দমদমের সেন্ট মেরি’জ স্কুল : বাগানবাড়ির আরেক বিবর্তন কথা

মহাবিদ্রোহের তখনো বছর কুড়ি বাকি।  বনিকের মানদন্ড রূপান্তরিত হয়ে গেছে রাজদণ্ডে।  চলছে কোম্পানির রাজ আর রাজ্য বিস্তার। আর সেই বিস্তার পরিকল্পনার অবিচ্ছদ্য অঙ্গ যুদ্ধ, যার অবশ্যম্ভাবী ফল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে সৈন্য ক্ষয়।  তার সঙ্গে যোগ হয়েছে এদেশের জল-হাওয়া বাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব। দুই মিলে ইউরোপিয়ান ও অ্যাঙ্গলো ইন্ডিয়ান জনগোষ্ঠীর মধ্যে মৃতের সংখ্যা আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনাথ শিশুর সংখ্যা বেড়ে চলেছে দিন কে দিন।   এই অনাথ শিশুদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শুরু হয় কিছু অনাথ আশ্রম। যার মধ্যে ছিল মুরগিহাটার “ক্যাথলিক স্কুলের” সঙ্গে সংযুক্ত অনাথ আশ্রম ।

St. Mary’s Orphanage and Day School …. photograph from 2015

বাংলার তৎকালীন ভিকার এপোস্টলিক – ডাঃ প্যাট্রিক জোসেফ কেরিউ এই অনাথ আশ্রম ও স্কুলটির সুষ্ঠ পরিচালনার দিকে নজর দিলেন। নিজে আইরিশ হওয়ার জন্য তাঁর প্রথমেই মনে পড়লো এডমন্ড রাইস প্রতিষ্ঠিত আইরিশ ক্রিশ্চিয়ান ব্রাদার্সদের সংগঠনের মাধ্যমে আশ্রমটির পরিচালন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কথা।  তাঁর অনুরোধ পৌঁছুল আয়ারল্যান্ড।  কিন্তু সেই সময় ভারতে নতুন করে সংগঠন স্থাপনের জন্য কোনো কর্মী না থাকায়, সংগঠন দুজন-কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। ১৮৪৮ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী সেই দুজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আইরিশ ব্রাদার  – প্যাট্রিক ফিটজপ্যাট্রিক ও টমাস টলান কলকাতায় পৌঁছুলেন ।  তাঁদের নাম হলো ব্রাদার জেভিয়ার (অন্য মতে ব্রাদার ফ্রান্সিস )  ও ব্রাদার অ্যালফোনসাস।  ব্রাদার জেভিয়ার দায়িত্ব নিলেন মুরগিহাটার অনাথ আশ্রমটির আর ব্রাদার অ্যালফোনসাস শুরু করলেন সেই আশ্রমের ছেলেদের জন্য স্থাপিত  বৌবাজারের অবৈতনিক স্কুলটির   – যার নাম ছিল ক্যাথিড্রেল স্কুল। তবে তাঁরা সরাসরি  আইরিশ ক্রিশ্চয়ান ব্রাদার্সদের সংগঠেনের অংশ হিসাবে নয়,  কাজ শুরু করলেন  “ক্যালকাটা ব্রাদার্স ” নামে নতুন এক গোষ্ঠী হয়ে। 

অনাথ আশ্রম ও তার স্কুলটির সাংগঠনিক ও আর্থিক সমস্যা খানিক সামাল দেওয়া গেলেও, পুরোপুরি মিটলো না।  আরো সমস্যা দেখা দিলো ১৮৫৫ সালে – যখন ব্রাদার ফ্রান্সিস ও আর্চবিশপ কেরিউ, দুজনেই কয়েক মাসের ব্যবধানে মারা গেলেন। তাই বড় কোনো সংগঠনের সঙ্গে এই স্কুল ও অর্ফেনেজ-এর পরিচালন ব্যবস্থাকে মিলিয়ে দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করার চেষ্টা চলতে থাকে।  কিন্তু  বিভিন্ন সময় এই সব চেষ্টায় তেমন ফল হলো না।  

শেষে ১৮৯০ সালে আইরিশ ক্রিস্চিয়ান ব্রাদার্স নিজেদের সংগঠনের শাখা খুললেন ভারতে। ভিন্সেন্ট ক্যাসে, ফাবিয়ান কেনেয়ালি, এডওয়ার্ড হর্ণে এবং আম্ব্রোস ফ্লিন – নামে চারজন  ব্রাদার আয়ারল্যান্ড থেকে এলেন কলকাতায়।   ক্যালকাটা ব্রাদার্স – তার ষোলজন (অন্য মতে আঠেরো জন) সদস্য নিয়ে মিশে গেল সেই বৃহত্তর সংগঠনে। সংগঠনের সদর দপ্তর হয় বর্তমান সেন্ট জোসেফ কলেজ এবং থাকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত । দায়িত্ব নিয়ে ভিন্সেন্ট ক্যাসে ক্যাথলিক স্কুলের নাম পরিবর্তন করে রাখলেন “ক্যাথলিক মেল অর্ফেনেজ”। 

ক্যালকাটা ব্রাদার্স তৈরী হওয়ার পরেই ১৮৫৩ সালে আর্চবিশপ কেরিউ দমদমে একটি বাগানবাড়ি কিনেছিলেন – ও সেটির নাম দিয়েছিলেন “সেন্ট জেভিয়ার’স রিট্রিট”।  সপ্তাহের শেষে ব্রাদার-রা  এখানে ছুটি কাটাতে আসতেন।  মৃতুর আগে সেই সম্পত্তি তিনি ক্যালকাটা ব্রাদার্সদের দান করে যান।  যা পরবর্তীকালে সাংগঠনিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিশ্চিয়ান ব্রাদার্স সংগঠনের সম্পত্তি হয়ে যায়।  এই ভাবেই শুরু হয় বর্তমান ১০৩ দমদম রোডের সঙ্গে ক্রিশ্চিয়ান ব্রাদার্সদের সম্পর্ক। 

তবে দমদমে স্কুল স্থাপন, সেন্ট মেরিজ নামকরণ ও তার বিবর্তনের গল্পটা আর একটু বাকি আছে।

১৯১৬ সালে কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট -এর পক্ষ থেকে ক্যাথলিক স্কুলের জমি অধিগ্রহণ করার কথা বলা হয়।  ব্রাদাররাও বুঝে যান যে এখন থেকে পরিকাঠামো গুটিয়ে নিতে হবে ভবিষ্যতে।  বিকল্প জায়গার সন্ধানে একবার ঠিক হয় যে আসানসোলে (বর্তমানে যেখানে সেন্ট ভিন্সেন্ট’স স্কুল আছে, সেখানে) সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে স্কুল এবং অর্ফেনেজ।  তবে এই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয় নি। 

তারপর ১৯৪১ সাল।  প্রাথমিক পরিকল্পনার বদল ঘটিয়ে দমদমের বাগানবাড়িটির জায়গায় শুরু হলো স্কুল তৈরির কাজ।  পুরোনো ভিলাটি ভেঙে তার জায়গায় শুরু হয় একটি দোতলা স্কুল বাড়ি   নির্মাণ।  সামনের পুকুরটি বুজিয়ে তৈরী হয় খেলার মাঠ।  ১৯৪৩-এ কাজ আবার বন্ধ হয়ে যায় অর্থের অভাবে।

এই সময় সেন্ট জোসেফ কলেজে ফাদার গ্রীন নামে এক পাদ্র্রী ছিলেন।  উনি সমস্যাটি কথা শুনলেন এবং সমস্যা সমাধানে Our Lady of Perpetual Soccour-এর কাছে বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থা করলেন। এর পরের অংশটি প্রথম জানার পর আমার খুব অদ্ভুত লেগেছিল।  বিভিন্ন এদেশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে যেমন মানত করার প্রথা আছে , সেই রকম এক মানত বা উদ্দেশ্য পূরণের জন্য প্রতিজ্ঞা করা হয় সেই প্রার্থনা সভায়।  সকলে প্রতিজ্ঞা করেন যে স্কুল বাড়িটি যদি নির্বিঘ্নে সম্পূর্ণ করে যায়, তবে নতুন প্রতিষ্ঠাটির নাম মাদার মেরির নামেই করা হবে।  

কাকতালীয় বলুন আর সংযোগ-ই বলুন, এই প্রার্থনা সভার পর দ্রুত পট পরিবর্তন হতে থাকলো।  বিশ্বযুদ্ধের জন্য মিত্র শক্তির অংশ হিসাবে আমেরিকান বাহিনী পা রাখলো কলকাতায়।  তাদের থাকার জায়গা দরকার।  ক্রিশ্চিয়ান ব্রাদার্সদের পক্ষ থেকে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। তারা দমদমের অসমাপ্ত পরিকাঠামো গড়ে তুলতে রাজি হলেন।  বিনিময়ে সেনাকে সেখানে থাকার অধিকার দেওয়া হলো  যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ছয় মাস সময় পর্যন্ত।  দুই পক্ষের চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ হলো ১৯৪৩ সালে।  আর সেনা সরে গিয়ে ব্রাদারদের হাতে স্কুলের অধিকার তুলে দেওয়া হয় ১৯৪৬ সালে।  আমেরিকান সেনার তৈরী সেই ব্যারাকই স্কুলের “ওল্ড বিল্ডিং”। 

সেই বছর আগস্ট মাসে শুরু হলো ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।  উন্মত্ততার সেই তান্ডব থেকে রেহাই পেলো না মুরগিহাটার ক্যাথলিক মেল অর্ফেনেজ । ব্রাদার ও বড় বোর্ডাররা যা পারলেন সরিয়ে নিয়ে এলেন দমদমের আস্তানায়। সঙ্গে ছোট ছোট ছেলেরাও প্রাণ বাঁচাতে উঠে বসলো জনৈক মিঃ হিলডথ-এর ব্যবস্থা করা ট্রাকে।  প্রায় একশতাব্দী ধরে একদল একনিষ্ঠ সমাজকর্মীর ত্যাগ তিতিক্ষা ও ভালোবাসায় গড়ে তোলা সংগঠনটি এক রাতে শেষ হয়ে গেল।  সেই আগুনের ছাই থেকেই Sphinx-এর মতো উঠে দাঁড়ালো দমদমে স্কুল।  ১৯৪৭ সালে সরকারিভাবে ২০০ জন বোর্ডার এবং দমদম এলাকার স্থানীয় কয়েকজন ডে-স্কলারকে নিয়ে শুরু হলো দমদমের নতুন স্কুল। সেই পুরোনো প্রতিজ্ঞা অনুসারে নাম হলো “সেন্ট মেরি’জ অর্ফেনেজ এন্ড ডে স্কুল”। ব্রাদার বার্ট্র্যান্ড লার্কিন হলেন স্কুলের প্রথম সুপিরিয়র।   

যে স্কুলে পড়েছি ১১ বছর, সেই স্কুলের ইতিহাস জানার ইচ্ছাই কোনোদিন দেখা দেয়নি।  স্কুল ছাড়ার প্রায় পঁচিশ বছর পর ব্রাদার ফার্নান্দেজ মূলত তথ্যগুলি দিয়েছিলেন।  দিয়েছিলেন ক্রিশ্চিয়ান ব্রাদার্স ও এডমন্ড রাইস ফাউন্ডেশনের কিছুর স্মারক পুস্তিকা থেকে কিছু ঘটনা, সাল ও তারিখ টুকে নেওয়ার সুযোগ করে – যার মধ্যে ছিল একটি  বহু পুরোনো বইয়ের হলদে হয় যাওয়া পৃষ্ঠা, নাম “Fifty years in India”। এছাড়াও ক্রিশ্চয়ান ব্রাদার্সের সংগঠনের বিভিন্ন ওয়েবসাইটের সাহায্য নিয়েছি।

তথ্যগুলি আমার কাছে পড়ে ছিল তাও প্রায় ছ’-সাত বছর হবে। লেখা হয়নি।  এবার দমদমের ইতিহাস নিয়ে কাজটা শুরু করার পর মনে হলো যে ১০৩ দমদম রোডের এই গল্পটা ছাড়া দমদমের ইতিহাস কী করে সম্পূর্ণ হবে ?  এও যে বাগানবাড়ির বিবর্তনের আরেক ইতিহাস ! তার মধ্যেই স্কুলের সিনিয়র ব্রতদা (কৌশিক ব্রত দে) জোগাড় করে দিলেন প্রাক ১৯৪১ সালের কোনো এক সময়ের পুরোনো সেন্ট জেভিয়ার রিট্রিটের ছবি।  

সামগ্রিক ভাবে ইতিহাস সম্পর্কে সচেতনতার যে অভাব আমার ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে, তার খানিক প্রায়শ্চিত্ত করার এই প্রয়াস।  লেখার কোথাও কোনো সমস্যা থাকলে বলবেন, সংশোধন করে নেবো । 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s