আধুনিক পানিহাটির রূপকার ত্রাণনাথ বন্দোপাথ্যায়

পানিহাটির গল্প মানেই সেখানকার গঙ্গার ঘাটগুলির গল্প। এর আগেও এই সিরিজে কয়েকটা ঘাটের গল্প বলেছি। আজও সেই ঘাট দিয়েই শুরু করি। গঙ্গার তীর বরাবর সোজা রাস্তা না থাকায় বারো মন্দির ঘাট থেকে উত্তর দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমি আর নীলোৎপল মহোৎসবতলার ঘাটে এসে পৌঁছলাম। এমা! গুগুল ম্যাপের হিসেবে মতো তো ত্রানবাবুর ঘাট বাদ চলে গেলো। একজন টোটো চালককে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলাম। তাই সেখান থেকে আবার উত্তর দিকে খানিকটা হেঁটেই পৌঁছুলাম ১৮৯৮ সালে ঘাট তৈরী ত্রানবাবুর ঘাট ও সংলগ্ন কালী মন্দিরে। পানিহাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য ।

আধুনিক পানিহাটির রূপকার বলা যায় ত্রানবাবু, অর্থাৎ ত্রাণনাথ বন্দোপাথ্যায়কে। ত্রানবাবুর গল্পটা ছাড়া পানিহাটির গল্প কি করে বলা যায়। তবে ত্রানবাবুর প্রসঙ্গে আসার আগে পানিহাটির আরও কিছু পুরোনো কথা জানতে হবে।

দেগঙ্গা – বেঁড়াচাঁপার চন্দ্রকেতুগড়ের কথা তো সকলেই জানেন। যেখানে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে। স্থানীয় ঐতিহাসিক অজিত কুমার ঘোষ জানিয়েছেন যে সেই চন্দ্রকেতুগড়ের পরাক্রান্ত রাজা চন্দ্রকেতু বেঁড়াচাঁপা থেকে পানিহাটি পর্যন্ত একটি খাল কাটিয়েছিলেন, মূলত জলপথ পরিবহনের জন্য। তা ছাড়াও চন্দ্রকেতুগড় থেকে পানিহাটি পর্যন্ত একটি রাস্তাও বানিয়েছিলেন। পানিহাটিতে রায়দের ঝিল থেকে শুরু করে সোদপুর স্টেশন রোড, মুড়াগাছা, সাজিরহাট সহ নানা জলাভূমির মধ্যে বিক্ষিপ্ত ভাবে এখনো টিকে আছে সেই খালের অবশেষে।

তিনি একটি গড় বা কেল্লাও তৈরি করেন এই পানিহাটিতে। আর সেই গড়ে মন্দির স্থাপন করে প্রতিষ্টা করেন তার আরাধ্য দেবী ভবানীর মূর্তি। সেই থেকে জায়গাটির নাম গড় ভবানী। গড় ভবানী নামে একটি ঘাটও আছে বর্তমনে মহোৎসবতলার একটু উত্তরে। তবে এই দেবী ভবানীর মূর্তি পানিহাটিতে প্রতিষ্ঠা নিয়ে আরেকটি মতও আছে। অনেকে বলেন যে যবন আক্রমণে চন্দ্রকেতুর রাজ্য ধ্বংস হওয়ার সময় এক ব্রহ্মচারী রাজার দেবী বিগ্রহ নিয়ে গোপনে পানিহাটিতে পালিয়ে আসেন। সেখানে উপযুক্ত পঞ্চমুন্ডীর আসনে আবার দেবী মূর্তি স্থাপন করেন। ব্রহ্মচারীরা শিষ্য পরম্পরায় এই দেবী মূর্তির পূজা করতে থাকেন। তারপর শেষ ব্রহ্মচারী ত্রানবাবুর বাবা নসিরাম বন্দোপাধ্যায়ের হাতে পুজোর ভার দিয়ে দেহ রাখেন। নসিবাবুর পর ত্রানবাবু সেই পুজোর ব্যবস্থা পাকা করতে বিশাল পঞ্চরত্ন মন্দির তৈরী করেন ।

সেখানেই আজও পুজো হয় দেবী ভবানীর। আমরা যখন পৌঁছুলাম মন্দিরের সামনে তখন পুজো চলছে। নীলোৎপল বিগ্রহটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো – “মুখের আকৃতি দেখে অনেক পুরোনো মূর্তি মনে হয়। নবীন ভাস্করের স্টাইল থেকে আলাদা। খেয়াল করো।”

প্রশস্ত চাতাল সংলগ্ন দক্ষিণমুখী মন্দিরের একদিকে বয়ে চলেছে গঙ্গা আর অন্যদিকে তিনটি শিবমন্দির, যার মধ্যে প্রতিষ্টিত শিবলিঙ্গ। দুটি শিবলিঙ্গ কষ্টিপাথরের। তৃতীয় শিবলিঙ্গটি অন্যরকম। গৌরীপট্ট শ্বেতপাথরের আর লিঙ্গভাগ কষ্টিপাথরের। দেখে একটু আশ্চর্য হলাম। রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য নন্দরাম সেন প্রতিষ্টিত বিখ্যাত রামেশ্বর শিব মন্দিরের পিঠাধ্যাক্ষ শ্রী তাপস দত্তের স্মরণ নিলাম। পাঁচ মিনিটে রিটার্ন মেসেজ এলো। উনি ব্যাখ্যা করে দিলেন যে একসঙ্গে শিবশক্তি রূপের উপস্থাপন হয়েছে এই শিবলিঙ্গের মাধ্যমে। বিষয়টা বেশ অভিনব মনে হলো।

ত্রানবাবুর মন্দিরের দক্ষিণ সীমানা থেকেই শুরু হয়েছে রবীন্দ্র স্মৃতি বিজড়িত সেই বিখ্যাত পেনেটীর বাগানবাড়ি। এই বাগানবাড়ি নিয়ে অন্য একদিন বলবো। এবার বরং ত্রাণনাথ বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক, যার জীবন কোনো রূপকথার থেকে কম নয়। আক্ষরিক অর্থে rags to riches-এর জীবন্ত উদাহরণ এই ভদ্রলোক। মাত্র ন’বছর বয়সে বাবাকে হারান । তারপর সংসার চালানোর জন্য একটি চিনির আড়তে কাজ শুরু করেন। এর কিছুদিন পর কাশীপুরের একটি চটকলে কাজ করতে থাকেন। এর পরের চাকরিৱ্যালি ব্রাদার্সের একটি সহযোগী সংস্থায় । ক্রমে প্রমোশন পেয়ে এই সংস্থায় বড়বাবু বা হেডক্লার্ক পদে বসেন। সংসারে একটু সচ্ছলতা দেখা দেয়। এই সময় এক সাহেবের পরামর্শে জুট কন্ট্রাক্ট নিতে শুরু করেন আর এই ব্যবসায় তার ভাগ্যের চাকা সম্পূর্ণ ঘুরে যায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিশাল অর্থ ও প্রতিপত্তি ঘরে ওঠে ত্রানবাবুর। ১৯০০ সালে পানিহাটি পৌরসভা স্থাপিত হওয়ার পর তিনি হন সেখানকার প্রথম নির্বাচিত পৌরপ্রধান। তাঁর উদ্যোগেই শুরু হয় পানিহাটির আধুনিকীকরণ।

শুধু স্নানঘাট বা মন্দির নয়, পানিহাটির শিক্ষাবিস্তারেও তাঁর ভূমিকা স্মরণীয়। ১৮৯৬ সালে ছেলেদের ইংরজি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন করেন তিনি। গঙ্গার তীরে এই স্কুলের পরিবেশ ও শিক্ষার মান এমন ছিল যে বড় লাট লর্ড লিটন পর্যন্ত স্কুল পরিদর্শনে এসে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। ত্রানবাবু মারা যাওয়ার পরেও এই উন্নয়নের ধারা থেকে থাকেনি। এই স্কুলের পরিচালন পর্ষদের সদস্যদের বদান্যতায় সকালে ওই স্কুলেই শুরু হলো মেয়েদের পঠনপাঠন। পরে স্কুলের উদ্বৃত্ত জমিতে গড়ে উঠলো মেয়েদের আলাদা স্কুল, যে স্কুল চত্বরে রোকেয়ার সাখাওয়াতের সমাধি খোঁজ পাওয়া গেল অনেক পর।

পানিহাটি পৌরসভার শতবর্ষ উপলক্ষে ত্রাণনাথ স্কুলের পাশে আর সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের ঠিক সামনে বসানো হয়েছে ত্রানবাবুর মূর্তি। মন্দির আর ঘাট ছাড়াও এলাকার পৌর পরিষেবা উন্নয়নে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল ত্রানবাবুর নেতৃত্বাধীন পুর বোর্ড। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পানিহাটি নিকাশি ব্যবস্থা ও শ্মশানের উন্নতি।

একটা শ্মশানের গল্প বলে শেষ করি এই পর্ব। সেই অর্থে পানিহাটির গল্প নয়, তবে পাশের সাউথ ব্যারাকপুর পৌরসভার। সেই পৌরসভা, যেখানে ডাঃ বিধান রায়ের ভোটে দাঁড়ানোর হাতে খড়ি। ব্রিটিশ আমল। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা পরিদর্শনে আসতেন নিয়মিত। রেজিস্টার খুঁটিয়ে দেখতেন। গোলমাল পেলেই বেশ ভালো ঝামেলা শুরু হতো। তেমনি এক ভিজিট এসে প্রেন্টিস সাহেব দেখলেন যে শ্মশানে যে পরিমান কাঠ বিক্রি হচ্ছে, সেই তুলনায় রেজিস্টার অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা কম। সাহেব বিরূপ মন্তব্য করায় পৌরসভার কর্তৃপক্ষ একজনকে শ্মশানের ডেথ রেজিস্ট্রার নিয়োগ করলেন।

গঙ্গার ধার বরাবর অনেকগুলি বৈষ্ণব আখড়া আছে, তেমন এক আখড়ার মাধব দাস বাবাজি পায়ে গুরুতর আঘাত পেলেন। এক চৈত্র মাসের শেষ দিকে পা ফুলে উঠলো। হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার বললেন যে পায়ে গ্যাংরিন হয়েছে, পা কেটে বাদ দিতে হবে। পা বাদ দেওয়া হলো। তবে বাবাজির ইচ্ছা অনুযায়ী ভাগাড়ে না ফেলে সেই পা অগ্নিসংস্কার করতে শ্মশানে পৌঁছলো। শুধু পা এসেছে দাহ সংস্কারে, পুরো বডি নয়। খাতায় কি ভাবে এন্ট্রি করা যায়? রেজিস্ট্রার ভদ্রলোক নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে খাতায় লিখলেন – “মাধবদাস বাবাজি – অর্ধেক। বয়স ৫৭।” এর কয়েক দিন পর নববর্ষ। তার পরের দিন বাবাজী মারা গেলেন। এবার দেহ এলো শ্মশানে। রেজিস্টারে লেখা হলো “”মাধবদাস বাবাজি – বাকি অর্ধেক। বয়স ৫৮। (নববর্ষ হেতু বয়স এক বৎসর বাড়িয়ে গিয়াছে)” !!!

সেই এন্ট্রি দেখে সাহেবের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, সেটা অবশ্য জানা যায়নি !!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s