ইলিশ ও কাল্পনিক বিস্মৃতিচারণা

ilish5 copy

কত বেলা হলো ঘরের ভেতর থেকে ঠিক ঠাহর করতে পারেন না বৃদ্ধা। কাল বিকেল থেকেই সেই যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে এখনো নাগাড়ে চলছে। মাঝে বোধহয় বেশি রাতের দিকে একবার থেমেছিল তখন কিছুক্ষণ ব্যাঙের ডাক শুনেছিলেন বলে মনে হলো। নাকি সেটাও বিভ্রম। আজকাল মাঝে মাঝেই সময় কালের রেললাইনটি সরল রেখায় চলে না। যেন সব সময় একটা জংশন স্টেশনে যাতায়াত। আপ ডাউন কারশেড – সব একাকার।

নাঃ, সত্যিই বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। কখনো জোরে, কখনো ঝিরি ঝিরি। চায়ের জল চাপিয়ে বারান্দা থেকে আধভেজা খবরের কাগজটা তুলে নিয়ে চোখ বোলান। আর পাঁচটা খবরের সঙ্গে বাজারে ইলিশ ওঠার ছবি। বেশ কিলো দেড়েক বা আরও একটু বেশি ওজনের ইলিশ কিনছেন এক মহিলা। মাছ বাজারের ভেজা কলাপাতার উপর সাদা বরফে সাজানো জলের রুপোলি শস্য। জংশন স্টেশনে শোনা যায় সেই আদ্দিকালের কয়লার ইঞ্জিনের কুউউউউউ ঝিক ঝিক !!

ভাই বোনেদের খাওয়া প্রায় শেষ। দুপুর আর নেই। হাঁক শোনা যায় – “তুমরা উঠিয়ে না রে গো !” মেজদা দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরছেন। কর্মসহায়কের মাথায় ঝুড়িতে বেশ কয়েক খানা ইলিশ। কি তার শানদার রূপ – কি তার স্বাদ ! শামশেরনগর স্টেশন থেকে ট্রেন থামিয়ে কেনা। ভাই বোনেরা বসে থাকে পাতে। সেই ইলিশ কাটা হয়, ধোয়া হয়, ভাজা হয়। আরো এক থালা করে ভাত খায় তারা ইলিশের তেল আর ভাজা দিয়ে। বাবা না থাকার কথা এই ভাবেই মাঝে মাঝে ভুলে যায় সব থেকে ছোট বোনটি। ভোঁ বাজিয়ে ট্রেন চলে যায়।

চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া ওঠে। সেই ধোয়াঁয় ট্রেন ঢোকে দমদম জংশনে। তখন ভাড়ার এক কামরার নিজের সংসার। সঙ্গী বেশ খানিকটা অনাটনও। তার মধ্যেই লোক লৌকিকতা। আবার এক বর্ষায় বাড়িতে অতিথি। বিলেতবাসী আত্মীয়। ছুট্টে বাজার থেকে নিয়ে আসা ইলিশের দৌলতে মান রক্ষা হয় সেদিন। চালকুমড়া দিয়ে ইলিশের মুড়োর ঝোলটার কথা আজ মনে পড়ে। কত সামান্য জিনিসে আগেকার মানুষের মন খুশি হতো। তবে তত দিনে গঙ্গা আর পদ্মার ইলিশের স্বাদের তফাৎটা বোঝা হয়ে গিয়েছিলো।

বরিশালের এক মাসিমার বাড়িতেও ভাড়া থাকার সূত্রেই সুদীর্ঘ সম্পর্ক। সরস্বতী এবং বিজয়া দশমীর দিন জোড়া ইলিশের পুজো। ধান-দূর্বা, তেল-সিঁদুর মাখিয়ে বরণ করে নতুন শাড়ি পরিয়ে জোড়া ইলিশের পুজো। আশ্বিন থেকে মাঘ – এই সময়টা ইলিশ খাওয়া বন্ধ। সামাজিক নিয়মের মধ্যে প্রজাতি সংরক্ষণের তত্ব। কত গভীর অর্থ। পুজোর পর ইলিশ দিয়ে ভোগ। সেই ভোগ রান্নায় মাসিমার সহায়ক হয়ে রান্নার খোলতাই হওয়া।

কত রকমের রান্না করতেন। সর্ষে বাটার ঝাল, পাতুরি, দই ইলিশ। ইলিশের মুড়ো দিয়ে কচু শাক। এছাড়াও দেশি রান্না – কাঁচাকলা দিয়ে কালোজিরে পাতলা ঝোল। শুকনো লঙ্কা পোড়া ফোড়ন দিয়ে গোবিন্দভোগ চাল ধোয়া জল দিয়ে ইলিশের ঝোল।

শুধু কি রান্না ? খাওয়াও ! পাশের বাড়ির পালবাবুর নাতনির অন্নপ্রাশনে ইলিশ হয়েছিল। পাশের বাড়ি হিসাবে খেতে বসেছেন শেষ ব্যাচে। সব খাওয়ার শেষে পরে আছে অনেকগুলি লেজের টুকরো। কেউ খেতে চায় না। এতো কাটা। সানন্দে একুশ টুকরো ইলিশের লেজ সেদিন খেয়েছিলেন। তবে সে সব ছোট ছোট টুকরো। মাছের সাইজ আর মানুষের মন – দুটোই পাল্লা দিয়ে ছোট হয়েছে ততদিনে।

তারপরেও ইলিশ ঘিরে কত স্মৃতি। কত স্বপ্ন। ছেলেটাকে হাতে করে মাছ কিনতে শেখানো। কুয়ো পাড়ে বসে মাছ কাটার সঙ্গে পাড়ার বেড়ালদের কোরাস রাগিণীর সঙ্গত। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টিতে সেও আরেক সুর জীবনের। গৃহস্থের উপর ভরসা করেই তো তাদের জীবনধারণ। পায়ের কাছে বেড়ালটা ডেকে ওঠে। বৃষ্টিতে কোথাও যাচ্ছে না। ক’বছর হয়েছে বাড়িতে ইলিশ আসে না ? সেই চার পাঁচশ গ্রাম ওজনের মাছ খাওয়ার রুচি হয় না। আর এতো দাম এখন বড় মাছের।

বেড়ালটা আবার পায়ের কাছে মুখ ঘষে। ধীরে ধীরে ওঠেন বৃদ্ধা। কি মনে করে ছাতাটা বের করেন। মাছের ব্যাগ আর অসময়ের প্রয়োজনের জন্য জমানো কটা টাকা নিয়ে রাস্তায় নামেন। জল বইছে রাস্তার উপর দিয়ে। আর তার উপর দিয়ে বয়ে চলে এক আদরের নৌকো।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s