বিয়ে বাড়ি উপলক্ষে শিল্প সংস্কৃতি চর্চা

বিয়ে বাড়ির তত্ব সাজানোর জন্য পেশাদার শিল্পীদের কদর বেশ কিছু বছর ধরেই বেড়ে চলেছে। শৈল্পিক চেতনা সম্পন্ন ছেলেমেয়েদের একটা রোজগারের পথ খুলে গেছে। ভালোই হয়েছে। যারা নিজেরা ভালো তত্ব সাজাতে পারেন না, তারা পয়সা দিয়ে সুরুচীকর ভাবে তত্ব সাজিয়ে কুটুম বাড়ি পাঠাতে পারেন। তবে নতুন তাঁতের শাড়ি দিয়ে ময়ূর প্রজাপতি বানাতে গিয়ে তারা কাপড়গুলির যা দশা করেন, তাতে আমার ঘোর আপত্তি আছে !

তবে একটা সময় ছিল, যখন পাড়ার মধ্যে ভালো হাতের কাজ জানা মা – কাকিমা – মাসি-দের তাদের হাতের কাজের জন্য খুব কদর ছিল বিয়ে বাড়িতে। শুধু তত্ব সাজানোই নয় – আরও হাজার রকম আটপৌরে কাজ তাদের হাতের ছোঁয়ায় উন্নীত হতো শিল্পের পর্যায়ে। আল্পনা দেওয়া – পিঁড়ি আঁকাও ছিল বিয়েবাড়ির গুরুত্বপূর্ণ কাজ। “শ্রী” তৈরী করার মধ্যেও অনেকে পরিচয় দিতেন শিল্প নৈপুণ্যের।

তারপর যেমন ধরুন পান সাজা বা পানের তত্ব করা। মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে পানের ব্যবহার দুই বাংলাতেই প্রসিদ্ধ। তার সাথে কত নিপুন হাতের কাজ দেখানোর সুযোগ। একটা পান থেকে পাঁচটা পানের খিলি তৈরী করতে পারার মতো ওস্তাদ ছিলেন এককালের গিন্নিরা। মাঝখানে বোটাটা রেখে দুই দিকে ঝুমকো-লতার মতো ঝুলতো পানের খিলি। আমার মা’কে দেখি একটা পান থেকে দুটো পান আর মাঝে একটা বাক্স পান বানাতে। তবে তার বেশি পারেন না। পানের সাথে সুপারির কথা এসেই যায়। সুপারি নাকি বাংলার নিজস্ব উৎপাদন নয়। সিংহল থেকে নৌকো করে প্রথম আনা হতো সুপারি। সেই সফর থেকে সফরী হয়ে সুপারি কথাটির উৎপত্তি। বারিক করে সুপারি কাটতে পারার দক্ষতা ছিল গিন্নীপনা মাপার মাপকাঠি। তবে বিয়ের সময় সুপারি দিয়ে আংটি বানানো হতো। দুধে সেদ্ধ করে নরম করে নিয়ে তারপর নরুন দিয়ে কেটে ! তাছাড়াও বানানো হতো সুপারির চিড়া জিরা !

চিড়া জিরা বলতে মনের পরে – এখনো শিলচর করিমগঞ্জ এলাকায় বাড়িতে বিয়ের সময় নারকেলের চিড়া জিরা বানানো হয়। এক আত্মীয়ের বাড়িতে নারকেলের চিড়া দেখে প্রথমবার আমি নিজেই চমকে গিয়েছিলাম। একদম আসল চিড়ার মতো দেখতে। তবে চিনির সিরায় জড়ানো নারকেল খেতে তো অন্যরকম হবেই !

তাছাড়া আমাদের দেশের বিয়েতে নারকেলের আর ক্ষীরের সন্দেশ বানানো ছিল বিয়ের অনুষ্ঠানের অপরিহার্য অঙ্গ। সেই জন্য অধিকাংশ বাড়িতেই সন্দেশের ছাঁচ থাকতো। আমার নিজের এই ব্যাপারে উৎসাহ থাকার জন্য রেওয়াজটা আমাদের বাড়িতে এখনো চালু আছে। বছর পাঁচেক আগেও আমার এক প্রাক্তন বসের ছেলের বিয়েতে নারকেল আর ক্ষীরের সন্দেশের চারটে ট্রে গিফট হিসাবে দিয়েছিলাম আমরা মা-ছেলে মিলে বানিয়ে। খুব প্রশংসা হয়েছিল। ছাঁচের সন্দেশ ছাড়াও বানানো হতো রং সন্দেশ। আম – জাম – লিচু – লেবু – লঙ্কা – সব ক্ষীরের আর রং করা।

এই ঐতিহ্য ধরে রাখার একটা চেষ্টা আমি আশির দশক পর্যন্তও দেখেছি। কলকাতায় শ্রীহট্ট সম্মিলনীর বাৎসরিক অনুষ্ঠানে এক অশীতিপর বৃদ্ধা এই সব সন্দেশ বিক্রি করতেন। তার সাথে সন্দেশের ছাঁচও বিক্রি করতেন। আর যারা সন্দেশ কিনতো – তাদের খুব উৎসাহ দিতেন ছাঁচ বাড়ি নিয়ে গিয়ে নিজে চেষ্টা করার জন্য। বলে দিতেন – দেখিয়ে দিতেন প্রদ্ধতি।

বিয়ের জায়গা – যাকে এপারে ছাঁদনাতলা বলে, সিলেটে তার নাম ‘কুঞ্জ’। সেই বিয়ের ‘কুঞ্জ’ সাজানোর মধ্যে দিয়েও অনেকে খুব সুন্দর শিল্প চেতনা প্রকাশ করতেন। বাঁশের বাখারি, কলা গাছ, রঙিন কাগজ, ফুলের মালা দিয়ে সাজানো হতো ‘কুঞ্জ’। সিলেটের এই ঐতিহ্যের কথাই ধরা আছে বাউল শাহ আব্দুল করিমের গানে “তুমরা কুঞ্জ সাজাও গো – আইজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে”। সিলেটের আরও একটা প্রথার কথা এই বিষয়ে মনে পড়ে। বিয়ের সময় বর আর কনের জন্য বিনি সুতোর মালা গাঁথা হতো – বিশেষ ধরণের ফুল দিয়ে – যেমন কাঠ গোলাপ বা কাঁঠাল চাঁপা। অনেক বাড়িতে আবার উত্তর ভারতীয় / ইসলামী প্রভাবে বর আসতো সেওরা (সেহেরা) পরে। শুনেছি যে আমার মেসোমশাই এসেছিলেন সেহেরা পরে। লেবুফুল দিয়ে গাঁথা সেই সেহেরা পাঠানো হয়েছিল কনের বাড়ি থেকে।

এমনকি আমরা যখন ছেলে-ছোকরা, তখনও চেনা জানা আত্মীয় স্বজনের বিয়েতে ফুলের কাজ করার জন্য পেশাদার লোক আসতো না। আমরাই মল্লিকঘাট থেকে ফুল কিনে আনতাম – রজনীগন্ধার চেন, স্টিক। সাথে গোলাপ আর শীতকাল হলে অন্য মরশুমি ফুল। তাই দিয়েই বরের গাড়ি, ফুল-সজ্জার খাট, বিয়েবাড়ির গেট সাজিয়ে ফেলতাম। গাড়ির সামনে বসানোর জন্য ফুল আর শ্যাওলা দিতে তৈরী ময়ূর বা প্রজাপতি কিনতে পাওয়া যেত রেডিমেড। বিয়ে বৌভাতের দিন সারা দুপুর চলতো আমাদের ফুল সাজানোর কাজ।

ফুল কিনতে যাওয়ার সময় আরেকটা ফরমায়েশ করতেন বাড়ির মহিলারা। রজনীগন্ধা, জুঁই বা বেলফুলের ছোট মালার জন্য । বিয়েবাড়িতে অঙ্গসজ্জার অপরিহার্য অংশ ছিল খোঁপায় মালা দেওয়া। সেই চলটাও আজকাল মনে হয় কমে এসেছে। এই সেদিন পর্যন্ত দেখেছি যে কনে সাজানোর কাজটাও পাড়ার বৌদিরাই করতেন। যাদের আল্পনা আঁকার হাত ভালো – তারাই কনেকে চন্দন পরাতেন। পার্লারে যেত হয়তো গোনাগুন্তি বাড়ির কনে। তাও পুরো সাজসজ্জা নয়, শুধু চুল বাঁধা দিয়েই শুরু হয় পার্লারের এই বিশ্ববিজয়। কবরী বা সঙ্গমের মতো অভিজাত পার্লারগুলি এর পথিকৃৎ।

লেখাটায় বড্ড বেশি নিজের ঢাক পেটানো হয়ে গেলো। আরও একটু পুরোনো আমলের কথা বলি।
এপার বাংলায় শিল্প-সংস্কৃতির আলোচনায় ঠাকুর বাড়ির ছোঁয়া এড়ানো মুশকিল। রবীন্দ্রনাথ বিয়ের আশীর্বাদ উপহার হিসাবে প্রচুর লিখেছেন। তবে বিয়ে উপলক্ষে কোনো কবিতা নয় – প্রথম লিখেছিলেন দুটি গান। ১৮৮১ সালে। গানদুটির প্রথম লাইন – “দুটি হৃদয়ের নদী একত্র মিলিল যদি” আর “মহাগুরু দুটি ছাত্র এসেছে তোমার” . দ্বিতীয় গানটির পরে পরিবর্তন করে “আজি এ সন্তান দুটি মিলেছে তোমার” করেছিলেন। গানদুটি রাজনারায়ণ বসুর মেয়ে লীলাবতীর বিয়ে উপলক্ষে লেখা।

এই গানের সাথে আরো একটা ইতিহাস আছে। লীলাবতীর বিয়েতে গানদুটি গাইতে হবে বলে গায়কদের নিজেই তালিম দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আর সেই গায়কদের দলে একজনের নাম পাচ্ছি – শ্রী নরেন্দ্রনাথ দত্ত। স্বামীজীর প্রিয় গানের মধ্যে ছিল “দুটি হৃদয়ের যদি” – যা পরে “সঙ্গীত কল্পতরু”-তে ছাপা হয় ।

বিয়েবাড়িতে গান নাচ চর্চার একটা প্রবাহমান ধারায় ছিল। সিলেটে এবং শিলচর করিমগঞ্জের বিয়েতে ধামাইল নাচ ও গানের প্রচলন এখনো আছে। রাধারমণের লেখার পদগুলি আজও ব্যবহৃত হয় হয় – এমনকি সিনেমা সিরিয়ালেও !

আঠারো শতকের শেষ থেকে গঙ্গাপাড়ে একটা জনপ্রিয় রেওয়াজ ছিল বিয়েতে পদ্য ছাপানোর। জানিনা ঠাকুর বাড়ির প্রভাব কতটা ছিল এর পেছনে। প্রথম বিয়ের পদ্য নাকি রাজা সুবোধ মল্লিকের বিয়েতে ছাপা হয়েছিল ১৩০৪ সালে (মানে ওই ১৮৯৭-৯৮ হবে) কিন্তু সেই সব পদ্যের লেখকদের খুঁজে পাওয়া যায় না। কারন যিনিই লিখতেন, তিনি বর বা কনের মা-বাবা-দাদু দিদিমার নাম দিয়ে ছাপতেন। কুটুমবাড়ির সংস্কৃতি মাপার একটি উপায় ছিল এই বিয়ের পদ্যের মান ও সংখ্যা। মানে বরের বাড়িতে থেকে কয়টা পদ্য ছাপা হলো? কেমন সেই পদ্য? আবার কনের বাড়ি থেকেই বা কি রকম পদ্য দিলো ? এই নিয়ে মজার গল্প শুনিয়েছেন যতীন্দ্রমোহন দত্ত – যার “যম দত্তের ডাইয়েরি”র কথা আগেও বলেছি।
যতীন্দ্রমোহনের বোনের বিয়ে উপলক্ষে তাঁদের বাড়ি থেকে চার-চারটে পদ্য ছাপা ও বিলি করা হয়েছিল। সেই বিয়ে ঠিক হয়েছিল বর্ধমানে চান্ডু-র জমিদার বাড়িতে।পাত্র সেই আমলের মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার। তাদের বাড়িতে হাতি ছিল, ষোলো বেহারার পালকি ছিল। অথচ বরের বাড়ি থেকে বিয়েতে একটিও পদ্য ছাপা হয়নি। সেই নিয়ে বাসর ঘরে খুব পেছনে লাগা হলো জামাইয়ের। কেউ বললো – রেঢ়ও – মানে অসভ্য , কেউ আবার ছড়া কাটলো “কাছা লম্বা, কোঁচায় টান – তবে জানিবে বর্ধমান!!”

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s