দমদম – নাগেরবাজার – কয়েকটি স্থাননামের উৎস-২

আজ দমদম রোডের কিছু ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ জায়গার আলোচনা। আরও কিছু জায়গা বাদ গেল, যার সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য হাতে পাইনি।  আর কিছু নির্দিষ্ট জায়গা আছে, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় গল্প (যেমন ১ নং দমদম রোড) – সেগুলি আলাদা করে লিখবো। সঙ্গে থাকার জন্য অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই। স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে চর্চা আরও বাড়ুক আপনাদের সহযোগিতায়।
#গরুহাটা আগের পর্বেই বলেছি যে একসময় নাগেরবাজার অঞ্চলের নাম ছিল গাজীর তালুক এবং মুসলমানরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। মনে হয় সেই জন্যই এখানে একটি গরুর হাট বসতো – যার থেকে জায়গার নাম হয়েছে গরুহাটা। হাট বন্ধ হয়ে গেলেও জায়গার নামটি রয়ে গেছে।

#তেলিপুকুর: দুই ভাবে যাওয়া যায় বাজারের ভেতর দিয়ে অথবা যশোর রোডের দিকে থেকে আনন্দমোহন বসু রোড দিয়ে। এখন যেখানে পুজো হয় তার পাশেই যে পুকুরটি আছে, সেটি অত্যন্ত প্রাচীন। এখানে কোনো এক মল্লিকদের বাগানবাড়ি ছিল যার সঙ্গে ছিল এই পুকুর। মল্লিকরা জাতিতে ছিলেন তেলি। সেই থেকেই নাম তেলিপুকুর।
এই সূত্রে বলে রাখি যে এই রাস্তার নাম পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান – ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম Wranger, শিক্ষাব্রতী, ব্রাহ্ম নেতা আনন্দমোহন বসু-র নামে।

#দেবীনিবাস : উকিল রাধিকাপ্রসাদ সান্যালের যে বাগান বাড়ি ছিল, তার এক পাশে উনি দেবী বগলার একটি মন্দির বানিয়েছিলেন। সেই মন্দির থেকেই পাড়ার নাম দেবীনিবাস ও রাস্তার নাম দেবীনিবাস রোড।

#মতিঝিল : এই এলাকা এক সময় ছিল মুর্শিদাবাদের নসিপুরের জমিদার রাজা ছত্রপত সিংহের বাগান বাড়ি। তাই মুর্শিদাবাদের মতিঝিলের অনুকরণে নাম হয় জায়গাটির। এই বাগান বাড়ির তিন দিকে ছিল পরিখা। ছত্রপত সিংহের ছেলে চেতনারায়ণ এখানেই থাকতেন। এক সময় চেতনারায়ণ মতিঝিল ছেড়ে সিউড়ি চলে যান। বাগানবাড়ি বিক্রি হয়ে হয়ে যায় ডি.সি. পারেখ নামে একজন অবাঙালি ব্যবসায়ীর কাছে। তিনি আবার বিক্রি করে দেন কলকাতার করুণা কিশোরে করগুপ্ত-কে। ১৯৩৩-৩৪ সাল নাগাদ সমবায়ের মাধ্যমে করুণাকান্ত কর নতুন জনবসতি গড়ে তোলেন মতিঝিলে। বাংলায় , সমবায় পদ্ধতিতে জনবসতি গড়ে তোলার অন্যতম প্রথম নজির এই মতিঝিল।
সেই সময়ই মতিঝিল স্কুল স্থাপিত হয়। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা-রা ছিলেন :করুণা কিশোরে করগুপ্ত, ডাঃ সুরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, ডঃ বিনোদবিহারী দত্ত, বিজয় কুমার সেন, ডাঃ নিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়।
আরও একটি মত আছে মতিঝিল নামের উৎস হিসাবে। হরিপদ ভৌমিক মনে করেন যে লবন হ্রদের উৎপত্তির পর সম্ভবতঃ দমদমের নদী শুকিয়ে গিয়ে ঝিলে পরিণত হয়। ওই ঝিলের গর্ভে শুক্তি পাওয়া যেত বলেই নাম মতিঝিল।

#মহেন্দ্র কলোনি : বর্তমান মতিঝিল গার্লস স্কুল থেকে অধুনালুপ্ত ফায়ার ব্রিগেড স্টেশন পর্যন্ত এলাকাটি ছিল গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের মালিক মহেন্দ্র দত্তের বাগানবাড়ি – নাম মহেন্দ্র কানন। তাঁর আগে বার্মা মুলুকের জনৈক রত্ন ব্যবসায়ী টিমুল সাহেবের সম্পত্তি ছিল ওই বাগান।
১৯৬০-এর দশকে গরুহাটা অঞ্চলে এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের পর এখানে ফায়ার ব্রিগেড স্থাপিত হয়। এর আগে ফায়ার ব্রিগেড ছিল নরসিংহ এভিনিউয়ের উত্তর প্রান্তে – রামগড়ে। মহেন্দ্র কাননে ফায়ার ব্রিগেড হওয়ার পরেও প্রচুর গাছ ছিল – বিশেষ করে কাঁঠাল চাঁপার গাছগুলোর কথা মনে পড়ে। আর মনে পড়ে ফায়ার ব্রিগেডের সরস্বতী পুজোর কথা। এতো বড় ঠাকুর দমদমের কোনো সরস্বতী পুজোয় হতো না সেই সময়। সরস্বতী পুজোর দিন ধীরেন্দ্র স্মৃতি সাধারণ পাঠাগারে আবৃত্তি আর ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা হতো। সেই প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ পর্ব শেষ হলে, ফায়ার ব্রিগেডের সরস্বতী ঠাকুর আর উল্টো দিকে মতিঝিল কলেজে ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন অফ দমদমের ছবির প্রদর্শনী দেখতে যেতাম। আমি ৭০-এর দশকের কথা বলছি। এখন মহেন্দ্র কাননে ফ্ল্যাট বাড়ি উঠছে।

#প্রাইভেট রোড : হ্যাঁ আদপে এটি পাবলিক রোড ছিল না। ছিল একটি ব্রড গেজ রেল লাইন। ক্যান্টনমেন্ট থেকে এই রেল লাইনের সংযোগ ছিল চিৎপুর ইয়ার্ডের সঙ্গে। এই লাইন ধরে আসতো সেনাবাহিনীর রসদ। সেই স্মৃতি নিয়ে এখনও আছে ওয়ারলেসের মাঠ। ক্যান্টনমেন্ট থেকে এই লাইন শুরু হয়ে বর্তমান সুরের মাঠ ছাড়িয়ে গ্রিন পার্কের পাশ দিয়ে যশোর রোড উঠে ডান দিকে বেঁকে যেত। তারপর প্রথম পাতিপুকুর রেল ব্রিজ থেকে লাইন চলে যেত চিৎপুর ইয়ার্ড।

#বাগজোলা : প্রাচীন সময় থেকেই দমদমের বাণিজ্য ও পরিবহনের ক্ষেত্রে বাগজোলা খালের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। আড়িয়াদহে গঙ্গার সমতট থেকে শুরু হয়ে বরাহনগরের পাশ দিয়ে সিঁথি হয়ে কালিন্দীর মধ্যে দিয়ে কৃষ্ণপুর মৌজার যাত্রাগাছির ঘুনি বিলে পৌঁছে নিজের যাত্রাপথ শেষ করে কুলটি নদীতে পড়েছে এই খাল। সম্ভবত এই খালটি একটি স্বাভাবিক নদী খাড়ি ছিল – যার মধ্যে জোয়ার ভাটা খেলত।
যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল এই খাল। এখানকার স্থানীয় জেলেদের পদবি ছিল বাগ। তাই তাদের অধিকারভুক্ত জলাগুলি বাগজোলা নামে পরিচিত হতে থাকে।
বাগজোলা নামকরণের আরেকটি উৎস বলেছিলেন দমদমের বিশিষ্ট শিক্ষক, পরিবেশ ও রাজনীতিবিদ মিহির সেনগুপ্ত। উনি বলেছিলেন যে সুপ্রাচীন কালে এই এলাকা ছিল জঙ্গল আর হোগলা বনে পরিপূর্ন। তার মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি থাকা খুব স্বাভাবিক। তাই নাম বাঘজেলা – যার থেকে এসেছে বাগজোলা।
এক সময় এই খালের ধারে মেলাবাগানে বিশাল চালের মেলা বসতো যেখানে কলকাতার সৌখিন বাবুরা পছন্দসই চাল কিনতে ভিড় জমাতেন। দক্ষিণ বঙ্গের সেরা চাল নৌকা বেয়ে আসতো এই চালের মেলায়।

#ঘুঘুডাঙ্গা : হরিপদ ভৌমিক মনে করেন যে সুন্দরবনের ভাষায় ছোট ডিঙি নৌকাকে বলে হয় “ঘুঘু ডিঙা”। খালে এই ধরণের যে সব নৌকা চলতো, তার থেকেই ঘুঘুডাঙ্গা নাম হয়েছে।
অন্যদিকে ভুপেশ প্রামানিক মনে করেন যে “ঘুঘু” পদবীধারী জনগোষ্ঠীর বাস ছিলে এখানে। সেই থেকেই ঘুঘুডাঙ্গা নাম।
অনির্বাণ পত্রিকা গোষ্ঠী থেকে অবশ্য ঘুঘু পাখির চারণভূমির জন্য ঘুঘুডাঙ্গা নাম হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

#বেদিয়াপাড়া : প্রাচীন দমদমের অধিবাসী বেদিয়াদের পরিচয় বহন করে চলেছে বেদিয়াপাড়া নামটি।

#বীরপাড়া / #পাইকপাড়া : সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের গৌরহরি মজুমদার দমদমে কাছারি স্থাপন করার সময় থেকেই দিল্লির বাদশার নিযুক্ত সামরিক বাহিনীর বীর জোয়ানরা থাকতেন যে অঞ্চলে, তাঁর নাম বীরপাড়া। অন্যদিকে বাদশাহী ফৌজের সাধারণ সেনা বা পাইকদের থাকার জায়গায় নাম পাইকপাড়া।

#সেভেন ট্যাংকস : সাত পুকুর থেকে নাম হয়েছে সেভেন থ্যাঙ্কস। সাত পুকুরের আদি মালিক ছিলেন পাথুরিয়াঘাটার হরিমোহন ঠাকুরের পুত্র নন্দলাল (উমানন্দন) ঠাকুর। বয়স হয়ে যাওয়ায়, নন্দলাল ঠাকুরের মাতৃদেবী ছেলের কাছে বৃন্দাবন দর্শনের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সেই সময় এই ধরণের যাত্রা অত্যন্ত বিপদসংকুল হওয়ায় নন্দলাল মায়ের জন্য বৃন্দাবনের একটি রেপ্লিকা বানিয়ে দেওয়ার কথা ভাবলেন। বৃন্দাবনের মতো জলাশয়, বাগান নিয়ে তৈরি হলো নকল বৃন্দাবন। একসময় এই সম্পত্তি মার্বেল প্ল্যালেস প্রতিষ্ঠাতা রাজেন্দ্রলাল মল্লিকের শ্বশুর রূপলাল মল্লিক কিনে নেন। রাসবিহারী মল্লিকের “বংশ গৌরব” বলছে এই সম্পত্তির মালিক ছিলেন রূপলালের পুত্র শ্যামাচরণ মল্লিক, যাকে “Rothschild of the Metropolis” বলা হতো।
সেভেন ট্যাঙ্কস-এর ল্যান্ডমার্ক যে সাত থামওয়ালা কাশীপুর ক্লাব, সেটিও তৈরি নন্দলাল ঠাকুরের আমলে। – এখানে বিশপ হেবারকে আপ্যায়ণ করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে কাশীপুর গান এন্ড শেল ফ্যাক্টরি স্থাপনের পর ক্লাব হাউসটি আধিকারিকদের ক্লাব হিসাবে ব্যবহারের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়। সেই ক্লাব হাউস আজও রয়েছে নিজের গর্বিত উপস্থিতি নিয়ে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তত্বাবধানে প্রায় নতুনের মতো অবস্থায়।

#চিড়িয়া মোড় : পোস্তা রাজপরিবারের রাজা বৈদ্যনাথ রায়ের ছিল পশু পাখির নেশা। তাঁর সিঁথির বাগান বাড়িতে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন অনেক ধরণের পশু ও পাখি। সেই জন্য লোকে এই জায়গাটিকে চিড়িয়াখানার মোড় বলতো। তার থেকেই চিড়িয়া মোড়।

কাশিপুর ক্লাবের ছবিটিও নেট থেকে নেওয়া আমার তোলা নয়

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s