বেগম ফ্রান্সিস জনসন: : একটি রোলার কোস্টার জীবন

বেগম ফ্রান্সিস জনসন ব্যক্তিগত ভাবে আমার খুব প্রিয় চরিত্র। একদিকে প্রখর বুদ্ধিমত্তা, আত্মবিশ্বাস, বৈষয়িক প্রজ্ঞা। আবার অন্যদিকে ভুল সিদ্ধন্ত নেওয়া, সেই সিদ্ধান্তের জন্য খেসারত দেওয়া; পরে আবার সেই সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে এসে নিজের শর্তে বাকি জীবনটা উপভোগ করা। সর্বোপরি একটি সজীব অনুসন্ধিৎসু মনের মালিক, যার কাছে বয়স হার মানে।

১৭৭৪ সাল । ফ্রান্সিস তখন ৪৫ পেরিয়ে গেছেন। মিড্ লাইফ ক্রাইসিস ধীরে ধীরে বাসা বাঁধছে তার মধ্যে। জীবনে কিছুটা একঘেয়েমিও হয়তো এসে পড়েছিল। এক ধরণের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেছিছেন। সেই অবস্থায় সাহচর্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন ফোর্ট উইলিয়ামের নবীন চ্যাপলিন জনসন, যিনি আবার বয়সে ফ্রান্সিসের থেকে প্রায় ১৬ বছরের ছোট। দুজনের মধ্যে গড়ে উঠলো সম্পর্ক। চতুর্থ বার বিয়ে করে মিসেস জনসন হলেন ফ্রান্সিস ।

কিপ্টে হিসাবে বেশ নাম ছিল জনসনের। এমনও শোনা যায় যে জনসনের এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা জানতেন বলেই বিয়ের দিন হেস্টিংস তাঁকে ১০০ পাউন্ড দিয়েছিলেন বিয়ের দিনের খরচ বাবদ । বিয়ের পর থেকেই ফ্রান্সিস বুঝতে শুরু করেছিলেন যে সিদ্ধান্তটা ভুল হয়েছে। খুব কাছের বন্ধুদের সাথেও হয়তো আলোচনা করেছিলেন। পারিপার্শিক উৎস থেকে তাঁর অসুখী দাম্পত্যের আঁচ পাওয়া যায়। ১৭৮৭-র শেষের দিকে ফ্রান্সিস সিদ্ধান্ত নিলেন এই সম্পর্ক শেষ করার। ভারত ছেড়ে চলে গেলেন জনসন । এই ঘটনা সম্পর্কে ফ্রান্সিসের বন্ধু ও সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন বিচারপতি লর্ড চেম্বার্স এক চিঠিতে জানাচ্ছেন যে এই ঘটনায় ফ্রান্সিসের বন্ধুরা কেউই দুঃখিত হননি।

তারপর সেই ক্লাইভ স্ট্রিটের বাড়িতে ফ্রান্সিস আরও প্রায় সিকি শতাব্দী বেঁচে ছিলেন। বেয়ারা, খানসামা, খিদমতগার, হুঁকোবরদার, মালি আর পরিচারকের পুরো ফৌজ সহ শহর কলকাতায় আতিথেয়তার সর্বোৎকৃষ্ট আকর্ষণ হয়ে উঠলো এই বাড়ি । শহরের সাহেব-মেমদের সামাজিক আদানপ্রদানের কেন্দ্রবিন্দু।

গভর্নর জেনারেল থেকে শুরু করে শহরের সমস্ত কেষ্ট বিষ্টুরা ফ্রান্সিসের বৈঠকখানায় আমন্ত্রণ রক্ষা করেছেন। সেই আড্ডার মধ্যমনি হয়ে ফ্রান্সিস শুনিয়ে গেছেন তাঁর বহুবর্ণ জীবনের গল্প। সেই সব গল্পের মধ্যে বার বার ফিরে আসতো তাঁর সাথে আমিনা বেগমের বন্ধুত্বের কিস্সা। সেই বেগমের গল্পের সূত্র ধরেই ফ্রান্সিস নিজেই তাঁর বন্ধুদের কাছে ক্রমে হয়ে গেলেন ‘বেগম’, বেগম জনসন।

ফ্রান্সিস নিজে কোনো ডায়রি বা স্মৃতিকথা লেখেননি। কিন্তু নাতিদের লেখা চিঠি থেকে বোঝা যায় তাঁর সজীব সজাগ ও সচেতন মনের কথা। সমকালীন রাজনীতি থেকে দৌহিত্রদের পেশাগত উন্নতি সব নিয়েই ছিল তাঁর ঔৎসুক্য । তাঁর পাঁচজনের মধ্যে চার জন দৌহিত্র কর্মসূত্রে ফিরে এসেছিলেন ভারতে। শেষ জীবনে তারাই ছিল তাঁর জীবনের আলো। ফ্রান্সিসের এক দৌহিত্র তাঁর জীবিকালেই হয়েছিলেন যুদ্ধ ও উপনিবেশ সচিব আর তাঁর মৃত্যুর করেক মাস বাদে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, লর্ড লিভারপুল ।

নিজে না লিখলেও, সমসাময়িক নানা জনের চিঠি, স্মৃতিকথায় বার বার ভেসে ওঠেন বেগম জনসন। যেমন ঠগি দমন থেকে উপমহাদেশে ডায়নোসরের ফসিল আবিষ্কারের মতো বিভিন্ন বিষয়ে পুরোধা মেজর জেনারেল উইলিয়াম স্লীম্যান-এর লেখায়। তিনি বেগম জনসনের দৈনন্দিন রুটিনের কথা জানিয়েছেন। তিনটের মধ্যে ডিনার সেরে একপ্রস্থ ঘুম দিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিতেন। তারপর সন্ধ্যার পর বেরোতেন হাওয়া খেতে। সেখান থেকে ফিরলে সারা বাড়ি সেজে উঠতো আলোকমালায়, অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য। শহরের সমস্ত নামি মানুষ ভিড় জমাতেন এই রাতের মেহেফিলে। নাচ গান খানা পিনা তাস খেলা চলতো মাঝ-রাত পর্যন্ত। তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট কয়েকজনকে আবার রাতের খাওয়ার জন্যও থেকে যেতে অনুরোধ করা হতো। এমনই ছিল বেগম জনসনের আতিথেয়তা। স্লীম্যান মন্তব্য করেছেন – ‘এই অতিথিরা কেউই ভোর ছ’টায় উঠে সারাদিন কাজের ধকল সামলে আড্ডায় হাজির হননি। সকলেই তরতাজা। সারা দুপুর ঘুমিয়ে কাটালে যেমনটা হয় আর কি !’ (ভাবানুবাদ আমার)

এখন প্রশ্ন হলো যে এতো খরচ করতেন কি করে ফ্রান্সিস। তার উত্তরও আছে। মীর জাফরের সাথে ব্রিটিশদের চুক্তির একটি শর্ত ছিল যে সিরাজের আক্রমণ ও পরবর্তী যুদ্ধের জন্য ব্রিটিশ নাগরিক ও প্রজাদের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করতে পরবর্তী নবাব তাঁর কোষাগার থেকে ক্ষতিপূরণ দেবেন। সেই শর্ত পালন করেন মীর জাফর এবং সেই টাকার অংশ হিসাবে কোম্পানির কাউন্সিল উইলিয়াম ওয়াটসকে প্রায় ১ লক্ষ সতেরো হাজার পাউন্ড প্রদান করেন, যা ওয়াটস ও পরবর্তী কালে ফ্রান্সিসের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

বেগম জনসন সংক্রান্ত পুরোনো নথি থেকে সেই আমলের কলকাতার অনেক খবর পাওয়া যায়। জানা যায় যে সেই আমলে খালি বোতলের বড় অকাল ছিল। বোতল আর কর্কের ফাটকা খেলে বড়লোক হওয়ার নজিরও আছে। খালি বোতলের মূল্য বোঝা যায় যখন দেখি যে বেগমের উইলে তার সম্পত্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে খালি বোতলও ভাগ করে দেওয়া হয়েছে তাঁর ওয়ারিসনদের মধ্যে।

জীবনের শেষ দিকে স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে শুরু করে। বৈঠকখানায় টাঙানো ছিল প্রাক্তন স্বামীদের ছবি। সেই ছবির মানুষগুলির নাম মনে করতেও বেগ পেতে হতো। তবে তার সদা হাস্যময় চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

নন্দকুমারের ফাঁসি, ফিলিপ ফ্রান্সিস বনাম ওয়ারেন হেস্টিংস ডুয়েল, স্যার উইলিয়াম জোনসের কর্মকান্ড, ক্যাথরিন গ্রান্ডের চুঁচুড়া থেকে যাত্রা শুরু করে নেপোলিয়ানের সভায় পৌঁছনো – সব ঘটেছে তাঁর চোখের সামনে। অনেকদিন পর এইচ.ই.এ.কটন লিখেছেন “আমরা পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ শুধু কল্পনাই করতে পারি সেই ব্যক্তির আকর্ষণ যিনি ক্লাইভের ভাষণ শুনেছেন, দেখেছেন এডমিরাল ওয়াটসনকে। যিনি সিরাজের সাথে মোলাকাত করেছেন আর সর্বোপরি নিজের জীবদ্দশায় দেখে গেছেন যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেই মারাঠাদের উপর শর্ত আরোপ করার মতো ক্ষমতা অর্জন করেছে, যাদের আক্রমণের ভয়ে একদিন তাঁদের পরিখা খুঁড়ে আত্মরক্ষা করতে হয়েছিল।”

Information Source:
• The Calcutta of Begum Johnson: Ivor Edwards-Stuart
• Rambles and Recollections of an Indian Official: William Sleeman

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s