দমদম – নাগেরবাজার – কয়েকটি স্থাননামের উৎস

দমদমের ইতিহাস সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায়, তা থেকে এই এলাকার সঙ্গে গঙ্গারিডি সভ্যতার আদি যোগাযোগের একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়, বিশেষ করে ক্লাইভ হাউসের ঢিপির নিচে প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রীর নিরিখে। এছাড়া নবাবী আমলের অনেক যোগসূত্র এখনো ছড়িয়ে আছে দমদমের বিভিন্ন এলাকার নামে এবং সম্ভবত নাগেরবাজার মসজিদটি ও মীরজাফরের বাড়ি বলে পরিচিত অধুনালুপ্ত ইমারতিটির মাধ্যমে। এরপর ক্লাইভ ও বেঙ্গল আর্টিলারির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে দমদমের ইতিহাস। ব্রিটিশ দমদমে শুরু হয় শিল্প বিপ্লবের গল্প। অবশ্য তার সঙ্গে সঙ্গেই তৈরী হতে শুরু করে দমদম এলাকার বিখ্যাত বাগানবাড়িগুলি গড়ে ওঠা – আরেক ইতিহাসের আরে উজ্জ্বল অথচ বিস্মৃত অধ্যায়। তারপর দেশভাগ, উদ্বাস্তু কলোনি স্থাপন , জনসংখ্যা বিস্তার ও কারখানাগুলোর পঞ্চত্ব প্রাপ্তির দুর্ভাগ্যজনক পর্যায় – যা শুধুই বেদনাই জাগায়।

১৭৮৩ থেকে ১৮৫৩ পর্যন্ত দমদম ছিল বেঙ্গল আর্টিলারির সদর দপ্তর। পরে সেটি মিরাটে স্থানান্তরিত হয়। ১৮৬১ – ১৮৯৩ সময়ের মধ্যে দমদম ছিল ২৪ পরগনা জেলার একটি মহকুমা। ১৮৯৩ সালে দমদম ও ব্যারাকপুর মহকুমা তুলে দেওয়া হয় ১৯০৪ সালে আলিপুর সদর ও বারাসাত মহকুমার কিছু অংশ নিয়ে ব্যারাকপুর মহকুমা তৈরী হয়। এখনো সেই ব্যারাকপুর মহকুমার-ই অংশ দমদম।

দমদম নামের উৎস নিয়ে আগেই একাধিকবার লিখেছি। তাই সেটা নিয়ে আর লিখলাম না।

এই তথ্যের ভিত্তিতে আসুন দমদমের কয়েকটা স্থাননামের উৎস খোঁজা যাক। প্রথম পর্বে যশোর রোডের কয়েকটি জায়গার নাম।

#নাগেরবাজার : অনেক আগে, এই এলাকার নাম ছিল গাজীর তালুক। এলাকার জমিদার ছিল জনৈক গাজী সাহেব। ওনার কাছ থেকে বসিরহাট অঞ্চলের আরবেলিয়া গ্রামের জমিদার নন্দনাথ নাগ কিছু অংশ কিনে (অন্য মতে লিজ) নিয়ে একটি বাজার ও কাছারি স্থাপন করেন। নাগেদের বাজার থেকেই নাগেরবাজার নামটি এসেছে।

পরবর্তী কালে কাটোয়ার বদ্যিপুর গ্রামের দীনবন্ধু নন্দী চৌধুরী গাজী সাহেবের কাছ থেকে ছ’ আনা অংশ কেনেন। তাঁর কাছারি বাড়ি ছিল বর্তমান ৩ নং শ্যামনগর রোডে। বাকি দশ আনা অংশ কেনেন খুলনার ডাঃ জগবন্ধু বোস। পরে তিনি আর সেই অংশ বিক্রি করে দেন খুলনার-ই মৃগেন বসুকে। বসুদের কাছারিবাড়ি ছিল বর্তমান গোরক্ষবাসী রোডে।

প্রথমদিকে নাগের বাজার বসতো প্রতিদিন, শুধু বিকেলে। মাছ মাংস পাওয়া যেত না। গোরাবাজারে সপ্তাহে দুদিন হাট বসতো। এছাড়া শীলদের একটা হাট বসতো বর্তমান বারোয়ারি তলার পেছনে।

ষাটগাছি মৌজার অন্তর্গত নাগেরবাজারের প্রাচীন নাম ছিল কামারডাঙ্গা। সেই নামটি এখনো দেখতে পাবেন নাগেরবাজার মোড়ে যে পুলিশ ফাঁড়ি আছে, তার গায়ে লেখা। সেটি ‘কামারডাঙ্গা আউট পোস্ট’ নামেই পরিচিত। দমদম নিয়ে গবেষণা পত্রিকা ‘দেশকাল’ -এর একটি সংখ্যায় দেখতে পাচ্ছি যে, এই দমদম সেন্ট্রাল জেল তৈরী হওয়ার আগে থেকেই এই ফাঁড়ি ছিল। শুধু তাই নয়, এর সঙ্গে ছিল একটি জেলখানাও। সঙ্গে পোস্ট মর্টেমের ব্যবস্থা।

ধীরেন্দ্র স্মৃতি সাধারণ পাঠাগার : আমার নিজের ছোটবেলার অনেক ব্যাক্তিগত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই সংস্থাটির সঙ্গে। তাই এখানে উল্লেখ করলাম। পাঠাগারটি পৌরসভার ডাক্তার ধীরেন্দ্রনাথ বসুর স্মৃতিতে তৈরী করেছিলেন এলাকার বাসিন্দারা।

#নার্সিং_এভিনিউ:   পোস্তা রাজ্ পরিবারের রাজা সুখময় রায়ের এক পুত্র, নার্সিং বা নরসিংহ চন্দ্রের নামে নাগেরবাজার মোড়ের নার্সিং এভিনিউয়ের নাম। ইনি রাজা বৈদ্যনাথের ভাই। রাজা বৈদ্যনাথ তার বাড়িতে চিড়িয়াখানা করেছিলেন, সেই থেকেই জায়গার নাম চিড়িয়া মোড়।

#কাজী_পাড়া : নবাবী আমলে কাজিউল কোজা অর্থাৎ মুখ্য কাজী (বিচারক) ছিল বাদশা নিযুক্ত একজন আধিকারিক। প্রধান কাজীর বাস্থানটি যেখানে ছিল – সেটি ক্রমে কাজীপাড়া হিসাবে খ্যাতি পায়। এই গল্পটি পুরো বুঝতে গেলে জানতে হবে রাজধানী দমদমের গল্প – সেটা নিয়ে পরে এক সময় বলা যাবে।

#বাবুতলা : কথাটি বাবু কে তালাও (পুকুর) থেকে এসেছে। এখানে বাবু বলতে নাগ বাবুদের কথা বলা হয়েছে।

#ষাটগাছি : প্রখ্যাত গবেষক হরিপদ ভৌমিক লিখেছে – এই এলাকায় কোনো এক গাছেরতলায় শাড়েশ্বরী দেবীর মন্দির ছিল। সেই মন্দিরকে শাড়গাছির মন্দির বলা হতো। সেই থেকেই অপভ্রংশ হয়ে সম্ভবত ষাটগাছি হয়েছে। অন্য মতে এখানে ষাটটি গাছের বাগান ছিল, সেই থেকে ষাটগাছি।

#অমরপল্লী : এখানে অমর দাস নামে একজন এটর্নির বাগান বাড়ি ছিল। পরবর্তীকালে জনবসতি গড়ে ওটার পর, তার নামেই জায়গার নাম হয় অমরপল্লী। এই জায়গা সম্পর্কে আরও একটি তথ্য খুব ইন্টারেস্টিং। দমদমের পৌর প্রশাসন স্থাপনের একদম প্রথম আমলে এর নাম ছিল বাগজোলা পৌরসভা। আর তার অফিস ছিল বর্তমান রামেশ্বর বিদ্যামন্দির যেখানে আছে, ঠিক সেখানেই।

#দেবেন্দ্র কলোনি : জনবসতি গড়ে ওঠার আগে এটি ছিল কার্তিক মল্লিকের পিতা – দেবেন্দ্র মল্লিকের বাগানবাড়ি।

#শ্যামনগর : হরিপদ ভৌমিক লিখেছেন – সাবর্ণ রায়চৌধুরী জমিদার গৌরহরি রায়চৌধুরী এই এলাকায় একটি কাছারি স্থাপন করেন। আর সেই কাছারির সুরক্ষার জন্য কাছারির সামনে তৈরী করেন একটি গড়। সেই সামনের গড় থেকেই “শ্যাম নগর” .

এই নিয়ে অবশ্য আমার একটা নিজস্ব মত আছে। সেটাও নিবেদন করি। যদি গৌরহরি রায়চৌধুরীর সূত্রেই জায়গার নাম হয়, তবে খেয়াল রাখতে হবে যে ওনাদের কুলদেবতা ছিলেন “শ্যামরায়” সেই থেকে শ্যামনগর নামটা আসার সম্ভাবনা কিন্তু থাকতে পারে।

#বাঙুর / ভাঙ্গর : হরিপদ বাবুর সূত্র থেকেই জানতে পারছি যে রায়চৌধুরীদের সেই গড় একসময় ভেঙে পড়ে আর তার থেকেই জায়গার নাম হয় – ভাঙ্গর। অবশ্য অধ্যাপিকা শেফালী রায় মনে করেন যে ভাঙ্গর নয় – নামটি বাঙুর – যার থেকে বাঙুর এভিনিউ। এই নাম এসেছে বাঙুর ব্রাদার্স থেকে যারা ওই এলাকায় জলাজমি কিনে বসতি স্থাপনের উদ্যোগ নেন।

#কালিদহ / কালিন্দী : নামিটি মনসা মঙ্গলে আছে – তবে মঙ্গলকাব্যে উল্লিখিত এই জায়গাটি বোধহয় নয়। যাইহোক – কলকাতা সন্নিহিত যে পঞ্চান্নটি গ্রামের নাম আমরা ব্রিটিশ আমলের নথিপত্রে পাচ্ছে, তার মধ্যে একটি ছিল এই কালিদহ।

আজ যশোর রোডের যে কয়টি জায়গার হাল হদিশ পেয়েছি , তার বিবরণ দিলাম। পরের পর্বে দমদম রোডের কিছু জায়গার কথা লিখব। তারপর বাগুইআটি, গোপালপুর, রাজারহাট পাতিপুকুর নিয়ে আলাদা লেখার ইচ্ছে আছে ।

এর সঙ্গে আপনারা যদি নতুন তথ্য যোগ করতে পারেন – তাহলে খুব ভালো হয়।

পৌলোমী সামন্ত সংযোজন করেছেন :

#ক্ষুদিরাম কলোনি : বর্তমান শ্রীঅরবিন্দ বিদ্যামন্দির স্কুলটি ছিল ইউসুফ মিয়াঁ নামে একজন মুসলমান ভূস্বামীর বাগানবাড়ি। মূল স্থাপত্যটি ঠিক রেখেছে বাড়িটি সংস্কার করে স্কুল হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। আর বাগান অংশটিতে গড়ে উঠেছে ক্ষুদিরাম কলোনি। বাগানবাড়ির লাগোয়া পুকুরটিও আছে। এখন সেটি ছোটদের সাঁতার অনুশীলন কেন্দ্র।

———————————————————————–

দমদম নিয়ে এই সিরিজের এটি প্রথম লেখা। দ্বিতীয় লেখাটি পড়তে হলে নিচের লিংকে ক্লিক করুন::

https://www.facebook.com/groups/1675834865971345/permalink/2216691665218993/

————————————————————————

(ছবি : নাগেরবাজার মসজিদ )

(কৃতজ্ঞতা স্বীকার : দেশকাল ও শ্যামল ঘোষ )

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s