেই ব্রাহ্মণ বন্ধুদের মধ্যে একজনকে ছুঁয়ে দিয়েছে। আর সেই ব্যাপারটা দেখে ফেলেছে তার ঠাকুমা। ব্যাস, আর যায় কোথায়। অর্ধেক খাওয়া থেকে উঠিয়ে মেয়েকে স্নান করিয়ে ঠাকুমা ঘরে তুললো। অব্রাহ্মণ মেয়েটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে রইলো পাতে। পরে বিভিন্ন সময় আলোচনা করতে গিয়ে নিজেই বলেছেন যে সে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল ঘটনার আকস্মিকতায়। যাদের সাথে সারাদিন একসাথে খেলা যায়, পড়া যায়, গল্প করা যায় – খাওয়ার সময় তাদের ছুঁয়ে দিলে কি এমন পাপ হয়, সেটা বুঝে উঠতে পারেনি মেয়েটি। দেশের অনেক কথা ভুলে গেলেও, আজ প্রায় সত্তর পঁচাত্তর বছর পরেও সেই স্মৃতি দগদগে।

খেতে বসার আগে মেয়েদের জন্য ছিল আরেক প্রস্থ ঝামেলা। জরির কাপড়, বেনারসি কাপড় – এই সব ছেড়ে সুতির কাপড় পরে খেতে বসার রেওয়াজ ছিল “ভদ্র” বাড়িতে। এই নিয়ে মজার গল্প শুনিয়েছেন শরৎকুমারী চৌধুরানী। “কতক্ষন পরে একজন এসে সকলকে বললে – পাত হয়েছে, আপনারা উঠে আসুন। এই ‘উঠে আসুন’ বলার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা খেতে যেতে পারতেন না – তাদের আর একটা কাজ ছিল – তার পরে সব কাপড় ছাড়তে আরম্ভ করলে। আমি কাপড় ছাড়িনি বলে আমার ভারী একটা নাম বেরিয়ে গিয়েছিল – কেউ ভেবেছিল খ্রীষ্টান, কেউ ভেবেছিল ব্রহ্মজ্ঞানী। সকলেরই চোখ আমার দিকে, আমি তো ভালো বিপদেই প’ড়ে গিয়েছিলাম। ”

সামাজিক আদানপ্রদানের পরিবর্তনটাও দেখুন কিভাবে সিনেমার মতো ফুটে ওঠে এই সব ঘটনা খেয়াল করলে ! ভুলভাল নিয়ম যেমন আছে – সেই নিয়ম ভাঙার চেষ্টাটাও রীতিমত চোখে পড়ে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s