রাঘব পন্ডিতের ভিটে

বৈশাখ মাসের রোদ মাথার উপর চড়ে গেছে। তবু যেন নেশাগ্রস্থের মতো একটা গন্তব্য থেকে অন্য গন্তব্যে ঘুরে চলেছি। আমার লিস্টটা প্রায় শেষ হয়ে আসার মুখে নীলোৎপল বললে – “আরে পাটবাড়িটা তো বাকি রয়ে গেল। কিন্তু জায়গাটা তো ঠিক মনে পড়ছে না !”
সেটা কোনো সমস্যাই নয় পানিহাটির মতো জায়গায়। একজন রিকশাচালককে জিজ্ঞেস করতেই মিলে যায় পথ নির্দেশ। সেই মতো পৌঁচ্ছে যাই পানিহাটি পাটবাড়ি – রাঘব ভবন। মহাপ্রভুর লীলাপর্ষদ রাঘব পন্ডিতের ভিটে।

আশ্রমের বাইরের দেওয়ালে শ্রী চৈতন্যচরিতামৃত থেকে উদ্ধৃতি লেখা : “শচীর মন্দিরে, আর নিত্যানন্দ নর্তনে, শ্রীবাস অঙ্গনে আর রাঘব ভবনে, এই চারিঠাঁই প্রভুর সদা আবির্ভাব। তবে অনুসন্ধিৎসু গবেষকের দৃষ্টিতে দেখলেও কাব্যে জায়গা পাওয়া এই সব প্রাচীন স্থানগুলির গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী হিসাবে। আজ থেকে পাঁচ’শ বছর আগে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে খুব সুন্দর বর্ণনা পাওয়া যায় এই সব লেখায়। অনেক সময় লোকগাঁথা আর কিংবদন্তির আড়ালে স্থানীয় ইতিহাসের সূত্রও খুঁজে পাওয়া যায়, একটু খুঁটিয়ে দেখলে।

এই দুপুরে মন্দির প্রায় বন্ধ হওয়ার সময়। আশ্রমের দুচারজন আবাসিক ছাড়া লোকজন খুব একটা নেই। গেট থেকে বিশাল উঠোনের তিনদিকে গড়ে উঠছে আশ্রম। সামনে মন্দির, ডানদিকে আশ্রম কার্যালয় আর বাঁ দিকে কংক্রিট পিলারের উপর লোহার পাইপের ছাউনি আশ্রয় করে বেড়ে ওঠা ঘন সবুজ প্রাচীন মাধবী লতার কুঞ্জ। এই প্রখর গ্রীষ্মের বেলাতেও নিচে ঠান্ডা ছায়া।

সামনে টিউবয়েল দেখে হঠাৎ তেষ্টা যেন বেড়ে গেলো। জল খেয়ে চোখে মুখে জল দিয়ে বসি মাধবী কুঞ্জের নিচে। পিলারের গায়ে পাথরের ফলকে লেখা শব্দগুলির উপর চোখ বোলাই। একজন বয়স্ক মানুষ ধীর হাতে পরিষ্কার করতে থাকেন নিচে পড়ে থাকা শুকনো পাতা। যেন মনের উপর থেকে সরে যায় বিস্মৃতির আবরণ। সময় পেছনে ফিরে যায়। নিঃঝুম দুপুরের যেন কাছেই সেন রাজাদের তৈরী গঙ্গার প্রাচীন ঘাট থেকে থেকে শোনা যায় মানুষের কোলাহল। এক দীর্ঘাঙ্গ নবযুবককে বনফুলের মালা পরিয়ে কারা যেন এদিকেই নিয়ে আসতে থাকে জয়ধ্বনি দিয়ে। চৈত্র মাসের কৃষ্ণ একাদশী তিথি। ১৫১৫ খ্রিষ্টাব্দ। এই ঘাট এই পথ এই পণ্যহাটি গ্রাম তো আগেও একবার দেখেছে এই দিব্যকান্তি পুরুষকে। যার আগমনে সারা গ্রাম উদ্বেল হয়ে ওঠে প্রেমানন্দে।
গৃহস্বামী রাঘব সসম্মানে বাড়িতে নিয়ে আসেন তাঁকে। তাঁর সেবার জন্য শাক ব্যঞ্জন পরিবেশন হচ্ছে আর পরমানন্দে সেই সেবা গ্রহণ করছেন অতিথি। রান্নার জন্য প্রশংসায় ভরিয়ে দিচ্ছেন রাঘব পন্ডিতকে । অতিথি সেবায় তুষ্ট হয়ে প্রভু বলছেন –
প্রভু বলে রাঘবের আলয়ে আসিয়া 
পাসরিনু সব দুঃখ রাঘব দেখিয়া 
গঙ্গায় মাজ্জান কৈলে যে সুখ হয় 
সেই সুখ পাইলাম রাঘব আলয়

====== ====== ====== ====== ====== ====== ======

– “একটু সরে বসবেন ? “
শুকনো পাতা পরিষ্কার করছিলেন যে বয়স্ক মানুষটি, তাঁর কথায় চিন্তাটা ভাঙে। উঠে গিয়ে পিলারের গায়ে পাথরের ফলকগুলি পড়তে থাকি। সেও যেন এক ইতিহাসের ভেলা।

দেগঙ্গা – বেঁড়াচাঁপা অঞ্চলের রাজা চন্দ্রকেতুর রাজধানী চন্দ্রকেতু গড়। সেই রাজার তৈরী খাল আর রাস্তা একসময় সেই প্রাচীন জনপদকে যুক্ত করতো এই পানিহাটির সঙ্গে। সেই চন্দ্রকেতু রাজার রাজপুরোহিত ও সভা পন্ডিত ছিলেন গঙ্গাপ্রসাদ চতুর্বেদী – রাঘব পন্ডিতের পিতামহ। তিনিই এই বাড়িতে রাধা মদনমোহন জিউয়ের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। পূর্বপুরুষের পদাঙ্ক অসুসরণ করে রাঘব হয়ে ওঠেন পন্ডিত । সেই সূত্রেই শ্রীচৈতন্যের এই গৃহে দু-দুবার আগমন।

শ্রীচৈতন্যের নতুন সমাজ গঠনের আহবানে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন রাঘব। পরবর্তীকালে দেখা যায় যে মহাপ্রভু নীলাচলে চলে যাওয়ার পর এই গৃহে ফিরে আসবেন নিত্যানন্দ। প্রায় তিনমাস সময়ধরে এখানেই গৌড়ের বৈষ্ণব সমাজ তাঁদের নীতি দর্শন ও আদর্শ প্রচারের কৌশল স্থির করবে এই রাঘব ভবনে বসেই। আজকের ভাষায় যাকে চিন্তন শিবির বলে, আন্দোলনের সেই ইন্টেলেকচুয়াল ব্রেন স্টর্মিং সংগঠিত হয়েছিল এই বাড়ির প্রাঙ্গনেই। আর সেই মন্থন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন এই রাঘব পন্ডিত। এই পর্যায়ে নিত্যানন্দ প্রভুর অভিষেক অনুষ্ঠিত হয় এই পানিহাটিতেই যার আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল রাঘব পন্ডিতের। এই পর্যায়ে নিত্যানন্দের নানা অলৌকিক লীলার কথা লেখা আছে বৈষ্ণব সাহিত্যে, যার সাক্ষী রাঘব পন্ডিত।

আরও সাড়ে তিন শতক পরে বাংলার আর এক যুগপুরুষের মতো শ্রীচৈতন্যও ছিলেন খাদ্য রসিক; আর নদীয়া বিহারীর চরিত্রের এই দিকটাও খুব কাছ থেকে দেখেছে এই রাঘব ভবন। এবাড়ির রান্নাঘরটি অবশ্য দর্শনীয়, যার গুরুত্ব বাংলার রন্ধন শিল্পের ইতিহাসে অপরিসীম। রাঘব ভবনের রান্নার প্রশংসা যেভাবে নথিভুক্ত হয়েছে চরিতামৃতে, সেটিও নজর করার মতো বিষয়। 
রাঘব পন্ডিত ঘরে ভোজন করিল ।
রাঘবের শাক অন্ন প্রভু প্রশংসিল ।।
শাকে বড় প্রিয় গোসাঞি আম্রে বড় প্রিয় ।
শ্রীনিবাস বলে রাঘব জিয় জিয় ।।

মহাপ্রভু নীলাচল যাওয়ার পরে প্রতিবছর রথের সময় রাঘব পন্ডিতের বাল্য বিধবা ভগিনী দময়ন্তী দেবীর তত্বাবধানে রাঘব ভবন থেকে ঝোলায় করে প্রভুর প্রিয় খাদ্যদ্রব্য শ্রীক্ষেত্র পাঠানো হতো। বৈষ্ণব ট্রেডিশনে এর নাম “রাঘবের ঝালি”। জানতে আগ্রহ হয় কি কি থাকত সেই ঝলিতে। বিস্তারিত দেওয়া আছে চরিতামৃতে। তাছাড়া রাঘব ভবনের একটি ঘরে মডেল করেও দেখানো আছে সেই সব খাদ্যদ্রব্য। তার মধ্যে ছিল – 
খইয়ের মোয়া, শালিকা ধানের খৈয়ের নাড়ু, চিড়ার নাড়ু, বাদামের নাড়ু, ক্ষীরের নাড়ু, ধানিয়া মুহুরী ধানের নাড়ু, শুটিখন্ডের নাড়ু, পেস্টের নাড়ু, আতপচালের মুড়ির মোয়া, আমি কাসুন্দি, লেবু, তেঁতুল, আমসি, তেঁতুলের আচার, হরতকি, তিলের নাড়ু, আমসত্ব, আমলকি, তৈলমৰ আমতা, কর্পূর মরিচ, লবঙ্গ, এলাচ, আদা কাসুন্দি, লেবু কাসুন্দি, ঝাল কাসুন্দি, ইত্যাদি। (অনেকগুলোর মানে আমিও জানিনা )

ইহলীলা সংবরণ করার পর রাঘব পন্ডিতকে বৈষ্ণব প্রথা মেনে সমাধিস্থ করা হয় এই প্রাঙ্গনেই। আর তাঁর সমাধির উপর একটি মাধবী লতা রোপন করা হয়। বিশ্বাসীরা মনে করেন এই মাধবী কুঞ্জ সেই প্রাচীন মাধবীলতা থেকেই ক্রমে তৈরী হয়েছে।

পাঁচ’শ বছর পেরিয়ে গেছে সেই সব ঘটনার। একদিকে যেমন শ্রীচৈতন্য এখনো প্রাসঙ্গিকতা হারাননি আজকের সমাজে, অন্যদিকে নিত্য আলোচনা আর গবেষণা চলছে তাঁকে ও তাঁর আন্দোলনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলি ঘিরে। সেই সব বিতর্কের থেকে দূরে আমি তাকিয়ে থাকি বহু যুগ আগের একটা মানুষের দেহ নির্যাসে বেড়ে ওঠা ওই মাধবী কুঞ্জ-টার দিকে। হালকা হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপে পাতাগুলি। কল্পনা করি আগামী বর্ষায় সারা কুঞ্জ ছেয়ে যাবে হালকা গোলাপি ফুলে আর সারা চত্ত্বর ভরে যাবে তার মিষ্টি গন্ধে। সেই ফুলের রূপে আর গন্ধে যেন সেই কবে চলে যাওয়া মানুষটার অস্তিত্বটাই যেন ছড়িয়ে যাবে চরাচরে। কেন যেন মনে হলো অমরত্বের সেই একলা সাধনায় নিমগ্ন এই মাধবী কুঞ্জ ফিসফিস করে বলে চলে – অমৃতকে আমি দেখেছি, আমি পেয়েছি, সমস্তই বেঁচে আছে অমৃতে।
————————————————————————
পানিহাটির বিখ্যাত দণ্ডমহোৎসব-এর সঙ্গেও রাঘব পন্ডিতের নিবিড় সম্পর্ক। নিত্যানন্দ প্রভু জমিদার পুত্র রঘুনাথ দাসকে কৃপা দন্ড দান করার সময় মহোৎসবের অন্যতম আয়োজক ছিলেন রাঘব পন্ডিত। ভবিষ্যতে রঘুনাথ দাস হবেন বৃন্দাবনের ছয় গোস্বামীর মধ্যে একজন। দণ্ডমহোৎসব বা চিড়া উৎসব নিয়ে সুন্দর একটি লেখা পড়তে পারেন “আটপৌঢ়ে বাঙালি” ব্লগে। লিংক দিলাম। এই নিয়ে আমি আর আলাদা লিখলাম না। 
https://prianxi.wordpress.com/2017/07/05/550/
————————————————————————–

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s