কলকাতার কামান

দুম! দুম ! দুম !! কামান গর্জে উঠলো। দেশের মানুষ জানতে পারলো যে রাজবাড়ীর দুর্গাপূজা শুরু হলো।

শুধু বিষ্ণুপুর নয়, এই প্রথা সারা বাংলায় আরও অনেক বনেদী পুজোর অঙ্গ। আসানসোলের ঘোষালবাড়ি থেকে কলকাতায় জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়ীর মতো বনেদী পুজোয় কামান দাগার প্রথা ছিল। এছাড়া সন্ধি পুজোর সময় অনেক জায়গায় বন্দুক ছোঁড়া হয়। অষ্টমীকে পালন করা হয় বীরাষ্ঠমী হিসাবেও।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক প্রথা-ই বদলেছে। কিছু কিছু প্রথা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়ে নতুন চেহারা নিয়েছে – যেমন স্থানাভাবে এখন বন্দুক ছোঁড়া হয় অনেক জায়গায়, প্রাচীন প্রথা কামান ছোঁড়ার পরিবর্তে।

একটা সময় ছিল সারা কলকাতা জুড়েই নানা জায়গায় কামান দেখা যেত। বিশেষ করে ফোর্ট উইলিয়ামের সেনা ছাউনি ও ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানী হওয়ার সুবাদে ক্ষমতা প্রতিপত্তি জাহির করতো সেই সব সাবেক কামান। কোথাও যুদ্ধ জয়ের স্মারক হিসাবে আবার কোথাও রাজশক্তির প্রতিভূ হিসাবে শোভা পেত কামান গুলি। এই ২০১৭ সালেও অদ্ভুত সব জায়গায় পাওয়া যায় নানা মাপের না প্রযুক্তিতে তৈরী সেই সব কামান।

তখন আমি গুজরাটের একটি সিডি (কম্প্যাক্ট ডিস্ক) প্রস্তুতকারী সংস্থার কলকাতা এজেন্ট হিসাবে কাজ করি। প্রতি মাসে রিজার্ভ ব্যাংকে জমা দিতে যাই ট্যাক্সের টাকা। একেকদিন খুব লাইন পড়ে ব্যাংক খোলার আগেই। কর প্রদানকারী, খুচরো পয়সার কারবারি, ছেঁড়া নোট বদলাবার ফড়ে – সবাই লাইনে। এই সময় প্রথম খেয়াল করলাম যে জি.পি.ও এবং রিজার্ভ ব্যংকের মাঝখানে একটা গ্রিল দিয়ে ঘেরা জায়গা। আবর্জনা ভর্তি। তার মধ্যেই গাঁথা রয়েছে দু-দুটি কামান। জঞ্জালের এই গাদায় কামান কেন? প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে থাকে মাথায় . তখন এত গুগুল ছিল না। অনেক খুঁজে বের করেছিলাম সেই কামানের গল্প – যার সাথে সিরাজের কলকাতা আক্রমণ, পুরোনো ফোর্ট উইলিয়াম ধ্বংস আর ইতিহাসের এক বিতর্কিত অধ্যায় “অন্ধকূপ হত্যাকান্ড”-র গল্প জুড়ে আছে।

কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় রাখা প্রাচীন কামানের তালিকায় দেখা যে শুধু ফোর্ট উইলিয়াম নয়, সেই তালিকায় রয়েছে – এশিয়াটিক সোসাইটি, ভারতীয় জাদুঘর, মেট্রো রেল ভবন, টিপু সুলতানের মসজিদ (ধর্মতলা এবং টালিগঞ্জে), বেহালার রাজ্য পুরাতাত্বিক সংগ্রহালয়, টাউন হল, সাহিত্য পরিষদ, ভিক্টরিয়া মেমোরিয়াল, কলকাতা পৌরসভা – নানা জায়গা, যার সাথে কলকাতার ইতিহাসের সম্পর্ক ছিল।

ধর্মতলার টিপু সুলতানের মসজিদে ১৫টি আর টালিগঞ্জে ১১ টি কামান আছে শ্রীরঙ্গপত্তনমের যুদ্ধের পর সব মহীশূর থেকে নিয়ে আসা হয় – সুলতানের তোপখানার অংশ। তবে বলে না দিলে বোঝা কঠিন – কারণ সেগুলি ল্যাম্প পোস্ট হিসাবে ব্যবহৃত হয় !!

রাজভবনে ঢোকার সৌভাগ্য একবার-ই হয়েছিল। বন্ধু Sujan – এর দৌলতে। তখন গোপালকৃষ্ণ গান্ধী রাজ্যপাল। বন্যপ্রাণী সপ্তাহে উপলক্ষে একটা বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে সুজনের ল্যাংবোট হয়ে হাজির হয়েছিলাম। সেখানে দেখেছিলাম চীনা কামান – যেটি ব্রিটিশরা নান কিন্-এর লড়াই থেকে জিতে এনেছিল। কামানটি একটি ডানাওয়ালা ড্রাগন আকৃতির ক্যারেজের উপর বসানো। সেই গান ক্যারেজটিও দেখার মতো। ব্রোঞ্জের তৈরী কামানটি কালো রং দিয়ে সংরক্ষণ করা। (ছবিটা নেট থেকে নেওয়া)

ফোর্ট উইলিয়ামের ভেতর আছে একটি “গান পার্ক”। সেখানে আছে অনেকগুলি আকর্ষণীয় কামান। ব্রিটিশদের নানা যুদ্ধ জয়ের স্মারক হিসাবে রাখা আছে কামানগুলি। ফোর্ট উইলিয়ামের উপর একটা খুব ভালো বই আছে -“Fort William : Calcutta’s Crowning Glory ” সেখানে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া আছে এই গান পার্কে রাখা বিভিন্ন কামানের। যেমন সিরাজদৌলার কামান বা চুঁচুড়ার ডাচদের থেকে লর্ড ক্লাইভের জেতা কামান, এংলো শিখ লড়াই জয়ের স্মারক কামান।

তবে ফোর্ট উইলিয়ামের কামানগুলির মধ্যে সব থেকে আকর্ষিণীয় সম্রাট ঔরংজেবের সময়ের একটি কামান, যার নাম জাফরবক্স। ঢালাই ব্রোঞ্জ এবং ঢালাই লোহার মিলিয়ে তৈরী এই অপূর্ব কামানটির নির্মাতা হিসাবে কামানের গায়ে খোদাই করা আছে “মথুরা দাস”-এর নাম। ফার্সি ক্যালিগ্রাফি-তে খোদাই করা আছে কামানের নির্মাণ ইতিহাস। তবে কিভাবে এই মুঘল কামান ফোর্ট উইলিয়ামে পৌঁছলো, তার কোনো হদিশ নেই। ১৬১৪ সালে তৈরী এই কামানটি সেই সময় ভারতে ধাতু বিদ্যার (metalurgy) চরম উৎকর্ষের নিদর্শন। সেখান থেকেই তুলে দিলাম জাফরবক্সের ছবি।

কলকাতা টাউন হলের সামনে এর একটি ঐতিহাসিক কামান প্রদর্শিত বাংলা ও ইংরেজিতে পরিচিতি লেখা আছে “ক্রুপ গান” ১৮৯৯ – ১৯০২ সালে সংগঠিত দক্ষিণ আফ্রিকার বোয়ার যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল কামানটি। সাথে দেওয়া ছবিটি আমার তোলা।

তবে সব কামানের সাথেই জেতার ইতিহাস না থাকতেও পারে। যেমন দমদমের এই অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি মূলত গোলা তৈরীর জন্যই স্থাপিত হয় ১৮৪৬ সালে। প্রথম এংলো – আফগান যুদ্ধে গোলা-বারুদের অভাবে ব্রিটিশদের হার হওয়ার ফল হিসাবে স্থাপন করা হয় এই কারখানা । অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির পাশেই দেখা যায় “Afgan War Memorial (1841-42)” সেই যুদ্ধে যে সব ব্রিটিশ অফিসাররা প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্মৃতি স্তম্ভ।

জীবনের বেশির ভাগ সময়টাই কাটিয়েছি দমদমে। বাবা কাজ করতেন দমদমের অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিতে। পদস্থ কর্মচারীদের আবাস রাজাবাগান এস্টেটের সামনে দেখতাম দুটো কামান – এখনো প্রতি বছর রং করে চকচকে। দমদম ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনেও আছে একটা কামান। আজকাল যার আবার সহবাস করতে হচ্ছে রবি ঠাকুরের মূর্তির সঙ্গে !

দিন কয়েক আগে আমার স্কুলের জুনিয়ার ভাই Sumit-এর বাড়ী গিয়েছিলাম, আড্ডা মারতে। বহুবার বলে যেতে, সময় সুযোগ হয়ে ওঠে না। তাই সেদিন একটু ফাঁকা দেখে ঢুঁ মেরে এলাম । দমদম অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গেছে, সেখানেই ওর বাড়ী। যাওয়ার পথে আফগান মেমোরিয়ালের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। পেছন থেকে একটা বড় গাড়ি বেশ জোরে হর্ন বাজালো। বাঁদিকে সরতে গিয়ে দেখলাম রাস্তার ধারে পোঁতা একটা কামানের মুখ (muzzle) উঁকি মারছে। সীমানা নির্দেশকারী পিলার হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কামানটি !!

কামানের আবিষ্কারের সাথে সাথেই বারুদের আবিস্কারের প্রসঙ্গ চলে আসে। বলা হয় যে চীনারাই বারুদ তৈরীর কৌশলকে পোক্ত ফর্মুলার রূপ দেন। তারপর মঙ্গোলদের অভিযানের মধ্যে দিয়ে এই ফর্মুলা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। তবে এই সূত্রে একটা মজার তথ্যের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়ের ক্লাসিক ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে” – র প্রাককথন পর্বে উনি জানিয়েছে যে পর্তুগিজদের আগে ভারতে আগ্নেয়াস্ত্রের প্রচলন ছিলো না বলে যারা মনে করে, তাদের ধারণা ভুল। “বাবর নামা”-য় নাকি উল্লেখ আছে যে বাঙালিরা আগ্নেয়াস্ত্র চালনায় নিপুন ছিল। সেই দক্ষতা কোথায় হারিয়ে গেল ? এও কি ঐতিহ্য বিস্মরণ ? হয়তো তাই।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s