তাল-নামা

জন্মাষ্টমীর সময় সাধারণত তালের চাহিদা বাড়ে বাজারে।  অনেক বাড়িতে গোপালকে তালের বড়া তালের ক্ষীর দেওয়া হয়।  আমাদের বাড়িতে তালের লুচিও হয়।  তবে খেতে যতই সুস্বাদু হোক না কেন – পাকা তাল বাড়িতে এলে তাকে রান্ধনযোগ্য করে তোলাও এক শ্রমসাধ্য পদ্ধতি।  সেই থেকেই বোধয় আমাদের সিলেটি বাগধারায় “তাল” শব্দটা ঝামেলা বা হ্যাপা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়।  যেমন – এক তালো আরেক তাল। বা কিতা তাল লাগাইসে , ইত্যাদি !!  প্রথমে তো আপনাকে চিনতে হবে ভালো তাল।  অনেক সময় পাকা তাল তেতোও হয়।  তাছাড়া তালের মিষ্টত্ব-তেও হেরফের হয়।  সব থেকে সোজা পদ্ধতি তালের উপরের ছালটা সরিয়ে হলুদ-কমলা শাঁসটা একটু চেখে দেখা।  তবে দোকানদার সব সময় আপনাকে সেই প্রিভিলেজ দিতে রাজি না হতেও পারে।  তাছাড়া ঠাকুর-কে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিনলে, এই ভাবে চেখে নেওয়া অনেকের সংস্কারেও  বাধা হতে পারে।  তাই জিভ বাদ দিয়ে অন্য দুটি ইন্দ্রিয়ের উপর আস্থা রাখুন।  প্রথম নাক।  শুঁকে দেখুন পাকা তালের তীব্র মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছেন কি না।  আর দ্বিতীয়টি চোখ। আমাকে বেশ কম বয়সেই মা বাজার করতে নিয়ে গিয়ে শিখিয়েছিলেন – তালের রং আরশোলার গায়ের রঙের মতো দেখে কিনতে।  এতে বেশির ভাগ সময় আপনি জিতে যাবেন  – আর বাকিটা হলো আপনার আর আপনার গোপালের খাওয়ার কপাল !

যাই হোক, তাল তো নিয়ে এলেন।  এবার তার বাইরেটা ভালো করে ধুয়ে নিন।  এবার বাইরের কালো শক্ত খোসা ছাড়িয়ে ফেলুন।  তবে সাবধান তার সাথে হলুদ শাঁস যেন বেশি বেরিয়ে না যায়।  এ বছর আপনাদের ওখানে তাল কত করে ? আমাদের এখানে কিন্তু ৩০ থেকে ৪০ টাকা !! এবার তালের তিনটি আঁটি আলাদা করে একটা গামলায় ভালো করে ভিজিয়ে রাখুন।  ভিজিয়ে রাখলে আঁশগুলি একটু আলগা হয়ে যাবে।  তারপর বেতের ঝুড়ি বা স্টিলের ঝাঁঝি দিয়ে আঁশ থেকে শাঁস আলাদা করুন। প্রয়োজন মতো জল মিশিয়ে আঁশ থেকে সবটা শাঁস বের করে নিন।  আঁটিটা একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেলে বুঝবেন – আপনার কাজ শেষ !!  তবু শেষ হইয়াই হইল না শেষ।  যদি দেখেন যে একটু তিতকুটে লাগছে, তবে সেই শাঁসে একদলা চুন ফেলে দিন।  তারপর ভালো শুকনো সুতির কাপড়ে চুন সমেত তালের গাদ ভালো করে বেঁধে ঝুলিয়ে দিন।  তিন চার ঘন্টায় সমস্ত জল ঝরে যাবে।  সাথে কেটে যাবে তেতো ভাবটাও।  

তবে আঁটিটা ফেলে দেবেন না।  বাড়ির একটা কোনে ফেলে রাখুন – নিয়মিত জল দিয়ে ভিজিয়ে দিন ।  লক্ষ্মী পুজোর সময় দেখবেন ভেতরে শাঁস হয়ে গেছে।  বেশ লাগে খেতে !! আবার অনেক বাড়িতে লক্ষ্মী পূজার উপাচার হিসাবেও তাল আঁটির শাঁস দেওয়া হয়।  এক এক সময় মনে হয় যে সংসারের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও অপচয় রোধ করার মধ্যে যে সম্পর্ক সেটা আরো একবার মনে করানোর জন্যই এই প্রথা।

কথায় কথায় এই ভাদ্র থেকে একেবারে অশ্বিন কার্তিকে চলে গেছিলাম।  ফিরে আসি এই ভাদ্রের তাল পাকা গরমে। যদিও গান আছে “তালের বড়া খাইয়া নন্দ নাচিতে লাগিল” – তবু আমার কিন্তু তালের বড়ার থেকে তালের ক্ষীর বেশি পছন্দ।  রুটি, পাউরুটি বা বাসি পরোটার সাথে খুব ভালো লাগে।  যাকে বলা যায় দেশি “ব্রেড স্প্রেড” !! মুড়ির সাথেও খেয়ে দেখতে পারেন।  নোনতা মুড়ির সাথে মিষ্টি তালের ক্ষীর – সেই স্কুলের ফিজিক্স ক্লাসে ম্যাগনেট বা চুম্বকের চ্যাপ্টারের কথা মনে করিয়ে দেয় “unlike poles attract” ! তবে সময় বদলাচ্ছে – মানুষের হাতে কমছে সময়।  সেদিন দেখলাম মধ্যমগ্রামের নামী মিষ্টির দোকান  মৌচাক-এ পোস্টার দিয়েছে – “জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে তালের বড়া পাওয়া যাচ্ছে”।

কয়েক বছর ধরে মা তালের লুচি করছে।  ময়দার সাথে তালের শাঁস মেখে আবার ভেতরে তাল ক্ষীরের পুর দিয়ে – দারুন লাগে এই তাল-খাদ্যের এই নতুন পাঠ-টা।  আপনারাও করে দেখতে পারেন। 

কথায় বলে নারকেলের চোখ আছে আর তালের চোখ নেই।  তাই নাকি তাল মানুষের মাথায় পড়ে আর নারকেল মাথা বাঁচিয়ে মাটিতে পড়ে।  সত্যি মিথ্যা জানি না – তবে তাল মাথায় পড়তে দেখেছি।  ছোটবেলায়।  আজকের নাগেরবাজার – মিউনিসিপাল লেন এলাকায় গেলে কেউ ভাবতেও পারবে না যে ৩০ – ৩৫ বছর আগে কেমন ছিল পাড়াটা।  দমদম রোড দিয়ে ঢুকেই একদিকে ছিল মিউনিসিপ্যালিটির পাঁচিল আর তার উল্টোদিকে পৌরসভার মালপত্রের গোডাউন।  নামেই গোডাউন ল্যান্টানা গাছের ঝোপ ভর্তি।  তার পরেই বুড়ো ঠাকুরের মাঠ।  মাঠ আর রাস্তার মধ্যের  সীমানায় লাইন দিয়ে বেশ কয়েকটা তাল গাছে।  এই সময় পাকা তাল অনেক পথচারীর মাথাতেই পড়তো।  তবে মাথায় তাল পড়লেও সেই ব্যাথা ভুলে পাকা তাল কুড়িয়ে নিয়ে তারা হাসিমুখেই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিতো। জনস্বার্থে কাউকে গাছ কেটে ফেলার দাবি তুলতে শুনিনি।  পাড়ার সকলের সাথে আমার বাবাও রাতপাহারা দিতে যেত।  অনেক দিন মাঝ রাতে ফিরে এসে দিয়ে যেত সেই গাছ থেকে পড়া তাল।  পরের দিল সেই তালের বড়ার ভাগ পেত নাইট গার্ড পার্টির সকলেই।  এই ভাবেই তৈরী হতো পাড়ার লোকেদের পারস্পরিক সম্পর্ক। 

তারপর রডকল এলাকায় আসার পর সেখানে দেখলাম তালের আরেক রূপ।  আমাদের পাশের বাড়ি ছিল চন্দ-দের।  তাদের জমির একপাশে ছিল চার-পাঁচটা তাল গাছ।  তবে এগুলি পুরুষ গাছ।  এতে তাল হয় না।  মোচ হয়।  সেই গাছগুলি লিজ দেওয়া ছিল।  সেই মোচ কেটে বিকেল বেলা হান্ডি বেঁধে দিয়ে যেত লোকেরা। দু’তিনদিন পর   সকালে নিয়ে যেত রস ভর্তি হাড়ি।  এই রস থেকেই তৈরী হয় তাড়ি।  নাক কোঁচকাবেন না – আয়ুর্বেদিক শাস্ত্র অনুযায়ী অত্যন্ত উপকারী এই রস। তবে তাড়ি তৈরী হয় আরো বেশ কিছু প্রক্রিয়ার পর।

তাল গাছের রস থেকেই তৈরী হয় তাল পাটালি। আগে সব জায়গাতেই পাওয়া যেত।  তবে গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায়  পাটালির গুনগত মান অনেকটাই খারাপ হয়ে গেছে।  ভেজাল মেশানো হয়।  অভিজ্ঞ জিভে ঠিক ধরা পড়ে যায়।  ধরা পড়ে হাটের দোকানদার জিভ কেটে লাজুক হাসে।  তাতেই যুদ্ধ জয়ের আনন্দে ভেজাল পাটালি নিয়ে বাড়ি ফিরি !

বড্ডো নিরামিষ হয়ে গেলো লেখাটা।  শেষ পাতে একটু আমিষ আমদানি করি।  আমাদের দেশের – বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে ফলের রসে  মাংস রান্নার একটা ট্রেডিশন আছে।  যেমন ধরুন তরমুজের মধ্যে তরমুজের রসে রান্না করা চিকেন।  সেই ধারাতেই দেখেছিলাম তাড়ি – চিকেন।  খুব সুক্ষ শৈল্পিক রান্না নয় – তবে বেশ বীর রসের আধিক্য পাওয়া যায়।   গ্রামের মধ্যে পাওয়া মশলা দিয়ে মাটির হাঁড়িতে কাঠের জালে রান্না করা মুরগির ঝোল – তবে জলের পরিবর্তে তাড়ি ব্যবহার করা হয়।  একবার কাজে অন্ধ্রপ্রদেশ গিয়ে চেখে এসেছিলাম এই আজব খানা। অনেক পরে দেখলাম ইউটিউবেও এই রেসিপির কয়েকটা ভিডিও আছে।  শুধু চোখে নয় – রান্না করে চেখে দেখতেও পারেন।  কে বলে – এডভেঞ্চার করতে দুর্গম পাহাড় পর্বত মরুভূমি যেতে হয়?  রান্না খাওয়ার মধ্যেও পাওয়া যায় এডভেঞ্চারের স্বাদ।   তবে জিগরে দম থাকা চাই !!.

তালের বড়া যে বাঙালির কি প্রিয় জিনিষ তা যিনি পছন্দ করেন তিনিই কেবল জানেন। ছোটবেলায় মা-কে  দেখতাম  একহাতে এই তাল সামলাতে।  একদিকে বিশাল বারকোশে নতুন ঝুড়ি দিয়ে তাল ছাঁকা । অন্যদিকে শিলে  ভেজানো চাল গুঁড়ো করা । আর তারপর পেতলের গামলায় এক ছড়া চাঁপা কলা নিয়ে চটকানো । কলাপাতার ওপর  নারকরেল কুড়িয়ে রাখা হতো আলাদা করে আগে থেকেই। তালের রস সেই কলার ওপরে পড়ল। তরপর পরিমাণমত আটা আর চালের গুঁড়ো। এবার বেশ খানিকটা নারকোল কোরা। ঠিক কড়ায় ছাড়ার আগেই একটু বড় দানার চিনি ছড়ানো হল। কেন? বড়াগুলো ঝাঁঝরা বা porous হবে বলে। তারপর কালো লোহার কড়াইতে সর্ষের তেল গনগনে আঁচে গরম হতেই হাত দিয়ে সেই মাখা থেকে ছোট্ট ছোট্ট বড়া গরম তেলে ভেজে ভেজে তুলে নেওয়া হল।  গরম গরম একরকম। মুচমুচে, টোপাটোপা। আর বাসি হলেও অন্যস্বাদ। যদিও তখন ন্যাতন্যাতে আর তুলতুলে। চালের গুঁড়ি বেশী হলে বড়া মাটি কিন্তু। 

ভাদ্রমাসে শুক্লা নবমী তিথিতে অনেক মহিলাকে “তালনবমী’ ব্রত করতে শুনেছি । এটি মূলত লক্ষ্মী নারায়ণের পুজো আর তাল ফলটি নারায়ণকে দান করে তবেই খাওয়ার রীতি। তালের পিঠে, তালক্ষীর ইত্যাদি নিবেদন করা হয়। এই তালনবমীর ব্রতকথা যেন আজকের দিনের টেলিভিশনের মেগা সিরিয়ালের মত‌ই । শুধু কুশীলব হলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ আর তাঁর দুই প্রিয়তমা সপত্নী…সত্যভামা ও রুক্মিণী। দুই সতীনের মন কষাকষি, স্বামীকে একান্তে না পাওয়া নিয়ে। কৃষ্ণের প্রতি কার অধিকার বেশী তাই নিয়ে। অবশেষে এক ঋষির পরামর্শে সেই সতীন কাঁটা দূর করে এই তাল নামক ফলটি। ঋষির আদেশ মাথায় নিয়ে সত্যভামা পরপর ন’টা বছর ধরে এই তালনবমী ব্রত পালন করে স্বামীকে পেয়েছিলেন নিজের করে। মানে আর কি তালের রসে বশীকরণ ।  স্বামীকে নিজের হাতে তালের পিঠে ইত্যাদি সুস্বাদু রেঁধে খাইয়ে তবে বশ করতে হয়েছিল বলে এই ব্রতের নাম তালনবমী।

উনুনে বসেছে দুধের ক্ষীর। মা মাঝেমাঝে হাতা  দিয়ে নেড়ে দিচ্ছে যাতে না দুধের তলা লেগে যায়। ছাঁকা তাল তোলা রয়েছে আরেক গামলায়।  ঘন দুধের ক্ষীরে সেই তালরস পড়বে। নাড়া হবে যতক্ষণ না পর্যন্ত দুধের সাথে তাল রস মিলে মিশে একটাই রঙ হয়। । তার পরেই বাতাসা দিয়ে নামানো হবে সেই অমৃতসমান তালক্ষীর। বেশী ফোটালেই দুধ যাবে ফেটে। ঠান্ডা হলে তাজা নারকোল কোরা ছড়িয়ে, কাজু-কিসমিস দিয়ে পরিবেশিত হবে সেই সুইটডিশ। আলপনাও দিতে পারও মানে যাকে এখন বলে গারনিশিং। বিকেলের জলখাবারে মুচমুচে পরোটা দিয়ে সেই তালক্ষীর।  

তবে তালের কথা উঠুক আর না উঠুক – প্রতি বছর বার কয়েক বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা সেই আশ্চর্য ছোট গল্পটার কথা মনে হয়। ছোট্ট গোপালের মতো  বড় লাভের আশায় কত ছোট লোভ সংবরণ করি। তবু জটি পিসির বাড়িতে তাল নবমীর নেমন্তন্ন আর আসে না।  আমার বাড়ির সামনে দিয়ে সবাই নেমন্তন্ন খেতে যায়। আমি বারান্দায় বসে দেখি।  বাইরে ভাদ্রের তুমুল বর্ষায় ডুবে যায় পথঘাট। শুধু জেগে থাকে একটু ওই আশাটা –  কোনোদিন, হয়তো কোনোদিন ঠিক আসবে তাল নবমীতে নিমন্ত্রণ ! 

August 2016