একটি ঘাটের কাহিনী: পানিহাটির হরিশ্চন্দ্র দত্ত রোড ও ঘাট

আলী হুসেন সোদপুর বিটি রোডের উপর পেট্রল পাম্পের সামনে দাঁড়াতে বলেছে। ঘোলা বাজারের কাছে আসতেই ফোন – ” দাদা, আরও ঘন্টা দুয়েক লাগবে। আপনি একটু বাদে আসুন।” একটু আগে ফোন করতে কি হয়েছিল ? টিটাগড়ে দু’টো ওয়ার্ডে জনস্বাস্থ্যের উপর সার্ভের কাজ হচ্ছে । আজ কাজ শেষ করে সার্ভে ফর্মগুলি দেওয়ার কথা। কাজ শেষ করতে পারেনি। তাই হাতে দু’ঘন্টা সময়।
**********************************
নদীপথে কোথাও যাওয়ার জন্য ঘাটে পৌঁছলেন দত্ত বাবু। কিন্তু নৌকো অবধি পৌঁছনোর আগেই চিৎকার চেঁচামেচি আর আর্তনাদ তাঁর মনযোগ আকর্ষণ করলো। ব্যাপারটা কি দেখার জন্য ঘুরে দাঁড়ালেন। এমন তো কতই হয়। কিন্তু ইনি অন্য ধাতুতে গড়া। সেইখানেই দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন যে এমন ঘাট বানিয়ে দেবেন যাতে অন্য কোনো গর্ভবতী মহিলা এই ভাবে নদীর ঘাটে না পড়ে যান। কাজের তোড়জোড় শুরু হলো, যোগাযোগ করা হলো প্রথম বাঙালি ইঞ্জিনিয়ার নীলমনি মিত্রের সাথে। তাঁর নকশা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী তৈরী হলো ঘাট। সুরম্য চাঁদনিটির পরিকল্পনা করে দিয়েছিলেন আরেক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার স্যার ব্র্যাডফোর্ড লেসলি।


অত্যন্ত বর্ধিষ্ণু এলাকা ছিল এই পানিহাটি, সুখচর। এখানকার জমিদার রায়চৌধুরীবাবুরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় সমগ্র বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে নাকি বর্ধমানের মাহারাজাধিরাজের পরেই সর্বোচ্চ খাজনা দিতেন। পানিহাটির গায়ে সুখচরে ছিল শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেবের কাছারিবাড়ি।


পানিহাটি আর সুখচরের সীমানা হরিশচন্দ্র দত্ত রোড। সোদপুর মোড়ে পিয়ারলেস নগর থেকে বিটি রোড ধরে শ’দুয়েক মিটার উত্তরে হাঁটলেই বাঁ দিকে রাস্তা। রাস্তার মুখেই চায়ের দোকানে জিজ্ঞেস করে জানলাম গঙ্গা ১০-১৫ মিনিটের হাঁটা পথ। 
– গঙ্গার ধারেই কি হরিশচন্দ্র ঘাট ? আবার প্রশ্ন করলাম দোকানদারকে 
– ঘাট তো আছে। আমরা বলি বারো মন্দির ঘাট। হরিশ- ফরিশ বলতে পারবো না।
কথা না বাড়িয়ে পা বাড়াই। রাস্তার বাঁ দিকের ঠিকানা পানিহাটি আর ডানদিকে সুখচর। এত পুরোনো এলাকা, কিন্তু খুব একটা বোঝার কোনো উপায় নেই। পর পর ফ্ল্যাট বাড়ি উঠে গেছে। আরও উঠছে। গলিগুলোর ভেতরে নজর করলেই এখনো হোগলা ঘেরা পুরোনো পুকুর দেখা যায়। কলমী-লতা আর পানায় সবুজ হয়ে আছে। পরিবর্তনের দিশারী নতুন ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। কম্পিউটার সেন্টারও আছে। স্থায়ী দুর্গামূর্তি সহ একটা নতুন দূর্গা মণ্ডপ হয়েছে। দেখতে দেখতে এগিয়ে যাই। মোটামোটি সোজা রাস্তা। রাস্তাটা শেষ হয় ঘাটে গিয়ে। তবু শেষ হয় না। একটা গলির মতো চেহারা নিয়ে বেঁকে যায় দক্ষিণ দিকে, ওদিকেই পানিহাটির বিখ্যাত দ্রষ্টব্যগুলি।


গেট পেরিয়ে ঢুকে যাই প্রশস্ত চাতালে। চাতালের ওদিকে ঘাটের চাঁদনী দেখা যায়। চাতালকে মাঝখানে রেখে দুদিকে ছ’টি করে শিব মন্দির। তার থেকেই নাম বারো শিব মন্দির।

হাটখোলার দত্তরা কলকাতার আদি বাসিন্দাদের মধ্যে পড়েন। এই বংশের বিখ্যাত মানুষ মদনমোহন দত্ত। মদনমোহন দত্ত-র নাতি তনু দত্ত ছিলেন সেকালের বাবুদেরও বাবু । তনুবাবু নিয়মিত ব্রাহ্মণ ভোজন করাতেন। একবার খেয়াল হলো যে এই ব্রাহ্মণদের মধ্যে কে কত ভাগ্যবান সেটা পরীক্ষা করবেন। আমন্ত্রিত ব্রাহ্মণরা যখন খেতে বসলেন, তখন তাঁদের শাক চচ্চড়ির মধ্যে রুপোর সিকি-দু আনি আর সিকি মোহর মিশিয়ে দিলেন। যার পাতে যেমন পড়লো, সেই মতো তার দক্ষিণা !! এক বৃদ্ধের পাতে পড়লো চারটে সিকি মোহর। বাবু তাঁকে বিশেষ ভাগ্যবান মনে করে বিশ বিঘে জমি আর এক জোড়া শাল দিয়েছিলেন !!


তনু বাবুর গল্প শেষ হওয়ার নয়। আমরা বরং যেখানে শুরু করেছিলাম, সেখানেই ফিরে যাই। হরিশচন্দ্র দত্ত শুরু করেছিলেন কাজ। কাজ শেষ করেন তার ছেলে নবীন দত্ত। ভাটার সময় অন্য ঘাটে যদি পানিচাতাল বেরিয়েও যায় – তবু এই ঘাটে সব সময় স্নান করার মতো জল থাকে। এই ঘাটের প্রতিটি ইঁট বাজুবন্ধ করে কোৎরা চিটে গুড়, চুন আর খদিরের মশলা দিয়ে গাঁথা হয়েছিল। দু’শ বছরেও গাঁথনি আলগা হয়নি। ১৯২৪ সালে ক্যালকাটা পোর্ট কমিশনার্স গঙ্গাসাগর থেকে কালনা পর্যন্ত গঙ্গার দুই ধার সার্ভে করেন। তাঁদের রিপোর্টে এই ঘাট সম্পর্কের লেখা আছে – ” No other ghat down Kalna is so broad, so massive, so easy of ascent and so beautiful to look at from a distance. It never runs dry even at the lowest ebb-tide”।


বাবুদের সৌখিন জীবনযাপনের গল্প শুনে তাদের সম্পর্কে যে ধারণা জন্মায়, তা কিন্তু একেবারে ভেঙে যায় হরিশচন্দ্র দত্তের ক্ষেত্রে। উনি রীতিমত শরীরচর্চা করতেন। কথিত আছে, সিপাহী বিদ্রোহের সময় একবার গুজব উঠলো যে বিদ্রোহী সিপাইরা কলকাতা আক্রমণ করতে আসছে। বাড়ির কাজের লোকের সাহায্য নিলে কথা পাঁচ কান হয়ে যাবে, তাই পাঁচ মন ওজনের সিন্দুক একা বয়ে নিয়ে চোরকুঠুরিতে ঢুকিয়েছিলেন!


কথা হচ্ছিল মন্দিরের পূজারী তপন বাবুর সাথে। এখানে এখন মাঝে মধ্যে সিনেমা সিরিয়ালের শুটিং হয়। বছর তিনেক আগে চাঁদনীর রং ছিল সাদা। পরে শুটিংয়ের জন্য লাল রং করা হয়। তাছাড়া বর্তমান ট্রাস্টিরা টাকা পয়সা জোগাড় করে কিছু কিছু সংরক্ষণের কাজ করছেন। তবে সংরক্ষণের ঠেলায় মন্দিরের প্রাচীনত্ব পুরোপুরি-ই ধ্বংস হতে বসেছে। ঘাট সংলগ্ন স্নানাগার আর বেশ কিছুটা জমি এখন বিপাসনা যোগ সেন্টারের গোয়েন্কাদের মালিকানায়।


কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম, ” আপনারা কয় পুরুষ ধরে এই মন্দিরের কাজ করেছেন?”
– সে আরেক বৃত্তান্ত। যে সময় এই মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়, তখন একানকার ব্রাহ্মণ সমাজ ছিল প্রচন্ড গোঁড়া। তাছাড়া এলাকার জমিদাররাও ছিলেন ব্রাহ্মণ। তাই কায়স্থের প্রতিষ্ঠিত দেবালয়ে কোনো স্থানীয় ব্রাহ্মণ পুজো করতে রাজি না হওয়ায়, দত্তবাবুরা কাশী থেকে পুরোহিত নিয়ে আসেন। আমরা এই সবে দু-পুরুষ এই কাজ করছি।

যজমানি করেই দিন চলে। আর্থিক অস্বাচ্ছন্দ্য নিয়েই দিন যাপন। তবু আগলে রেখেছেন এই সম্পদ, যা আমার আপনার সকলে ‘common heritage’। জানতে চাইলাম, “এখানে কোনো দান-বাক্স নেই?” 
– না, বাইরের লোক তো খুব একটা কেউ আসে না। তাই ওসবের আর রাখা হয়নি।
এর মধ্যে একজন কি একটা কথা বলতে এলো ঠাকুর মশাইয়ের সাথে। আমারও ফোন বেজে উঠলো। আলী হুসেন অপেক্ষা করছে পেট্রল পাম্পের সামনে।


টুকটাক দু’চারটে কথা বলে ফেরার পথ ধরলাম। মনে পড়ল তনুবাবুর ব্রাহ্মণ সেবার কথা। তপনবাবুকে আর সেই গল্প বলা হলো না। কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে চায় !!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s