পুণ্যার্থীদের পথ ধরে….( চিৎপুর – শেষ ভাগ)

বেলগাছিয়ার বাগান বাড়ি – ছুরি কাঁটার ঝনঝনি / খানা খাওয়ার কত মজা আমরা তার আর কি জানি ? / জানেন ঠাকুর কোম্পানি !!
পূর্ণেন্দু পত্রীর “ছড়ায় মোড়া কলকাতা” নামে পাতলা বইটায় প্রথম পড়ি ছড়াটা। প্রিন্স দ্বারকানাথ, প্রিন্স অফ ওয়েলসকে বেলগাছিয়া ভিলায় আপ্যায়ন করা আর হরেক বড়মানুষির গল্প। কার টেগোর এন্ড কোম্পানির উত্থান ও পতন যার সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। দ্বারকানাথের মৃত্যুর পর দেখা গেল পারিবারিক দেনার পরিমান প্রচুর। তাই পুত্র দেবেন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোর বাড়ি রেখেছে বেলগাছিয়া ভিলা নিলামে চড়ালেন। বাড়ি কিনলেন কান্দি-পাইকপাড়ার রাজপরিবার, মাত্র ৫৪ হাজার টাকায়। বাড়ির অস্থাবর সম্পত্তি কিনে নিলেন বর্ধমানের মহারাজ, যার মধ্যে ছিল বিলেত থেকে নিয়ে আসা দ্বারকানাথের সাধের ক্রকারি-কাটলারী সেট।
কান্দি পাইকপাড়া পরিবারের আদি পুরুষ অনাদিবর সিংহ নবম শতকে রাজা আদিশুরের সময় বঙ্গদেশে বসতি স্থাপন করেন। এই পরিবারের গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ কোম্পানির কানুনগো হিসাবে প্রভূত ধনসম্পদ আয় করেন। পরে কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা প্রয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি। মানে জমিদারদের জমিদারি থাকা না থাকা নির্ভর করতো তাঁর উপর। সেই পদের ক্ষমতাবলে আরও বিত্তবান হয়ে ওঠেন গঙ্গাগোবিন্দ। এমনকি নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র পর্যন্ত টাকা ধার করতেন তাঁর কাছে। বাংলায় থিয়েটারের প্রচার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন পাইকপাড়ার বাবুরা। তবে বাবুয়ানায় সকলকে ছাড়িয়ে যান বাবু ইন্দ্র চন্দ্র সিংহ। তাঁর গল্প পরে বলছি।
গঙ্গাগোবিন্দের নাতি – মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র, লালাবাবু। পথে একদিন শুনলেন যে কোনো রজকের কন্যা তার বাবাকে বলছে – “ওঠো বাবা বেলা যায়, বাসনায় আঁচ দেবে না ?” সেই শুনেই সম্পত্তি ত্যাগ করে সন্ন্যাস নিয়ে সংসার ত্যাগ করলেন। স্বামী সংসার ত্যাগ করে চলে গেলেন। কিন্তু জমিদারির দেখাশোনা তো করতে হবে, না হলে যে পথে বসতে হবে। এই অবস্থায় হাল ধরলেন রাণী কাত্যায়নী। একাধারে দক্ষ প্রশাসক ও ধর্মপ্রাণ নারী হিসাবে বাঙালির ইতিহাসে বিশেষ স্থান এই মহিলার।
এই পরিবারের আরেক বধূ রানী দেবেন্দ্রবালা – তিনিও জনহিতকর কাজে প্রচুর ব্যয় করেন। তাঁর স্মৃতিতেই গঙ্গাতীরের এই ঘাটের নাম রানী দেবেন্দ্রাবালা ঘাট। চিৎপুর নিয়ে শেষ লেখাটায় কাশীপুর গান ফ্যাক্টিরির ক্লক টাওয়ার পর্যন্ত দেখেছিলাম। বাকি রয়ে গিয়েছিল এই দেবেন্দ্রাবালা ঘাট। গান-শেল ছাড়িয়ে নদীর তীরে পৌঁছে ডান দিকে ঘুরে পেলাম – Strand Bank road. দক্ষিণ দিকে চলতে থাকি। রাস্তার দুদিকেই আবর্জনা বাছাই করা পরিবারগুলির বাস। কোথাও প্লাস্টিকের সিট তো কোথাও শিশি বোতল বাছাই হচ্ছে। কাজের সূত্রে রাজাবাজার খাল পাড়ে যে সব মানুষের সাথে পরিচয় হয়, তাদের মতোই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অপুষ্টি আর ন্যূনতম উন্নয়নের মধ্যে কোনোক্রমে বেঁচে থাকার চেনা ছবি। মাটি থেকে মুড়ি খুটে খায় ক্ষুধার্ত শিশু। শুধু উপসনালয়টিই টাইলস বসানো, বাইরে দেওয়ালে ওয়াল-পুট্টি।
কাশীপুরে ফেরি ঘাট পেরিয়ে পৌঁছে যাই রানী দেবেন্দ্রাবালা ঘাট। হেরিটেজ সাইট। স্থানীয় পৌর প্রতিনিধি, তার পাশের জায়গাটায় গড়ে তুলেছেন রানী দেবেন্দ্রবালা উদ্যান। সাধারণ দেখতে এই ঘাটের মধ্যে একটা জিনিস প্রথমনেই নজরে পরে। জলের ধার থেকে উপরের রাস্তা অবধি সোজা উঠে গেছে সমান্তরাল দুটি লোহার লাইন – ঠিক রেল লাইনের মতো। ভারী মাল তুলতে সাহায্য করতো এই লাইন। রতনবাবুর ঘাটের কাছে একটা গুদামে এমন লাইন দেখেছিলাম। পাটের গাঁট একবারে সোজা নৌকো থেকে উঠে যেত গুদামে এই লাইন ধরে, বুঝিয়েছিলেন সম্পত্তির পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত বর্তমান মালকিন। সেই কথা মনে পড়লো।
ঘাটের এক পাশে CESC-র পরিকাঠামো। অন্যদিকে ১১১ নর্মদেশ্বর শিবের মন্দির। পাঁচটা সারিতে ২২টা করে শিবলিঙ্গ সাজিয়ে রাখা আছে। একটি শিবলিঙ্গ আলাদা। শিবলিঙ্গের এই বিন্যাসটা বেশ নতুন মনে হলো। মন্দিরটা খুব পুরোনো নয়। পূজারী মিশিরজী কাজের ফাঁকে সুখ দুঃখের কথা বললেন। মন্দিরের কাজ করার জন্য সহায়তা করার মানুষ পাওয়া যায় না। এক হাতেই সব কাজ করতে হয়, দেশে যাওয়ার ফুরসৎ মেলে না। গঙ্গা মাইয়ার কোলেই গ্রামের বাড়ি উত্তরপ্রদেশে।
মন্দির থেকে বেরিয়ে একটু জিরিয়ে নিতে বসি কাশীপুরে ফেরি ঘাটে। একটা ভুটভুটি তীরে লাগে। কয়েকজন যাত্রী নামে, কয়েকজন ওঠে। নদীর জলে খুনসুটি করে বস্তির বাচ্ছারা। পরবর্তী গন্তব্যের দিকে ছেড়ে যায় নৌকো। আমিও উঠে পড়ি পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
অদৃশ্য হয়ে যেন আমার সাথে পথ চলেন – রাজা শরৎ চন্দ্র, রাজা ইন্দ্র চন্দ্র, রানী কাত্যায়নী। ফটোগ্রাফিতে শহরের অন্যতম পথিকৃৎ শরৎ চন্দ্র, ছিলেন দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার। পাইকপাড়া রাজবাড়ীর পুরোনো ছবিগুলি সম্ভবত তাঁরই তোলা। পরে পর্বে দেখবেন। পরবর্তী গন্তব্য যে গোপাল ঠাকুরবাড়ি, তার পরিমার্জন ও পরিবর্ধনও করেন তিনি।
তবে এঁদের কথা নয়। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল রাজা ইন্দ্র চন্দ্রের কথা। সেই গল্পটা দিয়েই আজ শেষ করি। বাবুদের মধ্যে বাবু রাজা ইন্দ্র চন্দ্র। তাঁর কানে কিছু সমস্যা ছিল – নিয়মিত কান সাফ করতে হতো। এই কান পরিষ্কার করার জন্য আলাদা দক্ষ পরামানিক নিয়োগ হয়ে গেল। এবার বাবুর খেয়াল হলো যে যতক্ষণ কান পরিষ্কার করা হয়, সেই সময়টা কি ভাবে সদ্বব্যবহার করা যায়। কানের মধ্যে যদি কান খুশকি দিয়ে রাগ রাগিণীর গৎ বাজানো যায়, তাহলে সময়টা বেশ ভালো কাটে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। খোঁজ করে পশ্চিম থেকে জোগাড় হলো তেমন কারিগর। কালে দিনে সেই শিল্প শিখেও নিলেন এখানকার কয়েকজন। গল্পটা পেলাম পানিহাটির যতীন্দ্রমোহন দত্তের কাছে। নিজেকে যম দত্ত বলে পরিচয় করানো লেখক জানাচ্ছেন যে, তাঁরও একবার ইচ্ছে হলো কানে গৎ শোনার। তেমন এক হুনুরিকে পাকড়াও করলেন। শুনলেন কানের মধ্যে দুটো গৎ। এবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন – “তা, বাপুহে রাগ রাগিনী ছাড়া অন্য কিছু বাজাতে পারো ?”
– যেমন?
– এই ধরো ‘বন্দেমাতরম’
– আজ্ঞে বাবু সেটা কি রকম? আমাকে শোনালে চেষ্টা করতে পারি।
যম দত্ত রেকর্ডে শুনিয়ে দিলেন বন্দেমাতরম। বার দুয়েক শোনার পর শিল্পী হুবহু সুর বাজিয়ে দিলেন দত্তবাবুর কানে। কান খুশকি দিয়ে !!

চিৎপুর পর্ব শেষ হলো।

23275428_10207768986101180_7529551735350789989_o

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s