পুণ্যার্থীদের পথ ধরে….( চিৎপুর দ্বিতীয় ভাগ)

সিভিক ভলান্টিয়ার ভদ্রলোকের নির্দেশ মতো গঙ্গার ঘাট থেকে আবার ফিরতি পথ ধরলাম। এবার দৃষ্টি নিবদ্ধ বাঁ দিকে। গান শেলের গেট পেরোতেই একফালি সরু রাস্তা আর তারপরেই দেখতে পেলাম কাঙ্খিত সেই আদি চিত্তেশ্বরী দেবীর মন্দির। সত্যি কথা বলতে প্রথম বার নজর এড়িয়ে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। সামনে একটা উঁচু তোরণ আছে বটে – কিন্তু তার সামনে বনসৃজনের জন্য লাগানো গাছটায় ঢাকা পড়ে গেছে অনেকটাই। তার থেকেও বড় কারণ যে মন্দিরের ঠিক উল্টো দিকে গান শেলের আরও একটা গেট। সেই গেটের সামনে লাগানো সাইন বোর্ডটাই আমার আকর্ষণ কেড়ে নিয়েছিল প্রথমবার। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের উপর সাদা হরফে লেখা আছে – “০.৩২ পিস্তল গ্রাহক-রা এখানে বিপণন বিভাগে যোগাযোগ করুন”।

মন্দিরের সামনে কোনো ফুল মালা পূজা উপাচারের দোকান নেই। সামনের মূল ফটকে তালা দেওয়া। মন্দির বন্ধ। গেটের সামনেই একজন ঝুড়িতে করে কাঁকড়া বিক্রি করেছেন – তাকেই জিজ্ঞেস করলাম।
– দাদা – এটাই কি আদি চিত্তেশ্বরী মন্দির
– হ্যাঁ। কিন্তু মন্দির তো এখন বন্ধ – খুলবে সেই পাঁচটায়।
– ও, তাহলে তাও প্রায় ঘন্টাখানেক।
– হ্যাঁ, তা তো বটেই।
– তাহলে অপেক্ষাই করি। তা এই কাঁকড়া আনলেন কথা থেকে ?
– এখানেই ধরলাম নদী থেকে। একদম জ্যান্ত, নেবেন নাকি?
– না – না আমার লাগবে না। এখানে অন্য কাজে এসেছি। তা এখানে মন্দিরের সামনে আপনার এই কাঁকড়া কিনবে কে?
– এই তো গান শেলের ছুটি হবে একটু পরে। দাঁড়ান না আধ ঘন্টায় সব বিক্রি হয়ে যাবে। আমি মাঝে মাঝেই এটা সেটা নিয়ে এখানে বসি।

বেশ অন্যরকম গল্প। দুশো মিটার দূরেই আরেকটি মন্দিরের পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে একদম অন্য একটা দুনিয়ায় যেন এসে পড়লাম। একটার সামনে ফুল মালা ধুপ মিষ্টির স্থায়ী দোকান, পূজারীদের ব্যস্ততা আর ব্যবসাসত্ব আগলানোর তোড়জোড়। আর আরেকটার সামনে শুধু একজন ঝুড়িতে করে গোটা দশ-পনের কাঁকড়া ফেরি করছেন । মন্দিরের গেটে তালা।

গান শেলের ছুটি হয়নি এখনো। তাই কাঁকড়াওয়ালা ভালো কাঁকড়া চেনার পদ্ধতি শেখাতে শুরু করলেন। কি ভাবে পুরুষ ও স্ত্রী কাঁকড়া চিনতে হয়। কোনটা খেতে বেশি ভালো। কাঁকড়া রান্না কি ভাবে করলে ভালো হয়। যাদের এলার্জি আছে, তাদের যে কাঁকড়া খাওয়া উচিত নয়, সেটাও জানাতে ভুললেন না !

এই আলোচনার মধ্যেই এসে জুটলেন আরেক ভদ্রলোক। লাল গেঞ্জি, জিনসের প্যান্ট, গলায় সোনার চেন। সানগ্লাসটা মাথার উপরে তুলে নতুন রয়েল এনফিন্ড বাইকটা সাইড করে রাখলেন। শুরু করলেন কাঁকড়ার দরদাম। বাইকের পেছনে দেখলাম সেন্ট্রাল ডিফেন্স ক্যান্টিনের ছাপ মারা। মানে কাঁকড়াওয়ালার ক্রেতারা আসা শুরু হয়েছে। আমি বাকি সময়টা কাটানোর অন্য পথ দেখি।

আবার চৌমাথায় পৌঁছে নতুন মসজিদটার নিচে এক ফলওয়ালার কাছে বসেরি মসজিদের খোঁজ করি।
– বসেরি ? ওই নামে তো কোনো মসজিদ নেই এখানে। বলেন ভদ্রলোক। তবে সব থেকে ভালো হয় যদি কাশিপুর থানায় খোঁজ করেন, রাস্তার ওদিকেই থানা। যোগ করেন উনি।
রাস্তা পেরিয়ে কাশিপুর থানার সামনে মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় তৈরী বাস স্ট্যান্ড, যার উপর বোর্ড লেখা ” Bus Stop for Sarvamangala Temple”। সামনেই দুজন – তিনজন পুলিশ কর্মী দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রথমে বসেরি মসজিদ আর তার পরে কর্পোরেশনের তালিকায় দেওয়া ঠিকানা জিজ্ঞেস করলাম।
– না না আমাদের এলাকায় তো এমন কোনো মসজিদ নেই ! তবে যে রাস্তাটার কথা বলছেন, সেটা তো এখন থেকে খানিকটা দূর – সেই টালা ব্রিজের নিচে। ওখানে শেঠ পুকুর রোড আছে। তবে পঞ্চানন মুখার্জী রোড আছে কি না বলতে পারবো না। জানালেন এক পুলিশ কর্মী।

থানার সামনে থেকে দক্ষিণ দিকে কাশিপুর রোড ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। দুপাশে রেলের গোডাউনের মাঝেমাঝেই নানারকম দোকান। তার মধ্যে কম্পিউটার টিউটোরিয়াল থেকে মনিহারি – সবই আছে। একজায়গায় তো পর পর বেশ কয়েকটা সোনার দোকানও রয়েছে। প্রায় মিনিট দশেক যাওয়ার পরে ভাবলাম আরও একবার কাউকে জিজ্ঞেস করি। ফুটপাথের উপরেই একটা ছোট মতো দরগা। সামনে বসে থাকা সাদা দাঁড়ি আর পাজামা কুর্তা পরা বয়স্ক ভদ্রলোককেই জিজ্ঞেস করতে দাঁড়ালাম। এক বিহারি মহিলার মেটে সিঁদুর মাখা মাথায় মন্ত্র পরে ফুঁ দিচ্ছিলেন। পাশে বোধহয় দাঁড়িয়ে ভদ্রমহিলার স্বামী। কাজ শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করলাম একটু। খালি হতেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।
বসেরি মসজিদ শুনে মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ।
-জ্বি বসেরি মসজিদ তো ছিল। লেকিন অভি ভি আছে কি না বলতে পারবো না। ইস সাইড কি ওজায় বাগবাজার সাইড সে জানে মে আসানি হোগা। কাশিপুর ব্রিজ কে বাদ কিসিসে পুছে নেবেন।

ভালো পরামর্শ পেয়ে আজকের মতো মতো বসেরি মসজিদ খোঁজা থেকে নিরস্ত হলাম। এদিকে সন্ধে হয়ে আসছে। চিত্তেশ্বরী মন্দির খুলে গেছে নিশ্চয়ই। সেই কাজটাই আজ শেষ করি।

কিংবদন্তি কল্পনা আর কিছুটা হয়তো ঐতিহাসিক সত্য মিলিয়ে তৈরী এই চিত্তেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস। মন্দিরের গায়ে সাইবোর্ডে লেখা আছে প্রতিষ্ঠার সাল ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দ। জমিদার মনোহর ঘোষের হাতে। আগের একটা লেখায় যে বারাণসী ঘোষের কথা লিখেছিলাম, তিনি এই মনোহর ঘোষের পৌত্র। এই পর্বের প্রথম লেখাটা পড়ে এই যোগসূত্রের কথা জানিয়েছেন ফেসবুকের বন্ধু অরিন্দম আচার্য।

তারও আগে এই চিত্তেশ্বরী দুর্গা নাকি ছিলেন চিতে ডাকাতের আরাধ্য দেবী। চিতে ডাকাতের মৃত্যুর অনেক বছর পর নৃসিংহ ব্রহ্মচারী নামে একজন তান্ত্রিক এই দেবীমূর্তি আবার খুঁজে পান ও নিয়মিত পূজার্চনা শুরু করেন। সেই সময়ই মনোহর ঘোষ মন্দির প্রতিষ্টা করে কিছু সম্পত্তি দেবোত্তর করে দেন। ব্রহ্মচারী নিযুক্ত হন দেবীর সেবায়িত হিসাবে। এই মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে আমার থেকে অনেক বেশি যোগ্য একজন মানুষের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া যাক। কলকাতা গবেষক শ্রী দেবাশীষ বসু লিখেছেন :
“সরজমিন অনুসন্ধান করে দেখা যাচ্ছে যে নৃসিংহ ব্রহ্মচারীর পর তার শিষ্য রামনৃসিংহ ও প্রশিষ্য ক্ষেত্র ব্রহ্মচারী চিত্তেশ্বরীর মোহান্ত হন। বিশেষ কারণে ক্ষেত্র ব্রহ্মচারী বিয়ে করতে বাধ্য হন। তার দুই কন্যা। জ্যেষ্ঠ্য যদুমনির বিবাহ হয় অশীতিপর এক বৃদ্ধের সাথে ও কনিষ্ঠা ক্ষেত্রমণি বরিশার সাবর্ণ বংশীয় আনন্দমোহন রায়চৌধুরীর সাথে পরিনিতা হন। বর্তমান সেবায়েত শ্রী রবীন্দ্রকুমার রায়চৌধুরী আনন্দমোহনের প্রপৌত্র। সুতরাং চিত্তেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস মাত্র সাত প্রজন্মের।”
এই তথ্যের ভিত্তিতে তারাপদ সাঁতরা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে সাত পুরুষের হিসেবে দিয়ে চার শ’ বছরের হিসেবে মেলানো একান্তই অসম্ভব। তাছাড়া স্থাপত্য বিচারেও মন্দিরটি এত পুরোনো বলে মনে হয় না।

ফিরে দেখলাম মন্দির খুলে গেছে। আলো জ্বলছে । সামনে দু-এক জন মানুষ বসে আছেন। তাদের মধ্যেই একজনকে জিজ্ঞেস করলাম – এখানকার সেবায়েত আছেন কি? দেখা করা যায় ওনার সঙ্গে?
– না উনি এখনো কাজ থেকে ফেরেননি। তবে ওনার স্ত্রী আছেন – কিন্তু ওপরে বিশ্রাম করছেন।
– এখানে ছবি তোলা যায় ? জিজ্ঞেস করলাম
– অনেকেই আসে ছবি তোলে। সেই নিয়ে কোনো বারণ নেই।

পেডিমেন্ট, কোরিন্থিয়াম পিলার আর পঙ্খের কাজ করা মন্দির। এই মন্দিরটিও দালান রীতিতে তৈরী। কিন্তু উপরে একটা চূড়া যোগ করা হয়েছে, পরে। সামনে নাটমন্দির। প্রশস্ত বসার জায়গা। মূল বিগ্রহ চিত্তেশ্বরী দুর্গার। সিংহের মুখের আদল ঘোড়ার মতো – যেমনটা কলকাতার অনেক বনেদি বাড়ীর প্রতিমায় দেখা যায়। অতিরিক্ত যেটা নজরে পড়ে – দূর্গা, সিংহ ও অসুরের সাথে একটা বাঘের মূর্তিও যুক্ত হয়েছে। কলকাতার অতীতের স্মৃতি চিহ্ন হিসাবে, যখন এই জায়গা সুন্দরবনের অংশ ছিল আর মানুষ ছিল বাঘের উপদ্রবে ব্যাতিব্যাস্ত।
মূল বিগ্রহ ছাড়াও অন্যান্য বিগ্রহের নিয়মিত পূজা হয়। আগের মোহান্ত ও সেবায়েতদের স্মৃতিফলক দেখলাম। দেখলাম দেবাশীষ বসুর লেখায় উল্লিখিত রবীন্দ্রকুমার রায়চৌধুরীর মূর্তিও। মূর্তির নিচে লেখা ওনার পরলোকগমনের সাল – ১৯৯০।

বেশ একটা ঢিলেঢালা ভাব। মিথ্যে বলবো না, ভালোই লাগলো। সেবাইত অন্য কাজ করেন, মন্দিরটাকে রোজগারের পথ করেননি । নাকি মন্দিরের রোজগার থেকে সংসার চলে না, তাই অন্য কাজ করতে হয়? আমি জানতে চাইও না। আগ্রাসী ধর্মব্যবসা না হলেই ভালো। তাছাড়া নিজেদের মতো করে মন্দিরের ইতিহাস যাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাংলায় লেখা বোর্ড দেওয়াটাও আমার ভালো লেগেছে।

সন্ধ্যা ঘন হয়। বাড়ি ফেরার জন্য আবার রাস্তায় নামি। পায়ে পায়ে পেরিয়ে যায় চৌমাথা, রেল-ইয়ার্ড, কবরখানা। কাল কোজাগররী পূর্ণিমা। মস্ত একটা চাঁদ ওঠে আকাশে। আমার মনে হয়, নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে পা রাখার পরেও তো মানুষ চাঁদের বুকে চরকা কাটা বুড়ির গল্প শুনছে। এটাই “willful suspension of disbelief” …
রোজ কত কী ঘটে যাহা তাহা – / এমন কেন সত্যি হয় না আহা।
ঠিক যেন এক গল্প হত তবে, / শুনত যারা অবাক হত সবে ..
সেই রকমই না হয় কিছুক্ষণ অবিশ্বাসের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসে মনে করি সত্যিই ছিল এক চিতু ডাকাত, সত্যিই এই মন্দির চার’শ বছরের! ক্ষতি কি ?

22289857_10207627712769435_4639855496946155700_o

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s