সমরাস্ত্র নির্মাণ ঐতিহ্যের দুই শতক : কাশীপুরের গান এন্ড শেল ফ্যাক্টরি

শ্যামবাজার থেকে বিটি রোডের বাস ধরে চিড়িয়া মোড়ে নামলাম।   সোজা পশ্চিম দিকের রাস্তাটাই খগেন চ্যাটার্জি রোড – আজকের গন্তব্য।

সিমেন্টে বোঝাই লরি গা ঘেসে চলে যায়। ভাঙা রাস্তার গর্তে পড়ে লাফিয়ে ওঠে লরিটা। সিমেন্টের ধুলোয় ঝাপসা হয়ে যায় চারদিক। ধুলোর ঝড়ের মধ্যে দিয়েই দেখা যায় চিৎপুর ইয়ার্ডের রেল লাইন। জানা গল্প। তবু মনে মনে আরো একবার ঝালিয়ে নিতে নিতে পথ হেঁটে যাই। হুগলি নদীর জলীয় বাষ্প আর ঘিরে থাকা গরান গেঁও সুন্দরী গাছের ঘন জঙ্গলের অস্পষ্টতায় ইতিহাস আর লোকগাঁথা মিলে মিশে তৈরী হয় শহরের প্রাচীনতম দিনগুলির আলেখ্য।

শহর পত্তন হওয়ার অনেক আগে থেকেই কালীঘাটের কালী ক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এই শ্বাপদ সংকুল পথ। মুর্শিদাবাদ থেকে কালীঘাট যাওয়ার এই পথ দিয়েই চলেছে পুণ্যার্থীদের সারি। এমনই কোনো অঘ্রায়ণের বিকেল। একটু পরেই আলো মরে আসবে। যাত্রীরা পা চালায়। তবু শেষ রক্ষা হয় না। ঝোঁপের আড়াল থেকে স্পষ্ট শোনা যায় – হা রে রে রে। লুঠতরাজ, নরবলি, রক্তপিপাসু দেবী – কিছু বাস্তব আর বাকিটা কল্পনা দিয়ে মানুষ তৈরী করে রোমাঞ্চকর এই উপাখ্যান। সেই চিতে ডাকাতের উপাস্য দেবীই চিত্তেশ্বরী। সেই থেকেই জায়গার নাম চিৎপুর।

ধুলো মাখা পথের দুই ধারে সারি সারি গুদামঘর বিশাল অজগরের মতো শুয়ে। রেল থেকে মাল উঠে গোডাউনে ঢোকে আবার সেখান থেকে বেরিয়ে পাড়ি দেয় নিজস্ব গন্তব্যের দিকে। ছোট ভ্যানে করে এক গুদামে মাল নিয়ে যাচ্ছিলেন প্রৌঢ়। ভারী ভ্যান ঠেলছে আরেকজন। ঘামে লেপ্টে গেছে পরনের আধ ময়লা গেঞ্জি।

কাউকে জিজ্ঞেস না করলেও সোজা পশ্চিম দিকে হেঁটে গেলে চোখে পড়বে কাশিপুর গান শেল ফ্যাক্টরির গেট আর লাগোয়া ঘড়ি মিনার। তার আগেই অবশ্য নজরে পড়বে সময়ের অগ্রগতির চিহ্ন হিসাবে জনসাধারণের কাছে ০.৩২ “অশনি” পিস্তল বিক্রির বড় বোর্ড।

ঊনবিংশ শতকের শুরু। উপমহাদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য বিস্তারের কৌশল হিসাবে প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গায় শুরু হচ্ছে নতুন নতুন যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে নিয়ন্ত্রক শক্তি আগেয়াস্ত্র। ফোর্ট উইলিয়ামে তৈরী নতুন কামানের জন্য চাই ক্যারেজ – চাকা লাগানো শকট। সাবেক কলকাতার কাছে বড় পাইকারি কাঠের বাজার ছিল চিৎপুরে। ফোর্ট উইলিয়াম থেকে কামান এনে তার ক্যারেজ তৈরীর জন্য এই জায়গাটা পছন্দ হয়েছিল কোম্পানির কর্তাদের। এখানেই ১৮০১ সালে নির্মাণ শুরু হলো গান ক্যারেজ এজেন্সির। মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস-এর ক্যাপ্টেন প্রেস্ট্রোন দায়িত্ব নিয়ে খাড়া করেছিলেন প্রথম ফ্যাক্টরি শেড।  মূল শেডটি ছিল টালির আর বাকি সব নির্মাণ দর্মা আর চট দিয়ে তৈরি ।  প্রথম দিকে কারখানার যন্ত্র চালাতো বলদ আর মোষ। কাঠের তৈরি প্রথম কামান শকট  উৎপাদন শুরু হয় ১৮ই মার্চ ১৮০২ সালে।

তারপর ১৮৩০ নাগাদ পিতল ও লোহার কামান ঢালাই হওয়া শুরু হলো। কারখানার নাম বদলে হলো গান ফাউন্ড্রি। একটা পথ নির্দেশ এখনো মনে করিয়ে দেয় সেই কথা। গঙ্গার ঘাট থেকে বি টি রোড পর্যন্ত পুব-পশ্চিমে টানা রাস্তাটার সাবেক নাম ছিল গান ফাউন্ড্রি রোড। ১৮৭২ সালে কামানের গোলার জন্যে নতুন ধরণের লম্বা খোল (শেল) উৎপাদনের প্রয়োজন দেখা দেওয়ায় সেই কাজও শুরু হলো এখানে।  সঙ্গে সঙ্গে  নতুন নাম হলো প্রতিষ্ঠানের – “ফাউন্ড্রি  এন্ড শেল ফ্যাক্টরি”। এর পর সমরাস্ত্র প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন ধরণের হরেক নানা প্রোডাক্ট যোগ হয়েছে কারখানার উৎপাদন সূচিতে।  আর তার সঙ্গে ক্রমে আরও বড় জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে বর্তমানে উৎপাদনশীল উপমহাদেশের প্রাচীনতম অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি।১৮৯২ সালে  আধুনিক ভারতে প্রথম স্টিল কাস্টিং শুরু হয় কাশীপুরে এই কারখানায়। এই ভাবে ধীরে ধীরে ক্রমে রূপ নিলো আজকের গান এন্ড শেল ফ্যাক্টরি, কাশীপুর।

আমার হঠাৎ মনে হলো যে এই কর্মযজ্ঞে এদেশীয়দের কতটা অংশদান ছিল?  Public  domain-এ উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী কাশীপুর কারখানার কয়েকজন কর্মচারীর বেতন তালিকা পাওয়া যায় The Bengal Directory, (Calcutta 1872)-র পৃষ্ঠায়।

কারখানার সুপারিন্টেন্ডেন্ট মিঃ এইচ. এইচ. ম্যাক্সেল।  তাঁর মাসিক বেতন ১৮২৭ টাকা। ফোরম্যান  আর.জে. আর্থার-এর মাইনে মাসিক ৫০০ টাকা।  এদেশীয়দের মধ্যে সর্বাধিক বেতন দেখলাম পার্বতীচরণ চ্যাটার্জীর।  উনি ক্লার্ক পদে ছিলেন, মাইনে ১০০ টাকা।  আরও দুজন ক্লার্কের নাম পেলাম – দীননাথ দত্ত এবং রাজনারায়ণ চক্রবর্তী।  তবে তাঁদের মাইনে যথাক্রমে ৫০ ও ৩০ টাকা।  রাধাকিষেন শেঠ ছিলেন ক্যাশিয়ার ও টাইমকিপার; তাঁর বেতন ৬০ টাকা।

বেতম কাঠামোর ব্যাপারটা ছাড়াও আরো একটা বিষয় খেয়াল করার। বলা হয় যে চীনারাই বারুদ তৈরীর কৌশলকে পোক্ত ফর্মুলার রূপ দেন। তারপর মঙ্গোলদের অভিযানের মধ্যে দিয়ে এই ফর্মুলা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। তবে এই সূত্রে একটা মজার তথ্যের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়ের ক্লাসিক ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’– র প্রাককথন পর্বে উনি জানিয়েছে যে পর্তুগিজদের আগে ভারতে আগ্নেয়াস্ত্রের প্রচলন ছিলো না বলে যারা মনে করে, তাদের ধারণা ভুল। “বাবর নামা-য় উল্লেখ আছে যে বাঙালিরা আগ্নেয়াস্ত্র চালনায় নিপুন ছিল।  এই কারখানাতেও নিশ্চয়ই অনেক বাঙালি বিশেষ করে যারা কামারশালায়  টেকনিক্যাল কাজ জানতেন তাঁরা কাজ করতেন। তাঁদের কথা কি কোথাও বিশেষ ভাবে নথিভুক্ত হলো? যদি না হয়ে থাকে, তবে এও কি নিজেদের ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার আরেক উদাহরণ?  জানি না।  হয়তো তাই।

কারখানার ঘড়ি মিনারটি কলকাতা কর্পোরেশনের হেরিটেজ তালিকা ভুক্ত। কিন্তু আরও অনেক ঐতিহ্যের মতো তার অবস্থাও সঙ্গিন। অচল ঘড়ি, গায়ে গজানো বটগাছ আর মিনারের উপর নিঃশব্দ ঘন্টাটা মনে করিয়ে দেয় অতীত গৌরব। বাড়ি ফিরে নেট ঘাঁটছিলাম এই ক্লক টাওয়ারের উপর তথ্যের জন্য। নজরে পড়লো গান শেল কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত টেন্ডার। আনুমানিক আট লক্ষ টাকার অর্থ মূল্যের এই টেন্ডার বেরিয়েছে – ঘড়ি মিনার সারাই করার জন্য। আশা জাগে, ভবিষ্যতেই আবার সচল হবে মিনারের ঘড়ি। বেজে উঠবে উপরে রাখা ঘন্টাটা। পথচলতি মানুষকে আবার মনে করবে এই ধুলোমাখা পথের অতীত।

মূল তথ্য সূত্র : অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি সংগঠন সমূহের অভ্যন্তরীণ নিউজলেটার ২০১৫

ছবি : : http://www.gsf.gov.in/index.php?id=1&pid=1

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s