নিমন্ত্রণ বাড়ির মেনুর বিবর্তন

বিরিয়ানি আর নানা মোগলাই পদ আসা ইস্তক গত শতকের শেষ তিন চার দশক ছাপোষা বিয়েবাড়ির খাবারের মেনু মোটামুটি একই ছিল। সাধারণ বাড়িতে ঘুরেফিরে সেই লুচি, ছোলার ডাল, বেগুনভাজা, পোলাও, মাছের কালিয়া, পাঁঠার মাংস, চাটনি, পাঁপড়, দই, মিষ্টি – এই ছিল মেনু । শহরতলীর সাধারণ বাড়িতে সেদিন পর্যন্ত (মানে ধরুন আশির দশকের গোড়া অবধি) রান্নার ঠাকুরদের-ই রমরমা।

বিজলি গ্রিলের মতো ক্যাটারিং সংস্থাও পাশাপাশি পরিষেবা দিয়ে এসেছে । ভবানীপুরের বিজলি সিনেমার পেছনে একটা ছোট খাবারের দোকান থেকে শুরু হয় বিজলি গ্রিল। আগে নাম ছিল বোধয় দীপ্তি কেবিন। শহরের প্রথম নামী ক্যাটারার। তারপর বিদেশী ক্রিকেট টিমগুলিকে ইডেনে খেলার সময় পরিষেবা দিয়ে আর সেই খবর আনন্দবাজারের রিপোর্টিংয়ের দৌলতে নাম ছড়িয়ে পড়ল ঘরে ঘরে। আজ বিজলি গ্রিল-কে ছুঁয়েই পর্বটা শুরু করি।

বিয়ে বাড়ির মেনুতে রকমফের শুরু হয় ক্যাটারারদের মাধ্যমেই। মাঝে মাঝে এক আধটা পদ নিয়ে বেশ গোলমাল বেঁধে যেত। যেমন ধরুন নারায়ণ স্যান্যালের মেয়ের বিয়েতে উপস্থিত আচার্য সুনীতিকুমার। রান্নার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বিজলি গ্রীল-কে। একটু তাড়া থাকায় প্লেটে করে মেন্ আইটেমগুলি সুনীতিকুমারের সামনে ধরা হলো। তার মধ্যে হটাৎ একটা খাবারের দিকে নির্দেশ করে উনি জানতে চাইলেন, সেই খাবারের নাম কি। ম্যানেজার ভদ্রলোক বললেন – “স্যার , ওটা ফিস ওলী”। ব্যাস আর যায় কোথায়। প্রথমে জিজ্ঞেস করলেন বানান। সে কি আর ক্যাটারারের বিদ্যের মধ্যে কুলোয়? তিনি বাংলায় বানান বললেন – ‘ও’ আর ‘লয়ে দীর্ঘঈ’। সুনীতিকুমার বললেন – “ওতো সাঁত্রাগাছির ওলের স্ত্রী লিঙ্গ। রোমান হরফে বানান বলুন।” ম্যানেজার এবার নিজেই অজ্ঞতা স্বীকার করে বললেন, ঠিক জানি না। বোধহয়, OLEE. । শুনেছি জার্মান,……নয় ফ্রেঞ্চ্ ডিশ্। এবার সুনীতিকুমার হাত গুটিয়ে নিলেন। বলেন, উহুঁ। জার্মান ভাষায় ভাজাকে বলে gebacken অথবা gebraten ; ফরাসি ভাষায় ভাজা মাছ হচ্ছে frit poisons । ‘ওলী’ তো জার্মান-ফরাসী খাদ্য তালিকায় নেই। ‘ওলী’ শব্দটা কোথা থেকে এল ? মাথায় উঠল খাওয়া। উনি আরও ভেবে বললেন, স্প্যানিশ ভাষায় যতদূর মনে পড়ছে মাছ ভাজা হচ্ছে frito pescado – ইতালিয়ান ভাষায় Fritte pesce । OLEE কোথা থেকে এল?
বুঝুন গৃহকর্তার অবস্থা !!

এতো গেল গত শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধের গল্প। কিন্তু সেই তুলনায় আঠারো শতকের প্রথম দিকে ঘটনা কিন্তু একদম অন্য রকম। কোথায় তখন মাছ মাংস ? বিয়ে বাড়ির মূল খাদ্য তখন দই চিড়ে ঘি – মানে যাকে বলা যায় ফলার। স্বামীজীর ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত এই মেনুর বিবর্তনতা খুব ভালো ধরেছেন নিজের লেখায়। সেখানেই দেখছি যে ওনার শৈশবে (১৮৭০-এর আশেপাশে) প্রথম ময়দার প্রচলন হলো। বিয়েবাড়িতে এলো লুচি আর আলুনি কুমড়োর ছক্কা। কলাপাতায় সেই বড়বড় লুচি আর আলুনি ছক্কার প্রশংসা সূত্রে সেই সব রাঁধুনিদের রান্নার কথাও বার বার মনে করিয়ে দিয়ে গেছেন। এর পর মাটির সরায় আসতো কচুরি – যাকে “কর্ম বাড়ির” কচুরি বলেছেন মহেন্দ্রনাথ – কড়াই ডালের পুরে আদা আর মৌরি দিয়ে তৈরী কচুরি। সরার মধ্যে আরো থাকতো নিমকি, খাজা, চৌকো গজা, মতিচুর – ইত্যাদি। শেষে আসতো ক্ষীর আর দই। ক্ষীর খাজা দিয়ে খাওয়া হতো। একে ক্ষীর-খাজা বলা হতো। সরার মধ্যে আরও থাকতো চার রকমের মিষ্টি। তিন রকমের মিষ্টি যে দেওয়া হতো না, সেটা বিশেষ করে লিখেছেন। মহেন্দ্রনাথ লিখেছেন যে ১৮৭৩-৭৪ নাগাদ প্রথম বিয়েবাড়িতে রসগোল্লা খাওয়ার প্রচলন হয়। তার সাথে সাথে আসে তিলকুট। তার সাথে পরিবেশিত হতো আমসন্দেশ, কামরাঙ্গা সন্দেশ। তার আগের যুগে দেওয়া হতো পেনেটির গুপো সন্দেশ।এই গুপো সন্দেশ সম্পর্কে একটু বিশদে বলি। সেটা দেখতে ছিল দুখানা ফেনী বাতাসা একসঙ্গে জোড় দেওয়ার মতো। গুপো সন্দেশের বৈশিষ্ট্য হল যে এটি শুধুমাত্র গরুর দুধের ছানা থেকেই তৈরী হয়। গুপো সন্দেশ হল মাখা সন্দেশ থেকে প্রস্তুত এবং পাশাপাশি চেপে লাগানো এক জোড়া গোলাকৃতি সন্দেশ। গুপো সন্দেশকে বাংলার প্রথম ব্র্যান্ডেড মিষ্টি বলে মনে করা হয়। কোনো নামে বা ব্রান্ডের (এখানে জায়গার – অর্থাৎ গুপ্তিপাড়া – সেখান থেকে গুপো ) মিষ্টি। কথিত আছে যে হুগলী জেলার গুপ্তিপাড়াতেই সন্দেশের জন্ম। এখানেই প্রথম তৈরী হয় সন্দেশের মিশ্রণ যা মাখা সন্দেশ নামে পরিচিত। ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগে পানিহাটির (যাকে মহেন্দ্রনাথ “পেনটি” বলেছেন) গুপো সন্দেশ কলকাতায় খুব জনপ্রিয় হয়।

বাকিটা আইটেম-গুলোর গল্প শুনুন মহেন্দ্রনাথের নিজের ভাষায় – “ক্রমে ক্রমে শাক ভাজার আবির্ভাব হইল পরে পটল ভাজা বাহির হইল। এই পর্যন্ত হইয়াই গতিরোধ হইল। আর বিশেষ উন্নতি হইল না। তারপর হঠাৎ ইংরাজী পড়ার ঠেলায় নুন দেওয়া ছোলার ডাল বাহির হইলেন এবং নুন দেওয়া আলুর দম প্রকাশ পাইলেন এবং আলুনী ঠাণ্ডামূর্তি কুমড়ার ছক্কা গঙ্গায় ঝাঁপ দিলেন, তিনি আর ভদ্রলোকের পাতে প্রকাশ পাইতেন না। ক্রমে ক্রমে পাঁপড়, সিঙ্গারা প্রকাশ পাইল এবং সরা সাজান লোপ পাইল এবং দু-একটা মিষ্টি ও গুঁজিয়াতে পর্যবসিত হইল।”

এই জায়গাটা লিখতে লিখতে গুরুভাইদের সাথে স্বামীজীর গুরুমায়ের হাতে তৈরী আটার রুটি আর ছোলার ডাল খাওয়ার গল্পটা মনে পড়ল। যেখানে ঠাকুর অন্য্ শিষ্যদের রুটির বরাদ্দ করে দিচ্ছেন – কারণ বেশি খেলে সাধন-ভজনে ব্যাঘাত ঘটবে। ছাড় কেবল নরেনের। সে যত খুশি খেতে পারে। দেখুন সময় সারণিতে কেমন মিলে যাচ্ছে।
লেখকের ব্যক্তিগত পছন্দ ও অপছন্দের বিষয়টি বাদ দিয়ে আমরা যদি তথ্যগুলিকে পরপর সাজাই, তাহলে কিন্তু মোটামুটি এই মেনু-র বিবর্তনের একটা চেহারা খুঁজে পেতে পাই।

শরৎকুমারী চৌধুরানী ও মোটামুটি একই মেনুর কথা শুনিয়েছেন।
“তখন ছিল প্রকান্ড মোটা লুচি, ভাজি দু’ এক খানা থাকলেও থাকতে পারত, বাঁধাকপি বা বিলিতী কুমড়োর তরকারি। বাঁধাকপি তখন আজকালকার মতো সুলভ ছিল না, আর তরকারিতে লবন দেবার প্রথা-ই ছিল না, ভোক্তাকে পাত্রপার্শ্বস্থিত লবন মেখে নিতে হত; ক্রমে বুটের ডাল ও একটা চাটনি প্রবেশলাভ করেছিল। সঙ্গে কচুরী, সিঙ্গারা, নিমকী, পাঁপরভাজা, মিষ্টান্নের জন্য দু’খানি সরা ..”

এতো সব আলোচনার পর একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস বাকি থেকে গেল। কি বলুন তো? ঠিক ধরেছেন। মাছ মাংসের ব্যাপারটা। আমার মতোই আপনারাও অনেকেই হয়তো শুনে এসেছেন যে বাঙালি হিন্দু বিবাহের অনুষ্ঠিত হয় বৈদিক আচার অনুষ্ঠানের উপর ভিত্তি করে। সেই কথা যদি সত্যি বলে ধরি, তবে দেখবো যে আর্য সভ্যতার প্রথম যুগে অতিথিসেবার জন্য একটি পূর্ণ বয়ষ্ক গরু মেরে তার মাংস রান্না করে মধুপর্কের সঙ্গে দেওয়া হতো বৈবস্বত মনুর পুত্র পৃষধ্র নামে রাজার যজ্ঞে অজস্র গো বোধ করায় অতিসার রোগের আবির্ভাব হয়। এর পর অতিথি সেবায় গরু আনা হলেও, তাকে না মেরে ছেড়ে দেওয়া হয়। (নিষেধ বাক্যটি ঋগ্বেদে ৮/১০১/১৫ সূক্তে)। আর্য সমাজে গরু খাওয়ার প্রথা একেবারে উঠে গেলে শুধুমাত্র নিয়মরক্ষার জন্য একটা গরু এনে বিবাহ মণ্ডপে বেঁধে রাখা হতো। এখন গৃহস্বামী বা নাপিতকে “গৌর্গৌর্গৌঃ” বলতে হয়। গঙ্গাপাড়ের বিবাহ রীতিতে দেখতে পাই যে তার সঙ্গে সঙ্গে নাপিত-কে কিছু মজার ছড়া বলতে শোনা যায়।

সুতরাং এক সময় নিমন্ত্রণ বাড়িতে আমিষ ভোজন চালু ছিল। তারপর মাঝে বন্ধ হয়ে যায়। তারপর আবার শুরু হয় আঠারো শতকের শেষের দিকে। সেই পুনরায় শুরু হওয়ার গল্পটাও আমরা খুঁজে পাই মহেন্দ্রনাথের লেখায়। বিয়ে বাড়ি নয়, পৈতে বাড়ির গল্প ; তবে ইতিহাসটা ঠিক বোঝা যায়।

“আমরা একবার রাত্রে এক ব্রাহ্মণ বাড়ীতে উপনয়নের নিমন্ত্রনে গেছি। তখন নুন দেওয়া তরকারী খাবার প্রচলন হইয়াছে। হঠাৎ মালসা খুরি হাতে মাছের তরকারির আবির্ভাবে সকলেই হাঁ হাঁ, কি করেন, জাত গেল, ধর্ম গেল। বোধ হয় সকালেই সকলকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে ! এই তো কটা বুড়োয় রব তুললে। আমরা ছোকরার দল লোলুপ দৃষ্টিতে মালসার দিকে আর পাতের দিকে চাহিতে লাগিলাম, যদি মা কালীর কৃপায় লুচিতে আর মাছেতে সংযোগ হয় ত সাক্ষাৎ বৈকুন্ঠ তখনই পাই। এমন সময় আমাদের দিকের একটা বুদ্ধিমান লোক বললে, “কি জান, আমরা কায়স্থ, তা ব্রাহ্মণের পাটের এঁটো খেলেও জাত যায় না, ব্রাহ্মণের বাটিতে মাছের তরকারি প্রাসাদের সামিল …” – এই সব স্মৃতি বচন আওড়াইল। তখন “আমাকে দাও” “আমাকে দাও” করে গামলা ফুরাইয়া গেল। আবার আনতে গেল। পরদিন সকালে খুব ঘোঁট হ’ল। আমরা খেয়েছিলাম তাই মহাদোষী, সকলেরই হয়তো প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয়। বিশেষ বাড়াবাড়ি হল না কারণ আমরা বুড়োদের মানতে নারাজ। এই ভাবে আলুনি কুমড়োর ঘন্টা থেকে নানা রকম তরকারী হইল।”

নিমন্ত্রণ বাড়িতে আমিষ খাওয়া নিয়ে এতো ঘোঁট পাকানোর ইতিহাস নথিবদ্ধ করলেন মহেন্দ্রনাথ। অথচ সেই প্রথাই কয়েক দশক পরে সাধারণে এতটা মান্যতা পেয়ে গেল, যে আমিষ না খাওয়ালেই খুব নিন্দে হতো নিমন্ত্রণ কর্তার। এমন-ই একটি ঘটনা দেখা যাচ্ছে যতীন্দ্রমোহন দত্তের (১৮৯৪-১৯৭৫) লেখা “যম দত্তের ডায়েরীতে”। দেখুন কি নির্মম হতো সেই সমালোচনা :

“কিছুদিন আগে থাম-ওয়ালা বাড়িতে কন্যাপক্ষের নিমন্ত্রিত হইয়া গিয়েছিলাম। কন্যার পিত অল্প বয়সে মারা গিয়েছেন। কন্যার পিতামহ বিবাহ দিতেছেন। কুলপ্রথা অনুযায়ী আহারাদি নিরামিষ ব্যবস্থা। প্রায় ৩০/৪০ রকম নিরামিষ পদ, আমিষের অভাব নিরামিষ পদের প্রাচুর্য দ্বারা যেন পুরাইয়া দিয়েছে। একেবারে সাতশত লোক আহারে বসিয়াছে। এমন সময়ে রামখুড়ো বলিয়া উঠিলেন, এ যে দেখিতেছি মেয়ের বিবাহ নয়, মেয়ের বাপের শ্রাদ্ধ, সবই নিরামিষ। পাশ থেকে সাহেব দত্ত বলিয়া উঠিলেন, হবে না? বাবা (ঠাকুরদা) থাকিতে মেয়ের বাবা মারা গিয়েছে; শ্রাদ্ধ হয় নাই। সেই জন্য দুই কাজই এক সঙ্গে সারা হইল। কি বল মদন? বলিয়া কন্যাপক্ষীয় কর্মকর্তার মদনের দিকে চাহিলেন, মদন নিরুত্তর। ”

আগের একটা লেখায় মন্তব্য করতে গিয়ে রণজয়-দা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে রাজ্য সরকারের অতিথি নিয়ন্ত্রণের জামানায় চালের আকালের জন্য ভাত-পোলাও -এর উপর কড়াকড়ি থেকেই মেনুতে প্রথম লিবারেলিজম ঢুকলো। রাধাভল্লভী আর হরেক ময়দার পদ দিয়ে। এই তথ্যটাও খেয়াল করার মতো।

আমার নিজের যতদূর মনে পড়ে, প্রথম ব্যাপার বাড়িতে বিরিয়ানি খাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল ১৯৮৫-৮৬ সালের আশেপাশে। আমদের পাড়ার একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন ডাক্তার গোপাল সাহা। বসতেন যশোর রোড – অমর পল্লীর মোড়ে ‘মেডিকাস’ বলে ওষুধের দোকানটায়। পাড়ার লোক (এবং অবশ্যই মাসকাবাড়ি পেশেন্ট) হিসাবে উনার মেয়ের অন্নপ্রাশনে নেমন্তন্ন পেয়েছিলাম। সাতগাছির P&T কোয়াটারের কমিউনিটি হলে পেল্লাই আয়োজন হয়েছিল। মেনু বলতে একটা ফ্রাই, স্যালাড, মটন বিরিয়ানি, চিকেন চাপ আর আইসক্রিম !! আমার খুব ভালো মনে আছে যে ছিমছাম মেনু করার জন্য খুব প্রশংসা হয়েছিল।

তখন থেকেই শহরতলীর মানুষের আবার একটা রুচির পরিবর্তন ঘটছিল। এর পর খুব দ্রুত বিরিয়ানি ক’লকাতার বাঙালিদের জাতীয় খাবার হয়ে গেল। শহর আর শহরতলীর বিভেদটাও ধীরে ধীরে মুছে যেতে শুরু করলো।

সাথে ছবি – পেনেটির ‘গুপো’ সন্দেশ – source wilipedia)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s