চিড়িয়া মোড়ের গল্প অথবা এক টুকরো ঊনবিংশ শতক

বিশ্বকর্মা পুজোর দিন । স্কুলের এক বন্ধুর কারখানা ঢুঁ মারার ছিল, চিড়িয়া মোড়ের কাছে । গন্তব্যের পথ নির্দেশ জানতে চেয়ে ফোন করলাম। বন্ধুটি বলল – বাড়ি এসেছে । ফিরতে আধ ঘন্টা লাগবে। সিইএসসি-র সামনে দাঁড়াতে। ফেরার পথে আমাকে তুলে নেবে। তখন-ই বুদ্ধিটা মাথায় এলো। স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে মাতালদের উদ্ভট কান্ডকারখানা না দেখে – যাই একটু খোঁজ করি রাজা বৈদ্যনাথ রায়ের বাড়িটার।

জায়গাটা মোটামুটি জানা ছিল। সেন্ট নাইনিয়ান স্কুলের পেছনে। সেই বুঝে রাস্তা পেরিয়ে হাঁটতে থাকলাম উত্তর দিকে। মিনিটখানেকের মধ্যেই পেয়ে গেলাম স্কুল। কিন্তু এর পেছন দিকে যাওয়ার তো কোনো রাস্তা নেই। কী করি ? একটু পিছিয়ে এসে দেখি একটা প্রাইভেই ড্রাইভ-ওয়ে, যার ঠিক গায়েই কলকাতা সশস্ত্র পুলিশের ক্যাম্পাস। তখনি নজরে পরে দেওয়ালের উপর শ্বেত পাথরের ফলক। লেখা “রাজা’স পার্ক”। গেটের দুদিকে দুটি সাদা সিংহের মূর্তি।

খোলা গেট দিয়ে ঢুকতেই ডানদিকে মনে হলো চৌকিদারের ঘর। আমার হাঁকডাকে এক মহিলা বেরিয়ে এলেন। তাঁকে আমার উদেশ্য বলতে – সোজা ভেতরে সিকিউরিটির সঙ্গে কথা বলতে বললেন। বাঁ হাতে পুলিশ ক্যাম্পাসের পাঁচিল রেখে গাছগাছালি ছাওয়া রাস্তা ধরে এগিয়ে যাই।

বেশ বুঝতে পারি এই পুরো তল্লাটটাই ছিল ছিল রাজা বৈদ্যনাথ রায়ের বাগানবাড়ি। আজ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিশাল এলাকা তিন চার ভাগে টুক হয়েছে – পুলিশ ক্যাম্পাস, সেন্ট নাইনিয়ান স্কুল আর আর রাজার উত্তরসূরিদের বাসস্থান। আরো ভাগ থাকলেও থাকতে পারে। এই বাগান জোড়া ছিল দেশের সব থেকে নামকরা চিড়িয়াখানা। সেই থেকেই জায়গার নাম চিড়িয়াখানার মোড়। লোকমুখে চিড়িয়া মোড়।

বাগানের পরিচর্যায় বর্তমান মালিকদের যত্ন তারিফ করার করার মতো। মেহেন্দির ঝোপ সমান করে ছাটা। লনের ঘাস ভেলভেটের গালিচার মতো পড়ে রয়েছে ভদ্র মাসের শেষ বিকেলের রোদে। মালির সঙ্গেই প্রথমে মোলাকাত হলো। তাঁকেই বললাম – ক’টা ছবি তুলতে চাই। সে তো তাড়িয়ে দিতে পারলে বাঁচে। শেষে বললাম, বাবুর সঙ্গে কথা বলবো। আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে বাবুকে ডাকতে গেলেন উনি।

বাগানের মধ্যে একটা বাসার জায়গা দেখে সেখানে এসে বসলাম। গাছ গাছালির মধ্যে কয়েকটা ভেনাস আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন জন্তুর মূর্তি। বিশেষ করে সিংহের। বেশ বোঝা যায় যে মালিকের জীব জন্তু পোষার শখ ছিল।

রাজা বৈদ্যনাথ রায়ের (? – ১৮৬০) পশুপাখির উপর জ্ঞান শহরের অভিজাত মহলেও ছিল সমাদৃত। ছাতুবাবুর বুলবুলির লড়াইতে বিচারকের আসন অলংকৃত করেছেন রাজা বৈদ্যনাথ। জীবজন্তু নিয়ে এই আগ্রহকে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে তিনি জুওলজিক্যাল সোসাইটি অফ লন্ডনের সভ্য পদ প্রহণ করেছিলেন। মারকুইস অফ ল্যান্সডাউন-এর সভাপতিত্বে পরিচালিত সেই সোসাইটির কাজে ৬০০০/- দানও করেছিলেন। সোসাইটি থেকে রাজা বৈদ্যনাথ ও তার পুত্র কুমার রাজকৃষ্ণকে সাম্মানিক সদস্য পদ দেওয়ার যে চিঠিটির প্রতিলিপি আমরা দেখতে পাই, তাতেও দেখতে পাই এই চিড়িয়াখানার উল্লেখ রয়েছে : 
“…., the communication of your wish that yourself and your son should be admitted as Member of the Society, and having been at the same time informed of your munificent contribution to Zoological science by the maintenance of a large Menagerie, to which the most liberal access is afforded.” (Source : Letter from The Zoological Society of London, dated 16.03.1855) 
পশুপাখির উপর তার জ্ঞান শহরের বাবু মহলেও ছিল সমাদৃত। ছাতুবাবুর বুলবুলির লড়াইতে বিচারকের ভূমিকায় আমন্ত্রিত হয়েছেন রাজা বৈদ্যনাথকে।
লক্ষ্মীকান্ত ধর (ওরফে নকু ধর)-কে দিয়ে যে পারিবারিক বৈভবের সূচনা, তার-ই উত্তরাধিকারী এই পরিবার। নকু ধরের একমাত্র মেয়ে পার্বতী দেবীর ছেলে সুখময় রায়। দৌহিত্রের জন্য মহারাজা খেতাব আনিয়ে দিয়েছিলেন নকু ধর। সেই মহারাজা সুখময় রায়ের তৃতীয় পুত্র রাজা বৈদ্যনাথ রায়। মহারাজা সুখময় রায় থেকেই দান খয়রাতের যে পারিবারিক ঐতিহ্য শুরু হয়েছিল, তা পুরো মাত্রায় বজায় রেখেছিলেন রাজা বৈদ্যনাথ সহ অন্য ভাইরা। রাজা বৈদ্যনাথের উল্লেখযোগ্য দানগুলির মধ্যে ছিল – হিন্দু কলেজ ফান্ডে ৫০,০০০/-, মিসেস উইলসন প্রবর্তিত এদেশীয় মহিলাদের শিক্ষার জন্য ফান্ডে ২০০০০/-, কর্মনাশার উপর সেতুর জন্য ৮০০০/- ইত্যাদি। সমাজসেবা ও রাজানুগত্যের জন্য লর্ড আমহার্স্ট-এর সময় তিনি রাজা বাহাদুর খেতাব পান।

কাশীপুরের গান এন্ড শেল ফ্যাক্টরির ঘাট থেকে দমদমা পর্যন্ত রাস্তাটি তৈরির জন্য বিশেষ অংশদান ছিল রাজা বৈদ্যনাথ ও তাঁর সব থেকে ছোট ভাই রাজা নরসিংহ রায়ের; যদিও এই কাজটির জন্য অনেকটা অর্থ তাঁর উইলে বরাদ্দ করে গিয়েছিলেন তাঁদের পিতামহী পার্বতী দেবী।

বৈদ্যনাথ রায়ের গল্পের সঙ্গে পাকেপাকে জড়িয়ে আছে এই বাগান। এমন বাগান সেই সময় আর বোধহয় ছিল না শহরে। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডের কেন্দ্র ছিল এই বাগান।

১৮ ই মে ১৮২৫ সালের সমাচার দর্পনের খবর ছিল – ” …. ২৬শে বৈশাখ শনিবার বৈকালে শ্রীযুত রাজা বৈদ্যনাথ রায় বাহাদুরের বাগানে মল্ল যুদ্ধ হইয়াছিল তদবিবরণ। কতগুলিন প্রকৃষ্ট বলিষ্ঠ লোক ওই স্থানে আসিয়াছিল তাহারা দুই২ জন এক২বার যুদ্ধ করে প্রথমে হাতাহাতির পরে মাতামাতি মাকামাকি ঝাঁকাঝাঁকি হুড়াহুড়ি দুড়াদুড়ি ঠাসাঠাসি কষাকষি ফেলফেলি ঠেলাঠেলি শেষে গড়াগড়ি বাড়াবাড়ি উল্টাপাল্টি লপটালপটি কোরিয়া বড় শক্তশক্তির পর একজন জয়ী হয় তাবৎ লোক তাহাকে সাবাসি২ বলিয়া উঠে এই মত প্রায় ৩০ জন লোকের যুদ্ধ দেখা গেল। …….. এই মল্ল যুদ্ধের বিশেষ শুনিলাম যে যত লোক সে স্থানে যুদ্ধ করিতে আইসে তাহারা পারিতোষক অনেক টাকা পায় যে লোক পরাজিত হয় সে যত পায় যে ব্যক্তি জয়ী সে দ্বিগুন পায়।”

এই বাগান আবার খবরে উঠে আসে ১৮৭৯ সালে। সে বছর হিন্দু মেলা অনুষ্ঠিত হয় এই বাগানে। ১৫-২-১৮৭৯ তারিখের কাগজে প্রতিবেদন ছাপা হয় – ” বেলা সার্দ্ধ নবম ঘটিকার সময় ২১১ নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রিট হইতে মহা সমারোহে মেলাস্থলে যাত্রা আরম্ভ হয়। পতাকা, আশাসোঁটা লইয়া জাতীয় কীর্তন করিতে করিতে মেলার অনুষ্ঠাতা ও হিতসাধকগণ বরাবর মেলার স্থানে গমন করেন। …. “

সেই রাজা নেই আর সেই রাজ্যও নেই। সম্পত্তির অনেকটা অংশই আজ পুলিশের ক্যাম্পাস। রাজা বৈদ্যনাথের ছোট ছেলে, রাজা কালীকৃষ্ণ রায় এই বাগানবাড়ির অনেকটা অংশ একটি পাকা বাড়ি সমেত নর্থ সুবার্বান পুলিশ স্টেশন হিসাবে ব্যবহারের জন্য বিনা ভাড়ায় সরকারকে দিয়েছিলেন। ক্রমে সেটাই এই পুলিশ ক্যাম্পাসের পরিণত হয়। যারা পুলিশ ক্যাম্পাসের ভেতর গিয়েছেন, তাঁরা এই পুরোনো বাড়ির কথা মনে করতে পারবেন।

এর মধ্যে মালি এলেন বাবুকে সঙ্গে নিয়ে। বয়স্ক মানুষ শার্ট ট্রাউজার পরনে। বললাম নিজের বক্তব্য। কিন্তু ছবি তুলতে দিতে রাজি হলেন না। হুকুম শুনিয়ে নিজের কাজে চলে গেলেন ভদ্রলোক। তার পেছন পেছন এসে দাঁড়ালেন এক টিনেজার। গায়ের রং চোখে পড়ার মতো। নিজেই এগিয়ে এসে যেন খানিকটা কৈফিয়তের সুরে বললেন – “বুঝলেন তো , আমাদের প্রাইভেট জায়গা, নানা রকম উদ্দেশ্য নিয়ে লোক আসে। তাই দাদু রাজি হন না। “

আবার বুঝিয়ে বললাম আমার বক্তব্য। বাড়ি নয়, আমার চাই বাগানের ছবি। গল্পটা তো চিড়িয়াখানার বাগান নিয়ে। কি বুঝে ছোট কর্তা বাগানের দু’তিনটি ছবি তুলতে বললেন। আমিও পটাপট কৃতজ্ঞ চিত্তে কটা ছবি নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। ফেরার আগে ভদ্রতাবশত নাম জিজ্ঞেস করলাম।
সে উত্তর দিলো – “কুমার” আমুক রায় । 
একটু অবাক হলাম – এই ২০১৮ সালেও নিজেকে কুমার বলে পরিচয় দেওয়া! হয়তো এই ভাবেই পারিবারিক ঐতিহ্যে শিক্ষিত হচ্ছে এই কিশোর।

ফেরার পথে গেটের বাইরে এসে আবার দাঁড়াই। স্কুল আর পুলিশ ক্যাম্পাসের মধ্যে প্রায় বোঝাই যায় না বাড়িটার অস্তিত্ব। দিনের আলো পড়ে আসে। ব্যস্ত বিটি রোড দিয়ে পরপর চলে যায় গাড়ি বাস ট্রেলার। ধুলো উড়িয়ে একটা ভ্যান ঢুকে যায় পুলিশের ক্যাম্পাসে। কোথাও উচ্চস্বরে বেজে চলে উৎসবের সাউন্ড বক্স। আর এই দৈনন্দিনতার ছোঁয়া বাঁচিয়ে একটুকরো উনিশ শতক বেঁচে থাকে এখানে, প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে। রাজার বাগানে।

তথ্য সূত্র :
• A Short Sketch Of Maharaja Sukhmoy Roy Bahadur and his Family – Benimadhab Chatterji, M.A, B.L 
• Forgotten Citizens of Calcutta – Manmathanath Ghosh 
• বংশ-পরিচয় (চতুর্দ্দশ খণ্ড) – জ্ঞানেন্দ্রনাথ কুমার
• সংবাদপত্রে সেকালে কথা (প্রথম খন্ড) – শ্রী ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় সংকলিত ও সম্পাদিত

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s