গিরীবালার ঠাকুরবাড়ি

সন্ধ্যে নামতে আরও খানিকটা দেরি আছে। আগরপাড়া মোল্লার হাটে বাস থেকে নেমে, সোজা রাস্তায় মিনিট পাঁচেক হেঁটেই পৌঁছে যাই এই মন্দিরে। সারা মন্দির প্রাঙ্গন ফাঁকা। আমি ছাড়া আর কেউ নেই চাতালে। একজন মন্দির কর্মচারী আমার পাশ দিয়ে গঙ্গায় স্নান করতে গেলেন। কোনো প্রশ্ন করলেন না হাতে ক্যামেরা দেখেও । কয়েকটা পায়রার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। নাটমন্দির, শিবমন্দির আর গঙ্গার ঘাটের চাঁদনী দেখে দেখে আমি মূল মন্দিরের সামনে উঠে আসি। সেখানে প্রতিষ্ঠা ফলকটা পড়তে পড়তে কেবল মনে হয় ঊনবিংশ শতকের সেই সব মহা যোদ্ধাদের কথা, যারা সামাজিক ব্যবস্থার খোল-নলচে বদলে দেওয়ার জন্য প্রাণপাত করেছিলেন ।

১৩১৮ বঙ্গাব্দ । জমিদার বাড়ির বিধবা বৌ এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন গঙ্গার ধারে। মন্দিরের সেবাইত তিনি। তাঁর পরিচয় লেখা আছে -‘শ্রীযুক্তা গিরীবালা দাসি জমিদার’। মোকাম – ১৯ নং জানবাজার, কলিকাতা।” জানবাজারের লোকমাতার নাতবৌ গিরীবলা দাসি। মনে হয় যেন সম্মান আর স্বীকৃতি আদায়ের লড়াইয়ের আরেকটা বিজয়স্তম্ভ দেখি সামনের ওই ফলকে ।

রানী রাসমণির মেয়ে-জামাইরা তাঁর উত্তরাধিকারী হন। প্রথম কন্যা পদ্মমনির তিনটি পুত্রসন্তান হয় । প্রথম পুত্র মহেন্দ্রনাথ অকালে মারা যান আর তাই মাধ্যম পুত্র গণেশচন্দ্র জমিদার হন । সেই গণেশচন্দ্রের পুত্র গোপালকৃষ্ণ – যার স্ত্রী গিরীবালা । বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার নাম এই গোপালচন্দ্রের নাম অনুসারে হয়েছে। প্রীতরাম দাস ১৮০০ সাল নাগাদ সেই সময়ের মকিমপুর পরগনায় জমিদারি কেনেন। পরে এস্টেটের প্রজারা রাজগঞ্জ বাজারের নাম পরিবর্তন করে গোপালচন্দ্রের নামে গোপালগঞ্জ রাখেন।

গঙ্গার পূর্বতীরে মন্দির স্থাপত্যকে সমৃদ্ধ করে এই জানবাজারের জমিদার বাড়ি থেকেই তিন-তিনটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। রানী রাসমণি প্রতিষ্ঠিত দক্ষিনেশ্বরের ভবতারিণী মন্দিরের কথা সকলেই জানেন। অন্য দুইটি মন্দিরের মধ্যে একটি রাসমণি কন্যা জাগদম্বা দেবী স্থাপিত টিটাগড়ের অন্নপূর্ণা মন্দির এবং তৃতীয়টি বর্তমান পানিহাটি পৌর এলাকার শেষ মাথায়, এই আগরপাড়ায় গিরীবালা দাসির ঠাকুরবাড়ি।

আগেও বলেছি যে সমগ্র এলাকাটি এক সময় ছিল বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে খুবই সমৃদ্ধ। সেই চাহিদা মেটাতেই বিখ্যাত অঘোর সম্প্রদায়ের নৌকা তৈরির কুটিরশিল্প গড়ে ওঠে এখানে। অনেকে মনে করেন সেই অঘোর পাড়া থেকেই আগরপাড়া নাম হয়েছে।

রাধাগোবিন্দজীর মূল মন্দির, ৬ টি শিব মন্দির, সুদৃশ্য নাটমন্দির, ঘাট, ঘাটের চাঁদনী ও চারদিকের আবাসিক গৃহ নিয়ে ১৯১১ সালে তিন লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল মন্দিরটি নির্মাণে। মন্দিরের জন্য নির্দিষ্ট জমির দুদিকে ছিল একটি করে গির্জা ও মসজিদ। শোনা যায় যে বি.এন.ইলিসাস নামে এক শিল্পপতি পুরো জায়গাটা কিনবেন বলে যখন ঠিক হলো, তখন ক্রেতা ইহুদি বলে গির্জা কর্তৃপক্ষ বিক্রির আগে গির্জাটি ভেঙে ফেলেন (শোনা কথা)। অন্যদিকে মসজিদটি যারা ব্যবহার করতেন, তারা পানিহাটি বাজারে ব্যবসা করতেন এবং দেশভাগের সময় থেকেই তারা এলাকা ছাড়তে শুরু করেন ও ক্রমে ক্রমে মসজিদটি বিনা ব্যবহারে মসজিদটি জীর্ন হয়ে পড়ে।

খুব ছোট জায়গার মধ্যে এতো সুন্দর মন্দির কমপ্লেক্স খুব কম দেখা যায়। মূল রাধাগোবিন্দর পঞ্চরত্ন মন্দির। গায়ে খুব সুন্দর stucco-র কাজ। নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষনাবেক্ষন হয় বোঝা যায়। তার ফলে স্থাপত্যটির স্বাস্থ্য অটুট। মন্দিরে ওঠার সিঁড়ির সামনেই সামনেই বাতিদান হাতে নারীমূর্তি। বিংশ শতকের শুরুর দিকে তৈরী মন্দিরের বিভিন্ন মূর্তি ও অলংকরণে ইউরেপীয় শৈলীর স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। সুন্দর থাম আর ছাদের দিকে চোখ জুড়ানো অলংকরণ ছাড়াও কাঠের ব্লাইন্ড ও কড়িবর্গা নিয়ে খুব সুন্দর নাট্যমন্দিরটি দাঁড়িয়ে আছে মূল মন্দিরের সামনে।

মন্দিরের সঙ্গে যে ছয়টি শিব মন্দির আছে, তার অলংকরণের ব্যাপারে আরো একটু বিশদে বলা দরকার। সাবেক আটচালার। ১৯১১ সালের মন্দির। সেই সময়ে সাবেক পঙ্খের কারুকাজের জন্য ব্যবহৃত মশলার জায়গায় ঢুকতে শুরু করেছে পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট। ফলে সাবেক পঙ্খের থেকে আরও উঁচু রিলিফ পাওয়া যাচ্ছে দেওয়ালের উপর বিভিন্ন মূর্তি ও কারুকাজ তৈরির সময়। তাছাড়া, আগেও বলেছি, অলঙ্করণেও পাশ্চাত্য প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গঙ্গার ঘাটের চাঁদনীর দুদিকে, তিনটি তিনটি করে কত ছটি মন্দিরে শিবলিঙ্গের আলাদা নামাঙ্কিত ফলক আছে দেওয়ালে। বাঁদিক থেকে সেগুলি হলো যথাক্রমে – রামেশ্বর, রাজেশ্বর, গোপেশ্বর, তারকেশ্বর, ভুবনেশ্বর ও গিরীশ্বর।এই মন্দিরগুলির প্রতিটির পূর্ব ও পশ্চিম দেওয়ালে কৃষ্ণলীলা ও অন্যান্য পৌরাণিক বিষয় অলঙ্করণে ব্যবহৃত হয়েছে। রামেশ্বর মন্দিরের দুই দিকে আছে যুগলমিলন ও কৃষ্ণ বলরাম মূর্তি। রাজেশ্বর মন্দিরের পশ্চিম দিকে আছে রামরাজা মূর্তি আর পূর্বদিকে ছিল রাধাগোষ্ঠ মূর্তি, যা বর্তমানে নষ্ট হয়ে গেছে। গোপেশ্বর মন্দিরের একদিকে আছে রাই রাজা মূর্তি এবং অন্যদিকে শিবের বিবাহ দৃশ্য।

মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় ছিল অষ্টিধাতুর রাধারাণীর বিগ্রহ। সেটি চুরি হয়ে গেলে শ্বেতপাথরের একটি বিগ্রহ এনে পূজা হতো। ১৯৮৫ সালে শিবানন্দ গিরি মহারাজ মন্দির পরিচালনার ভার পেয়ে বৃন্দাবন থেকে নতুন অষ্টধাতুর মূর্তি এনে প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরটির বর্তমান পরিচালনার ভারও শিবানন্দ গিরি মহারাজের সংগঠনের অধীন। তাঁরা স্থানীয় স্তরে একটি কমিটি করে দিয়েছেন দৈনন্দিন কাজ পরিচালনার জন্য। রাধাষ্টমী, জন্মাষ্টমী, দোল, ঝুলন, রাস, স্নানযাত্রা, শিবরাত্রি, প্রতিষ্ঠা দিবস – সব নিয়ম করে পালিত হয় এখনো।

মন্দির থেকে বেরিয়ে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বসি । নীল সাইকেল চড়ে ছাত্র-ছাত্রীরা ঘাটের কাছে ভিড় করে। তাদের অকারণ উচ্ছাসে যেন জেগে ওঠে ঘুমন্ত মন্দির চত্বর। কলকল করতে করতে তারা মন্দিরের ভেতরে চলে যায়। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সাইকেলের চাকায় বিকেলের রোদ পড়ে ঝিকমিক করে ওঠে । ঘাটের আরেক পাশে কয়েকজন জেলে শুকনো জাল গোটাতে থাকে। কয়েকজন বয়স্ক মানুষ বসে থাকে সূর্যাস্তের অপেক্ষায়। আর বর্তমানকে ইতিহাসে বদলে যেতে দেখার অভ্যাস নিয়ে বয়ে চলে এই নদী।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s