আফগান যুদ্ধ স্মারক – দমদম

 

বাবা কাজ করতেন অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টিরিতে। দমদমে। এমন জায়গায় কাজ করতেন, যে বাবার অফিস কেমন দেখতে, সেটা দেখতে যাওয়ার যাওয়ার সুযোগ হয়নি কোনোদিন। অফিসটা যে ছিল High Security Zone। তবে অনেকবার এমন হয়েছে যে অফিসের পর কোথাও যাওয়ার আছে; আমি আর মা অফিসের সামনে অপেক্ষা করেছি। সাড়ে পাঁচটার সময় ছুটির ভোঁ বাজলেই পিলপিল করে অন্য শ্রমিক কর্মচারীদের সঙ্গে বেরিয়ে এসেছে বাবা। তারপর একসঙ্গে রওয়ানা দিয়েছে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। সেই সময় বাইরে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত নকশা করা গেটটাই শুধু নজরে পড়তো। আর একটু ডানদিকে উঁকি দিতো একটা মনুমেন্ট। এয়ারপোর্টের কাছে বলে, দমদমে তখন তিনতলার বেশি উঁচু বাড়ির নকশা অনুমোদন করা হতো না । মনুমেন্টটা তাই আরও উঁচু মনে হতো।

সাধারণ ঔৎসুক্য ছিল – কিসের মনুমেন্ট প্রশ্ন করেছি। পেয়েছি সংক্ষিপ্ত উত্তর। যুদ্ধে নিহতদের স্মৃতি চিহ্ন। কোন যুদ্ধ ? ইঙ্গ – আফগান যুদ্ধ, যে যুদ্ধে অনেক সাহেব মারা গিয়েছিল যে । আমি ভাবতাম বোধহয় ওই মনুমেন্টের মাথা থেকেই ছুটির ভোঁ বাজে সেই মৃত সাহেবদের জন্য, (ছোটদের কত যে উদ্ভট খেয়াল) – যা ছড়িয়ে যেত সেই সময়ের ফাঁকা ফাঁকা দমদমের কোনায় কোনায়।

শহরের আরেকপ্রান্তে ছিল হেড অফিস। বাবুঘাটের সামনে। বাবু রাজচন্দ্র দাসের তৈরী ও নামাঙ্কিত রাস্তা, যা পরে লর্ড অকল্যান্ডের নামে নতুন করে নাম কর হয় – সেই রাস্তার এক কোনায় ছিল অফিসটি। অফিসের ঠিকানা ছিল ১০নং অকল্যান্ড প্লেস।

গুলি বারুদ তৈরির কারখানা যেন জুড়ে দিল দমদমের ওই মনুমেন্ট আর অকল্যান্ড সাহেবকে। অনেকের একটু হেঁয়ালি লাগতে পারে। খুলে বলি তাহলে।

উনিশ শতকের প্রথম ভাগ। ভারতের উপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখল ততদিনে বেশ পাকাপোক্ত হয়ে গেছে। পাঞ্জাবের সিংহ রঞ্জিত সিংয়ের মতো কয়েকটা সমস্যা যে নেই, তা নয়। তবে সাম্রাজ্য মোটামুটি নিষ্কন্টক। এর মধ্যে ঈশান কোনে মেঘ হিসাবে দেখা দিল মধ্যে এশিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব বাড়ানোর উদ্যোগ । রাশিয়ার সম্রাট প্রথম নিকোলাস ইউরোপের স্থিতাবস্থা বজায় রাখতেই চেয়েছিলেন। কিন্তু সাহেবরা সেটা বুঝতে ভুল করলো। সমস্যা আরও ঘোরালো হয়ে উঠলো যখন রঞ্জিত সিং আফগান আমির দোস্ত মোহাম্মদের দ্বিতীয় রাজধানী পেশোয়ার সমেত বেশ এলাকা জমি অধিকার করে নেওয়ায় । দোস্ত মোহাম্মদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহায্য চাইলেন। কিন্তু আধুনিক রণসজ্জায় সজ্জিত শক্তিশালী দল খালসা-র সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চাইছিলেন না কোম্পানির কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে লর্ড অকল্যান্ড। দোস্ত মোহাম্মদ তখন কোম্পানিকে কিছুটা ভয় দেখাতেই রাশিয়ার দূতকে আহ্বান করলেন সভায়। এই নতুন ঘটনাক্রমে লর্ড অকল্যান্ড অত্যন্ত অপমানজনক ভাষায় আমিরকে চিঠি লিখে রাশিয়ার সঙ্গে কোনো ধরণের সম্পর্ক স্থাপনে নিষেধ করলেন। আমির গেলেন খেপে। কোম্পানির প্রতিনিধিদলকে বহিস্কার করলেন রাজসভা থেকে।

ব্রিটিশদের মনে রাশিয়ার ভারত আক্রমণের ভয় আরও দৃঢ় হলো যখন রাশিয়ার সঙ্গে আমিরের আলোচনা ভেঙে পড়লো ১৮৩৮ সালে। ওদিকে রাশিয়ার সমর্থনে কাজার উপজাতীয়রা হেরাত শহর অবরোধ করলো। অকল্যান্ড ভাবলেন আর দেরি করা ঠিক হবে না। উপজাতিদের তাড়িয়ে ও দোস্ত মোহাম্মদ-কে সরিয়ে নিজের পছন্দের লোক ও পূর্বতন শাসক শাহ সুজা দুরানীকে মসনদের বসিয়ে তিনি আফগান সীমান্ত নিষ্কন্টক করতে চাইলেন। যদিও স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে দুরানীর ভাবমূর্তি খুব একটা ভালো ছিল না।

১৮৩৮ সালের ডিসেম্বর মাসে স্যার জন কীন-এর নেতৃত্বে ২০,০০০ ব্রিটিশ সেনা আফগানিস্তান অভিযানে চললো। কিন্তু এর মধ্যে উপজাতীয়রা তাদের অবরোধ তুলে নিয়েছে ও প্রথম নিকোলাস তার দূতকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন আফগান সভা থেকে। পরে ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা বলেছেন যে সেই অর্থে এই অভিযানের কোনো প্রয়োজন ছিল না। তবু সাম্রাজ্যবাদের হাল্লাকে কে যুদ্ধে যেতেই হয়। যুদ্ধ না থাকলে হাল্লা বাঁচে কি করে ?

এই আফগান যুদ্ধ-কে সাহেবরা ভেবেছিলেন মাখনের মধ্যে দিয়ে ছুরি চালানোর মতো সহজ হবে। ব্যাপারটা বোঝা যায় তাদের লোক লস্করের বহর দেখে। একেক জন জুনিয়ার অফিসার ৪০ জন পর্যন্ত কাজের লোক ও দুই উট ভর্তি সিগারেট নিয়ে রওনা হলেন অভিযানে। সঙ্গে ছিল শিকারি কুকুরের দল, খানিকটা শিকার খেলে সময় কাটানোর জন্য।

এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের খেসারত দিলো পুরো অভিযান। মোটামুটি পুরো সৈন্যদল-টাই এই যুদ্ধে খোয়াতে হলো ব্রিটিশদের। হাতে গোনা কয়েকজন ফিরতে পেরেছিল অকল্যান্ডের এই ভয়ঙ্কর আক্কেল-সেলামির গল্প শোনাতে।

প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধের শিক্ষা নিয়ে ফিরে এসেছিল ইংরেজরা। খানিকটা সফল রূপায়ণ হয়েছিল অকল্যান্ডের পরিকল্পনা। এই অভিজ্ঞতার ফলে তারা বুঝতে পেরেছিল যে ভারতে শাসন কায়েম রাখতে হলে তাদের গোলাবারুদের ভাড়ার বাড়াতে হবে। তার পরেই তৈরী হলো দমদমের এই ammunition কারখানা, ১৮৪৬ সালে। ভারতে ব্রিটিশদের প্রথম গোলাবারুদ তৈরির আস্তানা। এই কারখানার পাশেই একটা কম্পাউন্ডে তৈরি হয় আফগান ওয়ার মেমোরিয়াল। ওই যুদ্ধে তাদের হারানো সাথিদের স্মৃতিতে দমদমের স্মৃতিস্তভ, যা আজও দাঁড়িয়ে আছেই Auckland’s Folly-র সাক্ষী হয়ে।

তবে এই সৌধ নির্মাণের সময় সাহেবদের অবশ্য মনে পড়েনি সেই ৩৮০০০ অসামরিক ভারতীয় ধোপা, নাপিত, মোটবাহক, রাঁধুনি, সাফাইকর্মী, ইত্যাদির কথা যারা এই অভিযানের অংশ হয়ে আফগানিস্তানের গিরিখাতে হারিয়ে গেলো চিরতরে। যারা হয়তো শুধুমাত্র একটু বাড়তি রোজগারের জন্য নাম লিখিয়েছিলেন এই অভিযানে। সেই ভয়ঙ্কর মৃত্যর কিছু বিবরণ খুঁজে পাবেন উইলিয়াম ডালরিম্পেল লেখায়।

এই কারখানা সম্পর্কে কয়েকটা তথ্য দিয়ে শেষ করি। কুখ্যাত দমদম বুলেট এই কারখানার দান, যা ১৮৯৬ সালের হেগ কনভেনশন অনুযায়ী বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৮৬৯ সালে গোলাবারুদ তৈরির প্রক্রিয়া সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় দমদম থেকে পুনায়। অস্ত্র পরীক্ষার ব্যবস্থাও চলে যায় বালাসোর। তারপর থেকে শুধু ম্যাগজিন তৈরি হয় এখানে। সেই থেকে কারখানা সংলগ্ন কর্মীদের অবস্থলটির নামও ‘ম্যাগজিন কোয়ার্টার’।

(কলকাতা ও সন্নিহিত অঞ্চলের ঐতিহ্যশালী স্মারক নিয়ে গ্রুপের এই সপ্তাহের কর্মসূচির সমর্থনে এই পোস্ট )

তথ্য সূত্র:
Return of a King by Dalrymple William
অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি নিউজ-লেটার

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s