চার্লস “হিন্দু” স্টুয়ার্ট ও ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গল্প

১৭৭৭ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে কোম্পানির সেনাবাহিনীতে একজন ক্যাডেট বা সৈনিক হিসাবে যোগ দিয়ে বাংলায় আসেন চার্লস স্টুয়ার্ট। তারপর ধীরে ধীরে পদোন্নতি হয়ে শেষে মেজর জেনারেল হিসাবে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সেই সময় তার বার্ষিক মাইনে ছিল প্রায় দু’হাজার পাউন্ড ! সেই আমলে এই বিপুল পরিমান অর্থ নিজের এক অদ্ভুত শখের পেছনে খরচ করতেন ভদ্রলোক। সারা ভারত থেকে ভারতীয় পুরাতত্বের নানা নিদর্শন এনে জড়ো করতেন নিজের বাসায়। বিশেষ করে হিন্দু দেব দেবীর মূর্তি। তবে শুধু মাত্র সংগ্রাহক দৃষ্টি দিয়ে এই কর্মকান্ড কে দেখলে ভুল হবে। প্রথম গল্পটা থেকেই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে সনাতন রীতি রেওয়াজ ও ধর্মাচরণ আপন করে নিয়েছিলেন সাহেব। সেই থেকেই তার নাম হয়েছিল “হিন্দু স্টুয়ার্ট”!!

সেই সময় অনেক ইউরোপীয়ানরাই দেশে এসে দেশি রীতি রেওয়াজ আপন করে নিতেন। শুরু হয়েছিল পর্তুগিজদের দিয়ে। বিশেষ করে পর্তুগিজ সেনাবাহিনীর নিচের দিকের কর্মীরা পর্তুগিজ এলাকা থেকে পালিয়ে এসে বিভিন্ন দেশীয় নবাব বাদশাদের কাছে চাকরি নিতেন। নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নতি তো হতোই – তার সাথে পদমর্যাদাতেও লাভ হতো প্রচুর। এই প্রবণতা বিশেষ করেনিচু তলার কর্মীদের মধ্যে দেখা যেত – যাদের মাইনে ছিল খুব কম এবং সম্মান প্রায় কিছুই ছিল না। তারপর এক সময় তারা বুঝলো যে ইসলাম গ্রহণ করলে নবাবের রাজ্যে উন্নতি আরো নিশ্চিত করা যায়। তাছাড়া আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বিয়ে করে গার্হস্থ্য জীবনের হাতছানি। এর কারণ এই যে নিচুতলার সৈনিকরা ছিল স্ত্রী সঙ্গ বঞ্চিত। কিন্তু সকলেই যে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তা নয় – কেউ কেউ হয়তো হিন্দু ধর্মও নিয়েছিলেন। সঠিক জানি না। তবে যতোটুকু দেখতে পাচ্ছি যে ১৫৯৮ সালে পর্তুগালের এক ধর্মীয় তদন্তদল এই সব পলাতক deserter-দের বিষয়ে খোঁজ নিতে এসেছিলেন এবং তারা খোদ পোপের কাছে নিজেদের রিপোর্ট দিয়ে লিখেছিলেন যে “যে এদেশে হিন্দু, মুসলমান ও ইহুদিদের সঙ্গে একসাথে থাকার ফলেই ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের মধ্যে নৈতিক বৈকল্য দেখা দিচ্ছে। এই সমস্যার আশু সমাধান করতে হবে। ”

ব্রিটিশরা প্রথম ভারতে আসে ১৫০০ সালের আশেপাশে। অষ্টাদশ শতকের শেষে তাদের শেকড় ভালো ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের মাটিতে। ব্যবসা আর যুদ্ধ করার মাঝের সময়টাতে ধীরে ধীরে ভারতীয় আদব কায়দা রীতি রেওয়াজ একটু একটু করে আপন করে নিতে শুরু করলেন তারা। জব চার্ণকের মতো ভারতীয় স্ত্রী গ্রহণ (?) করলেন যারা – তাদের মধ্যে সেই সব প্রভাব আরো বেশি করে দেখা দিতে লাগলো। কোম্পানির বড় সাহেবের দেশীয় বড়লোকদের বাড়িতে নিয়মিত নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে হাজির হতেন বিভিন্ন পূজা পার্বনে। স্যার উইলিয়াম জোনসের মতো পন্ডিত-রা অন্যদিকে ভারতীয় কৃষ্টি ও সভ্যতার দিকে তুলে ধরলেন নতুন শ্রদ্ধা ও সম্মানের দীপশিখা। স্বজাতির মধ্যে এই উদার মনোভাব দেখে খুব চটতেন সাহেব মিশনারিরা।

রেভারেন্ড আলেকজান্ডার থমসন নামে এক মিশনারির লেখা Government Connection with Idolatry in India” এক পুস্তিকায় দেখছি যে কোম্পানির কর্মচারীদের এই মনোভাবের উদ্দেশ্যে তুমুল বিষোদ্গার। তিনি লিখছেন “কোম্পানির উচ্ছপদস্থ কর্মচারীরা একটি বিশেষ শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করতেন। তারা কুশলী কর্মচারী, তাছাড়া তাদের প্রচুর অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু মূলত তারা ছিলেন ধর্মভ্রষ্ট মানুষ। ১৭৯০ থেকে ১৮২০-র মধ্যে যারা উঁচু পদে আসীন ছিলেন, তারা খ্রিষ্টধর্ম থেকে হিন্দুধর্মকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাদের মধ্যে অনেকেই মিশনারিদের ঘৃণাও করতেন” (অক্ষম অনুবাদ আমার) খেয়াল করুন সময়কালটা। সেই সময়টাকে আমরা আগের লেখায় “হেস্টিংসীয় উদারবাদের” সময় বলে উল্লেখ করেছি। তার মানে খোদ ইউরোপ থেকেই প্রতিরোধ শুরু হয়ে গেছে। নেতৃত্ব দিচ্ছে চার্চ !

কিন্তু এরা সকলেই সেই অর্থে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেননি। চার্ণক থেকে ওয়ারেন হেস্টিংস। এমনকি উইলিয়াম জোনস তো চার্চ অফ ইংলন্ডের একজন একনিষ্ট অনুসারী ছিলেন!

আবার এই পরিস্থিতেই এক শ্রেণীর ইউরোপিয়ানদের কথা জানতে পারি যারা সচেতন ভাবেই স্বধর্মের প্রতি বিরাগ পোষণ করতেন এবং এদেশীয় কোনো ধর্ম পালন করতেন দারুন উদ্দীপনার সাথে। চার্লস স্টুয়ার্ট ছিলেন সেই গোত্রের সাহেব। গঙ্গা স্নান – পূজা অর্চনার মতো আচরণ নিজে পালন করেই থেমে থাকেননি স্টুয়ার্ট। একই সাথে মিশনারিদের কাজকর্মের ঘোরতর বিরোধিতা করেছিলেন। নিজের খরচে একটি পুস্তিকা লিখে ছাপিয়ে ছিলেন। A Vindication of the Hindoos – সেই গুরুত্বপূর্ণ পুস্তিকার নাম।
এই লেখায় তিনি ভারতে মিশনারিদের কার্যকারিতার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন। স্টুয়ার্ট সাহেব লিখছেন – “নৈতিকতার প্রশ্নে মনে হয় না যে হিন্দু ধর্মের প্রতি খ্রিষ্ট ধর্মের কোনো নতুন পথ নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ আছে। সভ্য সমাজে জীবনধারণের যে সব নৈতিক আদর্শ ও আচরণ বিধির প্রয়োজন, তার জ্ঞান হিন্দু ধর্ম তার অনুসরণকারীদের খুব ভালো ভাবেই দিতে সক্ষম। ”

পৌরাণিক আখ্যানগুলির সমালোচকদের জবাব দিতে লিখেছিলেন যে “হিন্দু ধর্মের আখ্যানগুলির রূপকার্থ না বুঝলে সেগুলির সঠিক অর্থ বোঝা হয় না। পুরানের গল্পগুলি যখন অধ্যয়ন করি তখন আমার মনে হয় যে পৃথিবীর সব থেকে জটিল নৈতিক রূপক ব্যবস্থা (moral allegory system) বোধহয় হিন্দু মুনি ঋষিরাই তৈরী করে গিয়েছেন।”
শুধু তাত্বিক জ্ঞান আহরণ নয়, আচার আচরণেও হয়ে উঠেছিলেন হিন্দু। ধুতি পরা, পান খাওয়া কপালে তিলক দেওয়া – তার সাথে আগে উল্লেখ করা পূজা আহ্নিক করা – সব ছিল তার সব দিক থেকে হিন্দু হয়ে ওঠার প্রকাশ। এমনকি মাঝে একবার যখন বিলেত গেলেন, তখন নিজের দেব মূর্তিগুলিও সাথে করে নিয়ে গেলেন – যাতে প্রাত্যহিক পূজায় ছেদ না পড়ে।
নিজের সেনাবাহিনীর পোস্টিং কাজে লাগিয়ে ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন নানা আকারের মূর্তি ও অন্যান্য প্রত্ন সামগ্রী। ভারতীয় মূর্তি তত্ব (icongraphy) সম্পর্কে জ্ঞান ছিল তার অসীম। বিভিন্ন দেব দেবীর যে মূর্তি সংগ্রহ করেছিলেন, পরবর্তী কালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কিউরেটাররা তাকে বলেছেন “visual encyclopedia” !!
শুধু হিন্দু ধর্মের নৈতিক উৎকর্ষ নিয়ে লেকচার দিয়েই থেমে থাকেননি ভদ্রলোক। সিক্ত বসনা ভারতীয় সুন্দরীদের সৌন্দর্য ব্যাখ্যাতেও তিনি রসিক চূড়ামণি। ক্যালকাটা টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ফ্যাশন নিয়ে লেখাগুলি পড়লেই বোঝা যায়। স্বজাতীয়দের ভারতীয় কৃষ্টি ও নন্দনতত্ত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করার চেষ্টাও করেছেন। মেমসাহেবদের বলেছেন কর্সেট ত্যাগ করে শাড়ি পরতে, কারণ শাড়ির মতো সুন্দর শালীন ও আবেদনপূর্ন পোশাক বুঝি আর হয় না। মেমসাহেবরাও প্রত্যাঘাত করেছেন কড়া ভাষায় খবরের কাগজে চিঠি লিখে !!
নিজের কাজের ক্ষেত্রেও এই মতবাদ প্রচলনের চেষ্টায় বেশ ঝামেলায় পড়লেন সাহেব। প্যারেড ও পরিদর্শনের সময় নিজের অধস্তন সেপাইদের লম্বা গোঁফ রাখা ও তিলক পরার অধিকার দিয়ে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। ১৮১৩ সালে সেই কারনে তাকে সাসপেন্ড করা হয়। কিন্তু ১৮১৪ সালে তাকে পুনরায় বহাল করা হয় – পদোন্নতি সমেত !! স্টুয়ার্ট সাহেবের জীবনের আরো এক আশ্চর্যজনক ঘটনা আর কি !

এই অবধি পড়েই যারা স্টুয়ার্ট সাহেবের মধ্যে নতুন যবন হরিদাস-কে খুঁজে পাওয়ার কথা ভাবছেন, তাদের বলি, একটু দাঁড়ান !!

চার্লস স্টুয়ার্টের জীবনে বিতর্ক থেমে নেই। তার পারিবারিক জীবন নিয়ে মতভেদ প্রবল। বিশিষ্ট লেখক উইলিয়াম ডালরিম্পেল তার “White Mughals” বইতে হিন্দু স্টুয়ার্ট সম্পর্কে কিছুটা লিখেছেন। তার মতে স্টুয়ার্ট বিয়ে করেছিলেন এদেশীয় কোনো মহিলাকে। তার ছেলেপুলেও ছিল। যদিও তার উইলে তার স্ত্রী বা সন্তানদের কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু পরিচারক ও সহায়কদের ভাগের কথা বলা আছে। ব্যবহারটা ঠিক আদর্শপুরুষোচিত হলো কি? অবশ্য দেখছি যে জর্জ ফিস বলছেন, অকৃতদার ছিলেন ভদ্রলোক। কোনটা ঠিক কে জানে !!

অন্যদিকে এটাও দেখতে পাচ্ছি যে মূর্তি সংগ্রহের জন্য তিনি যে সব সময় বৈষ্ণব বিনয় দেখিয়েই কার্য সিদ্ধি করতেন তা নয়। সাম – দান – দন্ড – ভেদ কোনো পদ্ধতিতেই তার অরুচি ছিল না। সে ক্ষেত্রে উনি আবার আদর্শ আদর্শ সৈনিক ও প্রশাসক। এমনকি পরবর্তীকালে যে সব সাহেবরা ভারতে পুরাতাত্বিক সংরক্ষণের কাজ করেছেন, তারা চার্লস স্টুয়ার্টের সংগ্রহের পদ্ধতিকে “ঘেঁটে দেওয়া” বা rifled- এর সমগোত্রীয় বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন !!

এইভাবেই এক রঙিন ও ঘটনাপুর্ন জীবন কাটিয়ে বৈকুন্ঠধামে যাত্রা করলেন হিন্দু স্টুয়ার্ট। কিন্তু টেকনিক্যালি যেহেতু হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেননি, সেই জন্য সাউথ পার্ক স্ট্রিট কবরখানায় তাঁর অন্তিম শয্যার ব্যবস্থা হলো। নিজের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার সমাধি মন্দির গড়ে উঠলো হিন্দু মন্দিরের আদলে – যা আজও এই কবরখানার একটি বিশেষ দ্রষ্টব্য। সাহেবের সংগ্রহের এক অংশও সেই সমাধি তৈরিতে ব্যবহৃত হলো। হরিসাধন মুখোপাধ্যায়ের বইতে লেখা আছে ” এ সমাধিস্তম্ভটি একটি প্রাচীন হিন্দু দেবমন্দিরের ভগ্নাবশেষ। ইহার গাত্রে “ভগীরথ” “পৃথ্বিদেবী” প্রভৃতি খোদিত আকৃতি ও সাধুসন্ন্যাসীর মূর্তি আছে।” তবে এই ২০১৭ সালে সেই সমাধিমন্দিরের যা অবশিষ্ট যাচ্ছে নিজেরাই দেখে নিন। সাথে ছবি দিলাম।

=======================================================================

মৃত্যুর পর ১৪৩টি বাক্সয় বোঝাই হয়ে স্টুয়ার্টের কালেকশন বিলেত পাড়ি দিলো। সেই ১৮২৮ সালে তার সম্পত্তি জাহাজ যাত্রার সময় বিমা করা হয়েছিল প্রায় তিরিশ হাজার টাকা মূল্যে !!

ভালো মন্দ সাদা কালোয় মেশানো এক জীবন। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে স্বামীজীর আমেরিকা যাত্রার প্রায় সত্তর-আশি বছর আগেই চার্লস স্টুয়ার্টই প্রথম সচেষ্ট হ’ন পাশ্চাত্যের মানুষকে ভারতীয় ধর্ম, দর্শন ও নন্দনতত্ত্বের গুরুত্ব বোঝাতে।

চার্লস স্টুয়ার্টের এই ১৪৩ বাক্স প্রত্ন-সামগ্রী কিভাবে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে পৌছুলো, সেই গল্পে যাওয়ার আগে একটু দেখে নেওয়া যাক যে তার আগে এই জাদুঘরে ভারতীয় প্রত্ন-সামগ্রীর সংগ্রহের অবস্থাটা ঠিক কি ছিল।

রেকর্ড অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে যে সুজাউদৌলাহ-কে রোহিলাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের স্মারক পাওয়া হিসাবে প্রথম একটি সাদা স্ফটিকের (alabaster) শিবলিঙ্গ চার্লস বাথার্স্ট ১৭৮৬-তে মিউজিয়্যমের ডিপার্টমেন্ট অফ ওরিয়েন্টাল এন্টিকুইটিস-এ দান করেন। সেই হিসাবে জিনিসটি সমকালীন, খুব পুরোনো নয়। এর পর বেশ কিছু সমকালীন জিনিসপত্র মিউজিয়ামে আসে কারণ সমকালীন সামগ্রী সংগ্রহ মিউজিয়ামের ঘোষিত কর্মপদ্ধতির মধ্যেই পরে। কিন্তু পুরাতাত্বিক নিরিখে গুরুত্বপূর্ণ specimen সংগ্রহের জন্য সেই ভাবে সংগঠিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অন্যান্য জিনিসের মধ্যে হঠাৎ করেই ঢুকে পড়েছে মিউজিয়ামের সংগ্রহে। যেমন এগারো শতকের একটি মিথুন মূর্তি। বা দৈবাৎ কেউ কোনো একটি জিনিস দান করেছেন, যেমন জেমস কিডের গল্প বলতে গিয়ে আলেকজান্ডার কিডের পরিবার থেকে দেওয়া “jade terapin”-এর কথা বলেছিলাম।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিসার, কর্মীরা ও তাদের পরিবার এই সব জিনিসের বড় উৎস ছিলেন। কিন্তু অনেক সময় মিউজিয়ামের ট্রাস্টিদের পক্ষ থেকে অর্থ অনুদানের গড়িমসিতে এই সব জিনিস সংগ্রহের কাজ আটকে যেত।

১৮৫১ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে যোগ দিলেন অগাস্টাস ফ্রাঙ্ক। তার উৎসাহেই ফুলে-ফেঁপে উঠলো ভারতীয় পুরাতাত্বিক সংগ্রহের ভান্ডার। অবশ্য এর সাথে বুঝে নিতে হবে যে এই সময়ে ভারত সম্পর্কে বাইরের বিশ্বে আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে – বিশেষ করে বিভিন্ন জ্ঞানের শাখায় প্রাচীন ভারতের উপলব্ধি সম্পর্কে জানতে উৎসুক হচ্ছে বাকি বিশ্ব। তার সাথে যুক্ত হলো রোম্যান্টিক আন্দোলনের ফলে দুনিয়াকে দেখার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, শিল্পকে পরখ করার নতুন মাপদণ্ড। এক অর্থে ফ্রাঙ্ক এই সময়েরই সৃষ্টি।

উনি কাজে যোগ দিয়েই পুরাতাত্বিক সংগ্রহের দিকে নজর দিলেন। ব্যক্তিগত ভাবে পুরোনো এংলো-স্যাক্সন সংস্কৃতি অন্য দেশের পুরোনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিকে তার ঝোঁক ছিল। খেয়াল রাখতে হবে যে ফ্র্যাঙ্কের পূর্বসূরিরা ভাবতেই পারতেন না যে এই সব জিনিস মিউজিয়ামে রাখার যোগ্য।

আবার স্টুয়ার্টের গল্পে ফিরে যাই। মিউজিয়াম বা সংগ্রহশালার দৃষ্টি দিয়ে যখন স্টুয়ার্টের এই কাজকে ব্যাখ্যা করতে যাই, তখন দেখি যে সাহেব নিজের সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন। তার সংগ্রহের মধ্যে মূর্তি ছাড়াও প্রাচীন পুঁথি, অস্ত্র, অলংকার – কি ছিল না। নিজের উড স্ট্রিটের বাড়িতে সেগুলি সুন্দর ভাবে সাজিয়ে রাখা ছিল। কেউ উৎসাহী হয়ে দেখতে চাইলে খুব যত্ন নিয়ে সেগুলি ঘুরিয়ে দেখাতেন। এমনকি তাঁর অনুপস্থিতিতে কোনো দর্শনার্থী এলে তাদের ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য বাড়ির কাজের লোকেদেরও প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন তিনি ।

স্টুয়ার্ট মারা যাওয়ার পর তার সমস্ত সম্পত্তি বিলেত এলো আর ১৮৩০-এ নিলাম হয়ে গেল সেই সব বহুমূল্য সামগ্রী। এই নিলামে সংগ্রহের একটা বড় অংশ কিনে নিলেন জন ব্রিজ (১৭৫৫ – ১৮৩৪)। এই ভদ্রলোক “রান্ডেল ব্রিজ এন্ড রান্ডেল” বলে নামি অলংকার ব্যবসায়ী সংস্থার অংশীদার ছিলেন। কিন্তু একজন নামি স্বর্ণকার কেন এই সব পুরাকীর্তির পেছনে টাকা ঢাললেন, সেটা পরিষ্কার নয়। তবে মাইক উইলিসের গবেষণায় দেখতে পাচ্ছি, এমন হতে পারে যে ১৮১১ সালে যখন একবার বিলেত এসেছিলেন স্টুয়ার্ট, তখন ফেরার সময় হয়তো ব্রিজের কাছ থেকে কিছু পালিশ করা হিরে নিয়ে গিয়েছিলেন ভারতে, কুরিয়ার হিসাবে। সেকালে বাড়তি রোজগারের জন্য বিলেত আর ভারতের মধ্যে এমন কুরিয়ারের কাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনেক কর্মীই করতেন। সেই সূত্রে হয়তো কোনো পূর্ব পরিচয় ছিল স্টুয়ার্ট আর ব্রিজের মধ্যে। তবে সবটাই অনুমান।

ব্রিজ সাহেবের নিজের খামার বাড়ি ছিল লন্ডনের উপকণ্ঠে । যেখানে একটি অবসরকালীন আবাস তৈরী করছিলেন তিনি। স্টুয়ার্টের জিনিসগুলি কিনে নিয়ে প্রথমে সেগুলি নিয়ে গেলেন সেই বাড়িতে – সাজিয়ে ফেললেন একটি ব্যক্তিগত মিউজিয়াম। কিছু কিছু জিনিস বাড়ি তৈরির কাজেও ব্যবহার করে ফেললেন। যেমন দ্বাদশ শতকের খিলান। দুর্ভাগ্যবশত সেই সব জিনিস নষ্ট হয়ে যায় যখন বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয় ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে।
জন ব্রিজের মৃত্যুর পর সেই বাড়ির দখল নেন তার ভাই জর্জ ব্রিজ। এই ভদ্রলোক সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না – তবে এইটুকু তথ্য আছে যে ভদ্রলোকের শিল্পকলায় ঝোঁক ছিল এবং নিজের পারিবারিক মিউজিয়াম সমেত অন্য সম্পত্তির একটি তালিকা বানিয়েছিলেন তিনি। শিল্পী ও শিল্প নিয়ে তার আগ্রহ আরো একটা বিষয় থেকে বোঝা যায়। তার এই খামার বাড়ির মধ্যে একটি বাগান বাড়ি তিনি স্তেফানোভ নামক অভিবাসী রাশিয়ান শিল্পীকে লিজ দিয়েছিলেন। স্তেফানোভ, তার স্ত্রী আর দুই ছেলে জেমস ও ফিলিপ ফ্রান্সিস সকলেই শিল্প চর্চা করতেন। এই জেমসের আবার ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সাথেও যোগাযোগ ছিল।

জেমস বিভিন্ন পুরাতাত্বিক সংগ্রহ ও সংগ্রহকারীদের বিষয় করে জলরঙে আঁকা নিজের কিছু কাজ নিয়ে ১৮১৬ থেকে ১৮৪৫-এর মধ্যে কতগুলি প্রদর্শিনী করেন। তার মধ্যে একটির নাম ছিল “All Assemblage of Works of Art in Sculpture and Paiming, From the Earliest Period to the Time of Phydias” এই প্রদর্শনীতে জর্জ ব্রিজের এক্তিয়ারে থাকা কতগুলি ভারতীয় ও বর্মী মূর্তির ছবি ছিল। সেই ১৮৪৫-এর পর জনসমক্ষে আর ব্রিজের সংগ্রহের কথা জানা যায় না।

এর পর সেই ১৮৭১ সালে ব্রিজ পরিবারের পক্ষ থেকে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এই পুরাকীর্তিগুলি গ্রহণ করার আবেদন জানানো হয়, কারণ তাদের সেই খামার বাড়িটি বিক্রি হয়ে যাচ্ছিল। মিউজিয়ামের অগাস্টাস ফ্রাঙ্ক ট্রাস্টিদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন পুরাকীর্তিগুলির গুরুত্ব। কিন্তু তারপরও যথারীতি ট্রাস্টিদের টালবাহানায়, ব্রিজ পরিবার সেগুলি আবার নিলাম করার প্রস্তুতি নিলেন। এমন সময় ট্রাস্টিদের ছাড়পত্র মিললো। অনেকটা হিন্দি সিনেমার নাটকীয় ক্লাইম্যাক্স সিনের মতো সেই নিলামেই একমাত্র ক্রেতা হিসাবে ব্রিটিশ মিউজিয়াম স্টুয়ার্ট সাহেবের সংগ্রহের একটা বড় অংশ নিজেদের দখলে নিলো। মিউজিয়ামের ইতিহাসে, এই নিলাম থেকেই যুক্ত হলো ভারতীয় পুরাতাত্বিক নিদর্শনের সর্বাধিক সংগ্রহ। আজ বিরিষ মিউজিয়ামে ভারতীয় পুরাতাত্বিক নিদর্শন হিসাবে যা কিছু প্রদর্শিত হয়, তার সর্বাধিক সংগ্রাহক এই চার্লস স্টুয়ার্ট।

ব্রিজ সাহেব সেই ১৮৩০-এর নিলামে চার্লস স্টুয়ার্টের সংগ্রহের বড় অংশটাই কিনে নেন। তবে সেই নিলাম থেকে আরো একটা অংশ যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিজস্ব সংগ্রহশালা “ইন্ডিয়া মিউজিয়াম”-এ। সেই সংগ্রহও কালক্রমে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সংগ্রহে যুক্ত হয় । তবে সে অন্য গল্প। অন্য কোনো দিন বলবো।

সাথে ছবি : পাল যুগের অগ্নি মূর্তি ও দূর্গা মূর্তি (স্টুয়ার্টের সংগ্রহ থেকে; এখন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রদর্শিত)

তথ্য সূত্র
• Calcutta Past and Present : Kathleen Blechynden
• The good Old Days John company by W H Carey
• A Vindication of the Hindoos from the Aspersions of the Revd Claudius Buchanam with a refutation of the arguments exhibited in his Memoir…By a Bengal Officer
• White Mughals – William Dalrymple
• Reference to “rifle” : Testimony of Lf. Marakham Kittoe in Empires of the Imagination: Politics, War and the Arts in the British World : By Holger Hoock; page 344)
• Life and Times of Carey, Marshman and Ward; Embracing the History of Serampore Mission by John Clark Marshman
• Sculpture from India by Michael D. Willis
• কলিকাতা : সেকালের ও একালের – হরিসাধন মুখোপাধ্যায়

লেখক – অমিতাভ পুরকায়স্থ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s