লিন্ডসে সাহেব আর ইন্ডিয়ান Curry

ক’লকাতার নিউ মার্কেটে কখনো বাজার করতে গেছেন? শহর জুড়ে শপিং মলগুলি চালু হওয়ার আগে এই বাজার-ই ছিল আল্টিমেট শপিং এক্সপিরিয়েন্স। হাতিবাগান বা গড়িয়াহাটের বাজারে – নাম থেকে শুরু করে দোকান আর মালপত্রের সম্ভারে যে দেশি বিন্যাসটা চোখে পড়তো, সেটা একদম উধাও এখানে। সেই অর্থে আগমার্ক কলোনিয়াল হ্যাংওভারের জ্যান্ত উদাহরণ ছিল এই বাজার। না, স্টুয়ার্ট হগ সাহেবের সেই বাজার নিয়ে আজকের লেখা নয়। তবে এই নিউ মার্কেট যাওয়ার একটি মূল পথ লিন্ডসে স্ট্রিট যার নামে, সেই লিন্ডসে সাহেব কে নিয়েই আজকের পর্ব।

স্কটল্যান্ড থেকে আরও অনেক তরুনের মতো রবার্ট লিন্ডসে ভারতে পাড়ি দিলেন।যোগ দিলেন কোম্পানির চাকরিতে ‘রাইটার’ বা কেরানি হিসাবে। কোম্পানির সর্বেসর্বা তখন ওয়ারেন হেস্টিংস। চারিদিকে কোম্পানির প্রভাব আর প্রতিপত্তি বাড়ানোর রাজসূয় যজ্ঞ শুরু হয়েছে। কিছু দিন ক’লকাতায় এসে কাজ করার পর বদলি হলেন ঢাকা ডিভিশনে। সে আমলে কোম্পানির রাইটারদের মাইনে ছিল খুব কম। তাই চাকরির সাথে সাথে তাদের ব্যবসা করার ছাড়পত্রও মিলতো। উচ্চাকাঙ্খী তরুণ লিন্ডসে সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে নিজের বদলির জন্য তদ্বির শুরু করলেন। কোথায়? না সিলেটে। সেই সময় সিলেটে কোম্পানি নিযুক্ত সুপারভাইজার থ্যাকারে সাহেব পদত্যাগ করেছেন। এই সাহেব আবার বিখ্যাত উপন্যাসিক উইলিয়াম মেকপিস থ্যাকারের দাদু। যাই হোক, বদলির আদেশ হয়ে গেল আর শুরু হলো আমাদের গল্প। সময় ১৭৭৮।

সিলেট আসার পথেই লিন্ডসে সাহেবের নজরে পড়ল দিগন্ত বিস্তৃত সিলেটের হাওর। জলপথে ব্যবসার সম্ভবনা নিয়ে শুরু হলো চিন্তা। তারপর শাহ জালালের দরগায় প্রথামাফিক নজরানা দিয়ে কাজ শুরু করলেন। এবার দেখলেন যে চুনা পাথরের পাহাড় সামনে দাঁড়িয়ে বিরাট ব্যবসার সুযোগ নিয়ে। সাথে আছে কাঠ রফতানির করাও সম্ভব। প্রখর ব্যবসায়িক বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে সাহেব স্থানীয় মানুষের সাথে গড়ে তুললেন যোগাযোগ। বুঝতে শুরু করলেন তাদের প্রথাগত দক্ষতাগুলি। কাঠ লোহা আর হাতির দাঁতের শিল্পীদের নিয়োগ করলেন। সাথে সিলেটে মাঝি মাল্লারাও যোগ দিলো। নিজের খালি সময় এই সব স্থানীয় কারিগরদের সাহায্যে গড়ে তুললেন “অগুস্ত” নামে এক পেল্লাই জাহাজ। সেই জাহাজে করেই সিলেটের চুন, কাঠ ইত্যাদির রফতানির ব্যবসা শুরু করলেন লিন্ডসে সাহেব। এমনকি দক্ষিণ এশিয়াতেও বাণিজ্য করতে পৌঁছে গেলো এই সিলেটি কারিগরদের তৈরী অর্ণবপোত।

শুধু চুন কাঠ পাথর রফতানি করেই সাহেবের সন্তুষ্টি হলো না। কাঠ কাটার জন্য জঙ্গল সাফ করতে গিয়ে তার মাথায় খেলে গেলো আরেকটি ব্যবসা বুদ্ধি। সিলেটের জঙ্গলে তখন বাঘ হাতি ভর্তি। সেই বাঘ মারা শুরু করলেন সাহেব। সঙ্গে হাতি ধরাও। হাতিগুলি সাপ্লাই দিতেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে – চড়া মুনাফায়। আর বাঘ মেরে তার হিসেবে পাঠাতেন কোম্পানিতে। মিলতো ভালো কমিশন। বছরে ৬০-৭০ টা বাঘ মারার হিসেবে দাখিল করেছেন দেখা যাচ্ছে কোম্পানির খাতায় !!

শাসনকর্তা যখন ব্যবসাও করেন, তখন সাধারণ প্রজার দুর্গতির শেষ থাকে না। এ ক্ষেত্রেও অন্যথা হলো না। শুরু হ’লো বিদ্রোহ। সৈয়দ হাদি ও মেহেদী নামে দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে। সে অন্য প্রসঙ্গ, অন্য সময় বলা যাবে। এদিকে সাহেবও বিপুল পরিমান ধনসম্পদ আহরণ করে ফেলেছেন। এবার স্কটল্যান্ডে ফিরে জমিজমা কিনে নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করার ইচ্ছে জাগলো।

ফেরার জাহাজ ধরলেন। ১৭৯০-র আশেপাশের সময়। এই সময় কোম্পানির কর্মচারীরা যখন দেশে ফিরতেন, তখন প্রয়োজন হতো প্রচুর মাঝি মাল্লার। অন্যান্য দেশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সিলেটিদের সমুদ্রপাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা বেশি থাকায় তারাই এই সব ফিরতি জাহাজের কর্মী হওয়ার সুযোগ পেল। তাছাড়া এডভেঞ্চার প্রিয় জাত হিসাবেও প্রসিদ্ধি ছিল তাদের। শুরু হলো বিলেতের সিলেটিদের শেকড় গাড়ার প্রক্রিয়া।

এখানেই গল্পের শেষ নয়। ওই যে বলি না, আমার সব আলোচনাই শেষ হয় খাওয়ার গল্পে, এখানেও তার ব্যাতিক্রম নয়।

সাহেব তো ক’বছর এদেশে কাটিয়ে খুব পোলাও কোর্মার স্বাদে নিজের পিতৃদত্ত ফিস এন্ড চিপস নির্ভর bland স্বাদ-গ্রন্থিগুলির বারোটা বাজিয়ে দেশে ফিরলেন। এবার শুরু হলে সেই ইন্ডিয়ান কারির জন্য দুঃখ। কথায় বলে ভাগ্যবানের বোঝা ভগবানে বয় – আর লিন্ডসে সাহেব তো সাক্ষাৎ ভাগ্যদেবীর বরপুত্র। তাই এই দুঃখও তার বেশিদিন সইতে হলো না। একদিন জনৈক দেশি জোয়ান তার সামনে হাজির হলো। নিজের নাম বলল – সৈদুল্লাহ । নিজের পরিচয় ঘোষণা করলো “আমি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ কারি (curry)- সূপকার”।

এই পূর্ব দেশীয় বর্বরের হাতে তৈরী খানা খাওয়ার বিরুদ্ধে বাড়ির গভর্নেসের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও পরীক্ষা হলো সৈদুল্লাহ-র। আর পরীক্ষার ফলাফল শুনুন খোদ লিন্ডসে সাহেবের জবানিতে :
“Syed-ullah attended at the proper hour, and prepared a curry to suit my palate … The same remonstrance was re-echoed by my whole family, – never was a dish better dressed, and never did I make a more hearty dinner”

ব্যাস আর কি, এক সিলেটির হাত ধরে শুরু হলো “ইন্ডিয়ান কারি”-র বিলেত বিজয়।

এর বহু পরে ১৯২০ নাগাদ ওয়াসিম ও নাসিম নামে দুই ছাত্রের মাথায় খেলে গেলো ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট তৈরির বুদ্ধি। আরও সিলেটি রন্ধন-পটু নাবিকদের নিযোগ করলো তারা। এই সময় প্রচুর ব্রিটিশ ভারত থেকে দেশে ফিরছিলেন। সেই জন্য বাড়তে থাকলো ইন্ডিয়ান ফুডের চাহিদা। (আজকের ভারত নয় – উপমহাদেশ বোঝাতে ব্যবহার করলাম সংজ্ঞাটি) ২০-র দশকের শেষ দিকে আয়ুব আলী মাস্টার লন্ডনের কমার্শিয়াল রোডে একটি ‘কারি- ক্যাফে’ খোলেন। তবে আব্দুল মাজিদ কুরেশি বোধ হয় লন্ডনে প্রথম শুরু করেন পুরোদস্তুর ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট। তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলো সেই সব রেস্টুরেন্টের সংখ্যা। কিন্তু সেই সময় বেশির ভাগ রেস্টুরেন্টগুলি অবস্থিত ছিল লন্ডনের ওয়েস-এন্ডে – বনেদি সমঝদার ক্লায়েন্টদের পরিষেবা দেওয়ার জন্য। এরপর আরও বাড়লো রেস্টুরেন্ট। ৬০-এর দশকে ক্যাটারার্স এসোসিয়েশন শুরু করলেন লন্ডনের সিলেটি বাঙালিরা। এবার প্রতিষ্ঠানগুলি গড়ে উঠলো ইস্ট এন্ড কেন্দ্র করে। বিশেষ করে ব্রিক-লেন অঞ্চলে। সেই ব্রিক লেন যা ৭০-রের দশকের শেষ দিকে সমাজতান্ত্রিক ভাবনায় উদ্বুদ্ধ বাঙালি ছাত্রদের নেতৃত্বে সংগঠিত জাতি-বিদ্বেষ বিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রে উঠে এসেছিলো সাম্য ও মৈত্রীর চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে। এভাবেই সাম্রাজ্যবাদ আর সমাজতন্ত্রকে এক পংতিতে বসিয়ে খানা খাওয়ালো সিলেটি বান্দা।

নিউ মার্কেট এলাকায় যাতায়াত অনেকটাই কমে গেছে . বিশেষ করে  লাইট হাউস চাপলিনের মতো সিনেমা হলগুলি উঠে যাওয়ার পর। তবে ওই এলাকায় কখনো গেলে রবার্ট লিন্ডসে-কে একবার নিশ্চই মনে পড়বে, সাথে মনে পড়বে সৈয়দুল্লার কথাও। তাই না?
সাথে ছবি : বৃষ্টির দিনে লিন্ডসে স্ট্রিট (wikimapia)
তথ্য সূত্র :
Anecdotes of an Indian Life – Robert Lindsay
Historical Globalization and its effects; a study of Sylhet an its people 1874 -1971 – Ashfaque Hossain
Brick Lane – fascism and anti-fascism, London (libcom.org)

One comment

  1. Very interesting and when it gets mentioned of people & places one is familiar with its really comes as a fascinating reading. Wonderful.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s