মেরি ইম্পে ও কোম্পানি শিল্প শৈলী (Company School of Art)

“দেখ ভাই ! আমরা ঠিক সময়েই এদেশে আসিয়াছি। এদেশের লোকের পায়ে জুতা নাই – তাহারা নগ্নগাত্র ! কি ভয়ানক অত্যাচার! দেখিতেছি, ঠিক সময়ই এদেশে উচ্চ আদালত প্রতিষ্ঠা করা হইয়াছে। এখানে কাজ করিবার পর, আমি এই সব লোককে নিশ্চয়ই জুতা পরিতে বাধ্য করিব। ইহাদের এ দুর্দ্দশা দূর করিব।”

কলকাতায় সদ্য স্থাপিত “সুপ্রিম কোর্ট”-এর বিচারক হিসাবে চাঁদপাল ঘাটে পা রাখলেন স্যার এলাইজা ইম্পে। সাল ১৭৭৩। সাধারণ শহরবাসী নতুন জজ সাহেবকে দেখতে হাজির হয়েছে। তাদের খালি পা, খালি গা। নাগরিকদের অবস্থা দেখে সাহেবের অনুভূতি ধরা পড়লো তার সহযাত্রীর সাথে কথায়, যা হুবহু নথিবদ্ধ আছে কটন সাহেবের লেখা সেকালের বৃত্তান্তে এবং হরিসাধন মুখোপাধ্যায়ের করা অনুবাদে। ।

সাহেব এসে কাজে যোগ দিলেন। শুরু করলেন বসবাস সাহেব পাড়ায় এক পেল্লাই বাড়িতে। বাড়ি সাথেই উদ্যান বা পার্ক। সেই থেকেই সামনের রাস্তার নাম পার্ক স্ট্রিট। যে পার্কের বিস্তার ছিল আজকের মল্লিকবাজার ক্রসিং পর্যন্ত। আর সেই ঐতিহাসিক বাড়িটাই আজকের লরেটো কনভেন্ট।

মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসির মোকদ্দমায় বিচার করে এলাইজা ইম্পে বাংলার ইতিহাসে স্থায়ী খলনায়ক হয়ে গেলেন । তার জেরে চিফ জাস্টিসের পদ খোয়ালেন। তারপর বিলেত ফিরে গিয়ে লম্বা আইনি লড়াইয়ের পর, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণিত করে ফিরে এলেন সার্বজনীন জীবনে। এবার রাজনৈতিক হিসাবে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হিসাবে ৭ বছর কাজ করে অবসর গ্রহণ করলেন ব্রিটিশ অভিজাত সমাজের এই সদস্য।

কিন্তু এবারের গল্প জাস্টিস ইম্পেকে নিয়ে নয়। এবার শোনাবো লেডি ইম্পের গল্প। সেই অর্থে লেডি ইম্পের গল্পও নয়। তবে এই গল্পের শুরুটা তিনিই করেছিলেন। প্রকৃতি-প্রেমী, বিজ্ঞান মনস্ক এক মহিলার অনুসন্ধিৎসার মধ্যে দিয়ে শুরু জ্ঞানন্নেষণের এক নয়া ধারাবাহিকতা । বিজ্ঞান আর শিল্পের এক নতুন মেলবন্ধন।

এই লেখাটা লিখতে গিয়ে অবচেতনে নিজের ছোটবেলার কিছু ঘটনাও ছায়া ফেললো। একটা সময় পাখি, গাছ, কীটপতঙ্গ চর্চা করতাম, মন দিয়ে। আমার হাজার খ্যাপামির আরও একটা দিক। কিছু প্রাণী দেখেছি, কিছু দেখা হয়নি। আমি জন্মাবার আগেই চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে তারা। মেরি ইম্পের এলবামে ‘pink headed duck’ বা গোলাপি মাথা হাঁসের ছবি দেখলাম। পার্ক স্ট্রিটের এই বাগানে এক সময় ঘুরে বেড়াতো তারা। নতুন করে বুঝলাম এটাকেই বলে – inheritance of loss

 

========================================================================

গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের কাজে সহায়তার উদ্দেশ্যে লন্ডনের সদর দফতর থেকে তিনজন অফিসার এলেন কলকাতায় কোম্পানির গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য হয়ে । খাতায় কলমে ‘সহাযতা লেখা হলেও, মূল উদেশ্য হেস্টিংসের ডানা ছাঁটা। একই সাথে চাঁদপাল ঘাটে নামলেন সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিস এলাইজাহ ইম্পে ও তাঁর স্ত্রী। গভর্নিং কাউন্সিলের নবনিযুক্ত সদস্যদের সাথে কাজকর্ম নিয়ে প্রচন্ড মতবিরোধ শুরু হলো। সব ব্যাপারেই হেস্টিংসের সাথে বাকিদের ঝামেলা। এর মাঝে একমাত্র ইম্পে আর লেডি ইম্পে, মেরির সাথে হেস্টিংসের পুরোনো সম্পর্কটা দিনকে দিন আরও ঘনিষ্ঠ হতে লাগলো। হেস্টিংস এবং ইম্পে একেবারে ছোটবেলার বন্ধু। হেস্টিংসের মতো ইম্পে দম্পতিরও ভারতীয় প্রকৃতি আর বিশেষ করে এখানকার বন্য জীবজন্তু – পাখি নিয়ে প্রচন্ড আগ্রহ। ছুটির দিনে দ্বিপ্রাহরিক আড্ডায় এখানকার ফুল, গাছপালা পশুপাখি নিয়েই আলোচনা গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যায়। কিছুটা হেস্টিংসের সাহায্যে, নিজেদের বাড়ির পার্কে মেরি ইম্পে গড়ে তুললেন একটা সংগ্রহালয় – এখানকার বিচিত্র পশুপাখি নিয়ে। সেই সংগ্রহশালায় জীবজন্তুদের পরিচর্যায় দিনের অনেকটা সময় কেটে যায় মেরির। কিন্তু তার মধ্যে মাঝে মাঝেই মনে হয় যে এই সব গাছ – ফুল পাখির সঠিক documentation করা প্রয়োজন। কিন্তু এখানে যে শিল্পীরা কাজ করেন তাদের নিজস্ব ঘরানা আছে। আছে মাধ্যম ব্যবহারের নিজস্ব রীতি। তাদের দিয়ে বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য ছবি কি তাঁদের দিয়ে আঁকানো যাবে? বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হয় আড্ডায়। তার থেকেই বেরিয়ে আসে একটা সমাধান সূত্র।

পাটনা থেকে তিনজন শিল্পীকে বিশেষ ভাবে এই কাজের জন্য নিয়ে এলেন ইম্পে। শেখ জায়নুদ্দীন (Sheikh Zain – ud- Din), ভবানী দাস আর রাম দাস। তারা তিনজনই মুঘল রীতিতে মিনিয়েচার আঁকায় পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু মেরি ইম্পের উদ্যোগে তারা ইংলিশ হোয়াইম্যান কাগজে, ইংলিশ জলরঙ ব্যবহার করে শুরু করলেন আঁকা। ইংলিশ বোটানিক্যাল ‘স্টিল লাইফ’ তাদের সামনে মডেল হিসাবে দেওয়া হলো। এবার নিজেদের শিক্ষা ও শিল্পবোধের ভিত্তিতে নতুন পদ্ধতি আর বিষয় নিয়ে আঁকা শুরু করলেন শিল্পীরা। জন্ম নিলো এক নতুন শিল্পপদ্ধতি, ভবিষতে যার নাম হবে “কোম্পানি স্কুল অফ আর্ট’ বা কোম্পানি শিল্পশৈলী।

মুঘল মিনিয়েচার আঁকার শিক্ষায় দীক্ষিত শিল্পীরা পাশ্চাত্য প্রথায় ও পদ্ধতিতে কাজ করতে লাগলেন মেরি ইম্পের কাছে। প্রায় তিনশোটির মতো এই ধরণের গাছ, ফুল, মাছ সরীসৃপ, পশু ও পাখির ছবি আঁকিয়েছিলেন মেরি। তার মধ্যে অর্ধেকের বেশি পাখির ছবি।

মুঘল সম্রাটরা অনেকেই পশু পাখা পুষতেন আর শিল্পীদের দিয়ে আঁকতেন সেই সব পোষ্যের ছবি। আবার মূর্তিও বানাতেন – যেমন জাহাঙ্গীরের ” jade terapin”। কিন্তু যথার্থ scientific representation কখনোই নয় সেগুলি। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে রিয়ালিস্টিক ছবি আঁকার প্রয়াস শুরু হলো, মেরি ইম্পের উদ্যোগে। সেই অর্থে আমরা বনে জঙ্গলে পাখি ফুল কীটপতঙ্গ দেখতে গিয়ে যে “ফিল্ড গাইড” ব্যবহার করি, তার পূর্বসূরী মেরি ইম্পের এই এলবাম।

রং ব্যবহারে মিনিয়েচারের সমস্ত নাটকীয়তা বাদ দিয়ে, অনুপুঙ্খ ডিটেলের প্রতি নজর দিয়ে আর সাবজেক্টের সঠিক চরিত্র ধরার জন্য হাইলাইটের ব্যবহার করে – এই ছবিগুলি অনন্য হয়ে উঠেছে। খেয়াল করে দেখবেন, মিনিয়েচার আর্টিস্ট সাবজেক্টকে তার প্রেক্ষাপট সহ আঁকবেন। এখানে কিন্তু সাবজেক্ট আঁকা হচ্ছে সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের উপর। অথবা ব্যাকগ্রাউন্ড খুব সংকুচিত করে আঁকা হচ্ছে। কখনো নিখুঁত ক্রস-সেকশনে আঁকা হচ্ছে ফুল ! নিখুঁত scientific drawing! এই ছবিগুলির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্কেল বা আনুপাতিক পরিমাপ। মিনিয়েচারের শৈল্পিক স্বাধীনতা বর্জন করে সঠিক অনুপাতে realistic ছবি আঁকতে শুরু করলেন শিল্পীরা। স্কেল বলতে যে সব সময় ছোট করে আঁকা তা নয়, বেশিরভাগ সময় নমুনাটি বড় করে আঁকতে হতো পুরো কাগজ ভরাট করার জন্য। অনেক সময় তাই পশু বা পাখির আসল আকারটাও লেখা হয়েছে ছবির পাশে।

মিনিয়েচার ঘরানার লক্ষণও পরিষ্কার বোঝা যায়। শিল্পীর সুক্ষ তুলির টানে পাখির পালকের ডিটেল ফুঁটে উঠছে। একটার উপর আরেকটা রঙের স্তর চাপিয়ে ভরাট করা হচ্ছে রং। সব মিলিয়ে যথার্থ ফিউশন। কয়টি ছবি সাথে রইল মেরি ইম্পের এলবাম থেকে।

লেডি ইম্পের এলবামের মধ্যে থেকে ১৯৭টি পাখি, ৭৬টি মাছ, ২৮টি সরীসৃপ, ১৭টি অন্যান্য স্তন্যপায়ী ও ৮টি ফুলের ছবি খুঁজে পাওয়া গেছে।

অনেক জায়গায় পেয়েছি যে এই শিল্পধারাটি প্রথম শুরু হয় মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে। কিন্তু তার সমর্থনে কোনো তথ্য আমার নজরে পড়েনি। যাই হোক, পরবর্তীকালে দেখা যাচ্ছে যে ভারতের অন্যান্য জায়গাতেও এই শিল্পধারায় কাজ হয়েছে। যেমন – মুর্শিদাবাদ, পাটনা, বেনারস, লখনৌ, আগ্রা, দিল্লী পাঞ্জাব এবং পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন কেন্দ্রে ।

মেরি ইম্পের এই নিরীক্ষার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে সব ধরণের visual documentation – এর জন্য ব্যবহৃত হতে শুরু করলো এই নতুন শিল্প শৈলী। প্রচুর পরিমাণ বোটানিক্যাল স্পেসিমেন ও পশু পাখি আঁকার জন্য কোম্পানির অফিসাররা নিয়োগ করতে লাগলেন মিনিয়েচার আঁকায় দক্ষ শিল্পীদের। তার পরে ভারতীয়দের দৈনন্দিন জীবন শৈলী, বিভিন্ন জীবিকার মানুষ, ঐতিহ্যশালী ইমারত সব আঁকা হতে লাগলো। আর তারপর বিভিন্ন হিন্দু দেব দেবীর ছবি। যাকে বলে স্থানীয় সংস্কৃতির visual document, তার জন্য ব্যবহৃত হতে শুরু করলো এই শিল্প শৈলী।

১৭৮৩ সালে ইম্পে পরিবার বিলেতে ফিরে গেলেন । কিন্তু রেখে গেলেন নতুন এক শিল্পধারা।

========================================================================

এরপর আমাদের গল্পে নতুন এক নায়কের প্রবেশ। এডওয়ার্ড মুর। অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়ার ফলে বিলেতে ফিরে যান ১৮০৫ সালে, ৩৫ বছর বয়সে। কিন্তু তার আগে দুই দশকের উপর এদেশে থাকাকালীন তিনি হিন্দু ধর্ম, পুরান ও ধর্মীয় চিহ্নগুলি নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেন ও এদেশীয় শিল্পীদের নিয়োগ করেন দেব দেবী, সৃস্টিতত্ব, পৌরাণিক কাহিনীর নানারকম ছবি আঁকার জন্য। ১৮১০-এ নিজের পড়াশোনার উপর ভিত্তি করে প্রকাশ করেন “The Hindu Pantheon” , যাকে বলা যায় হিন্দু ধর্মের প্রথম বিশ্বকোষ। হিন্দুদের প্রাত্যহিক ধর্মীয় আচরণের প্রথম সিরিয়াস ডকুমেন্টেশন এই বই। হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে সেই সময় ইউরোপিয়ানদের মধ্যে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল ধারণা সংশোধন করতে সাহায্য করে মুরের বই। প্রায় একশতাব্দী সেই বইয়ের কদর ছিল। কিন্তু আজও মুর সাহেবের কথা আলোচনায় উঠে আসে – মূলত তিনি নিজের গবেষণার যে সব মিনিয়েচার ছবি সংগ্রহ করেছিলেন বা আঁকিয়ে ছিলেন, সেগুলির জন্য। এই ছবিগুলিও অধিকাংশ কোম্পানি শৈলীতেই আঁকা – যা একাধারে সেই সব অজানা শিল্পীদের দক্ষতা ও তার সাথে সেই শিল্পীদের ব্রিটিশ পৃষ্টপোষকদের অনুসন্ধিৎসা ও প্যাশনের নিদর্শন।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মুসলিম শিল্পী খ্রিস্টান পৃষ্ঠপোষকের সহায়তায় আঁকছেন হিন্দু ধর্ম আশ্রিত বিষয়। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের সমান অংশদানে যে ভারতীয় ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, তার উজ্জ্বল নমুনা এই শিল্প-শৈলী।

সেই যুগের উপনিবেশিক শাসন কর্তাদের হিন্দু ধর্মের প্রতি আগ্রহ নজরে এড়ায়নি এক ইরানি পর্যটকের। মীর আব্দুল লতিফ সুস্তারী ঊনবিংশ শতকের প্রথম দিকে ভারত ভ্রমণের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন – ” যে ভাবে ব্রিটিশরা হিন্দু ও মুসলিম – দুই সম্প্রদায়ের উৎসব ও পার্বনগুলিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন ও মানুষের সাথে মেলামেশা করেন, তা বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।” সুস্তারী আরও লিখেছেন ” তাঁরা (ব্রিটিশরা) ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে পন্ডিত জ্ঞানী ব্যক্তিদের বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন। ”

কিন্তু সমগ্র মানব সভ্যতার দুর্ভাগ্য যে ভারতের আধ্যাত্মিক উপলব্ধির প্রতি এই বৌদ্ধিক অনুসন্ধিৎসা বেশি দিন টিকলো না। ১৮১৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সনদে একটি জরুরি সংশোধন করার ফলে ভারতে মিশনারিদের কাজ কর্মের নতুন ঢেউ উঠলো। উইলিয়াম উইলবারফোর্স ব্রিটিশ সংসদের সদ্যস্যদের ব্যাখ্যা করে জানালেন “শোচনীয় অজ্ঞতা ও পাপ (abject ignorance and vice) থেকে ভারতীয়দের উদ্ধার করা মিশনারিদের উদ্দেশ্য।” যে পাপের মূল উৎস পৌত্তলিকতা !!

কয়েকবছরের মধ্যেই মিশনারিরা হিন্দুদের সম্পর্কে সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল পাল্টে ফেলতে লাগলেন। হিন্দুরা আর তাঁদের কাছে প্রাচীন প্রজ্ঞার ধারক ও বাহক রইলেন না। তাদের কাছে হিন্দুদের পরিচয় দাঁড়ালো দরিদ্র, অজ্ঞ তমসা-নিমজ্জিত, ধর্মহীন এক হীন জাতি।

১৮৩০-এর দশক থেকে এক আগ্রাসী গোত্রের মিশনারিদের দেখা যেতে লাগলো এদেশের ক্যান্টনমেন্টগুলি। রেভারেন্ড আইনশ্লাই ছিলেন এই রকম একজন ধর্ম প্রচারক। তার উড়িষ্যা ভ্রমণের বৃত্তান্ত লিখতে গিয়ে বলছেন ” আমি মৃত্যু উপত্যকা ঘুরে এলাম। অন্ধকারের গভীরতম গহ্বর দেখে এলাম।” এরপর তিনি নিকৃষ্টতম পাপ আর অনাচারের অনুষ্ঠান বর্ণনা করতে গিয়ে লিখছেন “ব্রিটিশ কর্মচারীরা প্রতিমার অঙ্গসজ্জা প্রদান করছেন সেই সব পৌত্তলিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। …. সে ভয়ঙ্কর দৃশ্য বর্ণনার ভাষা নেই। ভেবে দেখুন, শুধু উপঢৌকন দিয়েই শেষ নয়। ইউরোপিয়ান ভদ্রজনেরা উপুড় হয়ে পুজোয় অংশ নিচ্ছে !”

রেভারেন্ড আলেকজান্ডার থমসনের কথা আগেও বলেছি – চার্লস স্টুয়ার্টের গল্প বলতে গিয়ে। তিনি তো পরিষ্কার বললেন যে ১৭৯০ থেকে ১৮২০-র মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চ পদাধিকারীরা ছিলেন ধর্মভ্রষ্ট মানুষ।

এই মিশনারিরা মুর, স্টুয়ার্ট বা অন্য অফিসার – যারা দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি ঔৎসুক্য বা সহানুভূতি দেখাচ্ছিল, তাদের ভীষণ ভাবে আক্রমণ করতে লাগলেন। ব্রিটিশ মনন এর ফলে সংকুচিত হতে শুরু করলো আর কয়েক বছরের মধ্যেই এক সামগ্রিক “হিন্দুফোবিয়া” গ্রাস করলো ব্রিটিশ সমাজকে। এই যুগের অগ্রগণ্য শিল্প ধারাটি এই আক্রমণের মুখে আর পারলো না টিকে থাকতে। ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের আগেই, এক ক্ষণস্থায়ী ফুলের মতো কিছুদিন সৌরভ ছড়িয়ে শুকিয়ে ঝরে গেল কোম্পানি শিল্প শৈলী। .

এর মধ্যে ফটোগ্রাফির আবিষ্কার হয়ে গেলো আঠাশতকের মাঝামাঝি কলকাতায় খুলে গেলো বোর্ন এন্ড শেপার্ডের দোকান। সেই কারণেও খানিকটা, ত্বরাহ্ণিত হলো কোম্পানি শৈলীর পতন।

মেরি ইম্পে যেমন পশু পাখির ছবি আঁকার পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন তেমনি কর্নেল জেমস স্কিনার মূলত আঁকিয়েছেন এদেশের সামাজিক চিত্র। উইলিয়াম ফ্রেজার আবার বিখ্যাত দিল্লির শাহী ও দরবারী চিত্রাবলীর অনুগ্রাহক হিসাবে। তার ‘দিল্লি এলবাম’ কোম্পানি স্কুলের এক মাস্টারপিস। শুধু প্যাট্রন বা সহায়ক হিসাবেই নয়, অনেক ইউরোপিয়ান শিল্পী হিসাবেও প্রভূত সাফল্য পেয়েছিলেন। যেমন পাটনার স্যার চার্লস ডি’ওলিলি, জয়পুরের ডাক্তার ডি ফ্যাবেক, ইত্যাদি। এদের প্রত্যেকের জীবনের গল্পই হাঁ করে শোনার মতো। শিল্প সংস্কৃতি রাজনীতি পারস্পরিক হিংসা খুন জখম – সব নিয়ে জমজমাট মশলা। কিন্তু এই সিরিজে যেহেতু কলকাতা কেন্দ্রিক গল্প-ই বলবো সেই গল্প এখানে নয়।

এই সময় ব্রিটেনেও খবর হয়ে গেলো যে ভারতে শিল্পচর্চার ভালো কদর। শুধু কোম্পানী স্কুলের শিল্পীরাই নন, ইউরোপের তৎকালীন নিও-ক্লাসিক্যাল ধারায় যারা আঁকতে অভ্যস্ত, তারাও সমাদর পেতে পারেন এই নতুন বাজারে। সেই ভরসায় জাহাজে চড়লেন অনেক ইউরোপীয় শিল্পী। যাত্রা শুরু হলো নতুন ভাবে ভাগ্যন্নেষণের।

তথ্য সূত্র:
আগে দেওয়া বই ও প্রবন্ধগুলির সাথে যুক্ত হলো
• Memoirs of Sir Elijak Impey: Knt., First Chief Justice of the Supreme Court of Judicature at Fort William Bengal By Elijah Barwell Impey
• Menagerie: The History of Exotic Animals in England By Caroline Grigson
• Online resources from National gallery of Modern Art, Metropolitan Museum, and other museums

লেখক – অমিতাভ পুরকায়স্থ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s