ভাবিয়া করিয়ে স্নান – করিয়া কাঁপিয়ো না

পরীক্ষা শেষ। গলির ক্রিকেট। ইটের উইকেট। ক্যাম্বিসের বল। রকমারি সবজি – খেজুর গুড় – পিঠে পায়েস – কখনো সার্কাস, চিড়িয়াখানা – বড়দিনের কেক নিয়ে ছিল আমাদের ছোটবেলার শীত। আর একটু পরে এল টেলিভিশনের ’31st নাইটের’ জলসা। তার সাথে বুঝতে শেখা শীতের কই – ট্যাংরা মাছের সৌন্দর্য – স্বাদ।

এত আনন্দের মধ্যে শুধু খচ খচ করে এই স্নানের ব্যাপারটা। বাড়ির অনুশাসনে, একমাত্র জ্বরজারি ছাড়া স্নান বাদ দেওয়া যেত না। সে শীত হোক বা গ্রীষ্ম। এখনো সেই নিয়ম বলবত আছে বাড়িতে। আমার মা’র বাড়ি ছিল সিলেটে। পাহাড়ি চা বাগান এলাকা। বুঝতেই পারছেন সেই শীতে acclimatised একটা মানুষ ক’লকাতার শীতকে কতটা পাত্তা দিতে পারে। সেই মাপকাটিতে – সারাদিন শীতের জামাকাপড় পরে থাকা আর স্নান না করা মানে পেট গরম হওয়ার নিশ্চিত রাস্তা। পেট গরম মানে পেট ছাড়া – মানে এই শীতের হাতে গোনা কটা দিনের খাওয়াদাওয়া বরবাদ। সেটি হতে দেওয়া যাবে না। গরম জলের সুবিধাটা একমাত্র সংরক্ষিত ছিল দাদু -ঠাকুমার জন্য। গরম জল করাও ঝামেলা ছিল – কারন বাড়িতে রান্না হত কয়লার উনুনে – গ্যাস আসতে তখনও অনেক দেরী। আর বাথরুমে গিজার? সেটা আসবে আরো প্রায় সিকি শতাব্দী পরে।

আমাদের দমদমের বাড়িতে প্রাথমিক জলের উত্স হিসাবে একটা কুয়ো খোড়া হয়েছিল। সেই কুয়োর জল এই সমস্যার অনেকটা সুরাহা করেছিল। বললে অনেকেই অবাক হয়ে যাবে – সকালের দিকে কুয়োর জল থাকত বেশ গরম – ধোয়া বেরোত। এক বালতি গায়ে ঢাললেই আর কষ্ট হত না – বেশ তরতাজা একটা ভাব চলে আসত।

কিন্তু যাদের বাড়িতে কুয়ো নেই, তাদের এই প্রথম এক মগ জল ঢালতে গিয়েই ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা। এই এখন দেশভক্তি নিয়ে এত কথা হচ্ছে। কেউ কি জানে শহীদরা তাদের মহান আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে কত শীতকাতুরে শিশুকে স্নান করতে প্রাণিত করতেন? এটা একদম ইয়ার্কি নয়। সিরিয়াস ব্যাপার। আমার বন্ধু মধু ভাই – প্রতিদিন প্রথম মগে করে ঠান্ডা জল গায়ে ঢালার আগে ভাবত – বিপ্লবীরা দেশের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিল – আর আমি সামান্য ঠান্ডা জল গায়ে ঢালতে পারব না ? এই ভাবে ‘মেন্টাল কন্ডিশনিং’ ঝপ করে মাথায় দিলে দিত বরফ ঠান্ডা ট্যাঙ্কের জল। এই ভাবে রোজ স্নান করে শীতে সকালে স্কুলে যেত হাফ প্যান্ট পরে – কারন ক্লাস এইটের আগে ফুল প্যান্ট পরা, অনুশাসনহীনতা বলে ধরা হত !!

শাস্ত্রে স্নান করার বিবিধ উপকারিতার কথা বলা আছে – বিশেষ করে ভোর চারটে নাগাদ যদি স্নান করা যায়, যাকে টেকনিক্যালি ব্রাহ্ম মুহূর্ত বলে। সেই স্নান নিয়ে একটা শাস্ত্রীয় গপ্প বলি। মহাপ্রলয়ের পর চরিদিকে জল থৈ থৈ। কিন্তু খাবার জিনিসের বড়ই অকুলান। সেই অবস্থায় সৃষ্টি বজায় রাখতে দেবতারা মিটিং করে ঠিক করলেন যে মর্তবাসীকে রোজ স্নান করতে হবে – কারণ জলের তো অভাব নেই। আর মাঝে মাঝে খেতে হবে – রোজ না খেলেও চলবে। কারনটা নিশ্চই বলে দিতে হবে না। মিটিং-এ সিদ্ধান্ত তো নেওয়া হলো, কিন্তু সেই নির্দেশটা মানুষকে জানাবে কে? এগিয়ে এল শিবের বলদ। সেই ভলান্টিয়ার হয়ে জল ঠেলে যাবে মর্তে। সৃষ্টি রক্ষার মহান কার্যে তারও যোগদান থাকা চাই !! খেয়াল রাখবেন দেবতারা দায়িত্বটা কাকে দিল। সরস্বতীর হাঁস নয়, স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার মত্স নয়, শিবের বলদ – খুটির জোর থাকলে যা হয় আর কি !! এই মহান দায়িত্ব পেয়ে বলদ মহানন্দে দায়িত্ব পালন করতে চলল। কিন্তু যেতে যেতে সে পুরো কেসটা গুবলেট করে ফেলল। আর মর্তে এসে ঢ্যারা পিটিয়ে মানুষকে জানিয়ে দিল – তোরা রোজ রোজ, যত বার খুশি (এটা ওঁর সংযোজন) খাবি আর মাঝে মাঝে স্নান করবি। সেই থেকেই আমাদের খাওয়ার কোনো সময় নেই – অসময় নেই। কিন্তু ইচ্ছে করেই স্নান করা বাদ দেওয়া যেতে পারে।

স্নান না করেও স্নান করার কায়দা অবশ্য শাস্ত্রেই দেখানো আছে। পুরোহিতদের মন্ত্র স্নান হিসাবে চালু।ওং অপবিত্র পাবিত্রবা সর্বাবাস্থান গতৌ পিবা .. ইত্যাদি মন্ত্র উচ্চারন করে মাথায় জল ছিটিয়ে নিলেই সব সুদ্ধ ! সব পবিত্র ! তবে আর স্নানের এই হাঙ্গামা কেন পোয়ানো বাওয়া !!

আমরা যদি মেনে নি যে দেশের বেশির ভাগ লোক শহরে থাকে না, তাহলে দেখতে পাব যে বেশির ভাগ লোক-ই প্রতিদিন স্নান করে না। এবং স্নান না করে দিব্য সুস্থ সবল থাকে। আমার আরেক বন্ধু – দেশের এক অগ্রগন্য ‘naturalist’ – সে শীতের সময় বিভিন্ন জঙ্গলে পাখি দেখতে ও দেখাতে যায়। সেটা ওর অন্যতম পেশা। অর মুখেই শুনেছি যে অরুনাচল প্রদেশ থেকে গাড়োয়ালের পাহাড়ে সাধারণ মানুষ শীতে কদাচিত স্নান করে। সেই সব জায়গায় জল গরম না করে স্নান করা যাবে না – আর এই জল গরম করার ব্যাপারটা আর্থিক ও পরিশ্রমের দিক থেকে কার্যকরী নয়। সুতরাং ….

সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কিনা বলতে পারব না তাদের পুরো পরিবারের সাথেই স্নানের অহি-নকুল সম্পর্ক। সেই যে একবার ওরা সপরিবারে লাদাখ বেড়াতে গেল, তখন নাকি টানা ২৮ দিন স্নান করেনি কেউ। তা ছাড়া এমনিতেই নাকি স্ত্রী পুরুষ কাচ্চা বাচ্চা নির্বিশেষে মাঝে মাঝেই ওরা স্নান করে না। মানে স্নান করে না বললে মিথ্যে বলা হবে। এরা ঠান্ডা জলে চিরুনি বেশ কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রেখে, সেই চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে নেই ! ব্যাস ! আমার এই বন্ধু ও তাদের মত আরো প্রকৃতিপ্রেমী আছে যারা স্নান করে জল নষ্ট করার ঘোর বিরোধী।

এদের মত মানুষদের যদি প্রশ্ন করা হয় : Are you going to take a bath? 
তারা নিশ্চয় উত্তর দেবে : No, I’m leaving it in its place !

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s