আমাদের শীতঘুম ও গোরস্থানের দুই প্রাচীন বাসিন্দা

লোয়ার সার্কুলার রোড গোরস্থান / উইলিয়াম কোটস ব্লেকার

লোয়ার সার্কুলার সেমেট্রি তে ঢুকতে গেলেই প্রথমে নাম নথিভুক্ত করতে হয়। তার পরেই কর্তব্যরত কর্মী শুনিয়ে দেন ক্যামেরা নিয়ে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞার কথা। সেইসব মিটিয়ে বেশির ভাগ দর্শনার্থী চলে যান ডান দিকে মাইকেল মধুসূদন ও হেনরিয়েটার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে। এর পর খুঁজে নেন দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ বা বেথুন সাহেবের সমাধি। ইতস্তত চোখে পড়ে আরো কিছু চেনা মানুষের সমাধি। আর তার সঙ্গে নজর এড়ায় না ভুলে যাওয়া মানুষের শেষ পরিণীতি হিসাবে অবহেলায় পড়ে থাকা অনেক সমাধির ভাঙাচোরা জীর্ণ দশা।

এলোমেলো হাঁটতে থাকি সমাধিগুলির মাঝের পথ ধরে। ভাঙা ওবিলিস্ক, স্মৃতিস্তম্ভের মাঝে চোখে পড়ে খরগোশ আর কাঠবিড়ালির মূর্তি সমেত ছোট্ট মেয়ের কবরের ভগ্নাবশেষ। মনে হয় এক্ষুনি ওয়ান্ডারল্যান্ড থেকে ফিরে আসবে অ্যালিস! কিন্তু আসে না। বরং ডানাভাঙা পরীর কান্না শোনা যায় শীতের ঝরা পাতার উপর দিয়ে বয়ে চলা শুকনো বাতাসের শব্দে ।

এভাবেই ঘুরতে ঘুরতেই চোখ আটকে যায় ক্লাসিক্যাল স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি একটি সমাধিতে। আর পাঁচটা সমাধির থেকে কৌলিন্য ও মর্যাদায় বেশ কয়েকধাপ এগিয়ে এই স্থাপত্য নিদর্শন। উৎসুক হয়ে ফলকের নামটা পড়ার চেষ্টা করি। বেলে পাথরের ফলকে পড়া যায় খোদাই করা কয়েকটা কথা। উইলিয়াম কোটস ব্লেকার। তার সঙ্গে পড়তে পারি আরও কয়েকটা শব্দ – suppress dacoities, Hooghly, Nuddea, Jessore …. মাথার মধ্যে পাগলা ঘন্টি বাজতে থাকে – কোথায় যেন শুনেছি এই নামটা …. উইলিয়াম ব্লেকার…. উইলিয়াম ব্লেকার। তাহলে কি কোনো পুলিশের কর্তা ? পুলিশ কথাটা মনে হতেই চোখের সামনে চিচিং ফাঁক ! আরে এর কথাই তো বলেছিলাম জোফানির লাস্ট সাপার সম্পর্কে লিখতে গিয়ে !! সেন্ট জন্’স চার্চে জোফানির সেই আঁকায় সেন্ট জন হিসাবে যে নারীসুলভ প্রতিকৃত এঁকেছিলেন শিল্পী, তা তো এই পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট ব্লেকারকেই মডেল করে !!! ভদ্রলোক যে মহিলার ছদ্মবেশ ধরে চোর বদমায়েশদের পাকড়াও করতেন !

সেন্ট জন’স চার্চে যার ছবি, তাঁর কবর যে এখানে, সেটা বুঝতে পেরেই আরও খুঁটিয়ে পড়তে থাকি ব্লেকারের স্মৃতি ফলক। পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে তাঁর কৃতিত্বের কথা শেষ করেই লেখা হয়েছে, স্যার উইলিয়াম জোনসের বিশেষ বন্ধু , ভাষাবিদ ব্লেকারের কথা। সাহেব এশিয়াটিক সোসাইটির সভ্য ছিলেন। পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট থাকার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের মুখ্য অনুবাদকারীও ছিলেন প্রায় ৬০ বছর ধরে। কালিকা পুরাণের “রুধিরাধ্যায়” বা বলি সংক্রান্ত করণগুলি নিয়ে যে অধ্যায়, সেটির অনুবাদে ব্লেকারের কীর্তি অক্ষয় হয়ে আছে। আন্দাজ করা যায় যে আইন শৃঙ্খলার জন্য প্রয়োজনীয় মনে করেই হয়তো এই অধ্যায়টি অনুবাদ করেন। আবার এটাও বলা যায় যে এই অনুবাদের জন্যই হয়তো রক্তলোলুপ হিসাবে শাক্ত উপাসনার খানিক বদনাম হয়।

ব্লেকার নিজে যেমন ছদ্মবেশ ধারণ করতেন, তেমনি নদীয়া হুগলি যশোরের বিস্তীর্ন এলাকায় সংগঠিত ডাকাতি রোধ করার জন্য আজকের ভাষায় যাদের বলে ‘সোর্স’, তাঁদের নিয়োগ করার সংগঠিত পদক্ষেপ নেওয়া হয় তাঁর আমলেই। খেয়াল রাখতে হবে যে সেটা কোম্পানির আমল। ফৌজদারি বিধিগুলি সবে নির্দিষ্ট আকার নিচ্ছে। সেই সময় এমন ব্যবস্থা করার জন্য সোর্সদের নিজের পকেট থেকেই পারিশ্রমিক দিতেন ব্লেকার। হাতে না হাতে ফলও পেলেন। ডাকাতদের মধ্যে থেকে সোর্স নিয়োগের ফলে, অল্প দিনের মধ্যে ডাকাতির সমস্যা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলো। মজার কথা এই যে, সেই সময় এই সব সোর্সদের আরবি ‘গোয়েন্দা’ নামে ডাকা হতো। আজকে যে আমরা গোয়েন্দা শব্দটিকে সত্যান্বেষি অর্থে ব্যবহার করি, তখন সেরকম ছিল না।

ব্লেকারের জীবন নিয়ে খানিক খোঁজ নিয়ে দেখলাম যে, তাঁর জন্ম ১৭৫৯ সালে। (তারিখটা নিয়ে সন্দেহ আছে ) শান্তিপুরের কোনো কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন তাঁর পিতা। মা সম্পর্কে কোনো খোঁজ পাইনি। হতে পারে এদেশীয় মহিলা ছিলেন। অন্য অনেক ছেলের মতো তাঁকে বিলেতে পড়াশোনার জন্য পাঠানো হয়। সেখান থেকে তিনি ফিরে আসেন ১৭৭৭ সালে। ইস্ট ইনডিয়া কোম্পানির বিভিন্ন চাকরি করতে করতে শুরুর দিকে জাস্টিস অফ পিস্ (শান্তিরক্ষক) এবং পরে ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে থিতু হন।

আইন রক্ষার কাজেও নানা রকম অভ্যন্তরীন সমস্যায় পড়েছেন ব্লেকার। এতো সাফল্য সত্বেও, শুনতে অদ্ভুত লাগবে, যে (বেশ ভালো পারিশ্রমিক পাওয়া সত্বেও) তিনি কোম্পানি বাহাদুরের নিয়মিত কর্মচারী ছিলেন না। যে সূত্রগুলো থেকে তথ্য পেয়েছি, সেখানে কোথাও পরিষ্কার করে বলা নেই, তবে একটা আভাস যেন পাওয়া যায় অ্যাঙ্গলো ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে খাঁটি ইউরোপিয়ান কর্মচারীদের ক্ষমতার সংঘাতের। এছাড়াও, ব্লেকার ছিলেন শ্রীরামপুরের মিশনারিদের চক্ষুশূল । ধর্মান্তকরণের চেষ্টার একনিষ্ঠ বিরোধী ছিলেন ব্লেকার এবং নিজের এক্তিয়ারে এ ধরণের কাজকর্ম রোখার চেষ্টা করতেন। এদেশীয়দের প্রতি তাঁর সহানুভূতিশীল মনোভাবের কথাও লেখা আছে ব্লেকারের সমাধি ফলকে। ব্লেকার মারা যান ১৮৫৫ সালে আর তাঁকে সমাধিস্থ করা হয় এই লোয়ার সার্কুলার সিমেট্রিতে।

বাড়ি ফিরে আবার তথ্য ঘাটলাম। ঘাঁটতে গিয়ে – “পুলিশ”, “কোর্ট”, “অনুবাদক” শব্দগুলি ঘিরে আবার মাথার মধ্যে পাগলা ঘন্টি বাজতে থাকে। মাদ্রাজ থেকে ফেরার পর অসহায় আশ্রয়হীন মধুসূদনকে তো নিজের দমদমের বাগানবাড়িতে থাকতে দিয়েছিলেন কিশোরীচাঁদ মিত্র (প্যারীচাঁদ মিত্রের ভাই)। নিজে একজন পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন বলে পুলিশ কোর্টের অনুবাদকের চাকরিটা তাঁকে করিয়ে দিয়েছিলেন কিশোরীচাঁদ-ই। ব্লেকার মারা যান ১৮৫৫ তে আর ১৮৫৬ সালে মাদ্রাজ থেকে ফিরে কিশোরীচাঁদের আশ্রয়ে উঠলেন মধুসূদন। পুলিশ কোর্টে কাজ শুরু করলেন অনুবাদক হিসাবে। ওদিকে ব্লেকারের সমাধির থেকে কয়েক হাত দূরে এই কবরস্থানেরই অন্য প্রান্তে শান্তিতে শুয়ে আছেন মধুকবি। এই যোগসূত্রটা তো আগে খেয়াল হয়নি!

সত্তর বছর ধরে বিশ্বের ক্লাসিক সাহিত্যসম্ভারের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করাচ্ছেন প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন। সেই সিরিজের অন্তর্গত ‘দ্য পেঙ্গুইন ক্লাসিকস বুক’বেরিয়েছে এই কদিন আগে। ৪০০০ বছরের মানুষের সাহিত্য কৃতির মধ্যে ক্লাসিক হিসাবে বিবেচিত হওয়ার মতো সৃষ্টিগুলিকে পরিচয় দুমলাটে ধরে রাখার এক প্রয়াস। পাঁচশো জন লেখকের কাজ স্থান পেয়েছে এই ক্লাসিক বুকে। সেখানে ভারতের জন্য বরাদ্দ মাত্র একটি পাতা। শুধু রবীন্দ্রনাথের তিনটি বই নিয়ে আলোচনা। অনুযোগের উত্তরে সম্পাদক জানিয়েছেন “এ অভিমান সঙ্গত নিশ্চয়ই, কিন্তু দেশজ ভাষায় লেখা স্মরণীয় সাহিত্যের লোকপ্রিয় ইংরেজি অনুবাদ গোড়ায় আসা চাই দেশের মানুষের মধ্যে থেকেই, সে কাজটি কি ঘটছে ভারতে?” 
এই আক্ষেপ কি ছুঁয়ে যায় না সেমেট্রির দুই প্রবীণ অনুবাদক বাসিন্দাকেও ? হয়তো যায়। কিন্তু আমাদের চেতনা ফেরে কই !

#Willian_Coats_Blaquiere #Police_Magistrate #Translator  #Lower_Circular_Road_Cemetery  

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s