নাখোদা মসজিদ এলাকায় রমজানের আনন্দ বাজার

নামাজের আজানের ডাক আসতে আরও খানিকটা সময় বাকি আছে। তুমুল ব্যস্ততা পরপর খাবারের দোকানগুলিতে। ইফতারের আয়োজন গুছিয়ে নেওয়ার জন্য গৃহস্থের ভিড়। মসজিদের উল্টোদিকে খাবারের হোটেলগুলি ফুটপাথের উপর অস্থায়ী আযোজন করেছে এই ভিড় সামাল দিতে। তাতেও হিমশিম খাচ্ছে দোকানিরা। খাবারের দোকান গুলির পরেই পোশাকের দোকান। মাঝে সুর্মা-আতরের দোকানগুলির** অস্তত্বিতে এই আনন্দ বাজারের শোভা যেন আরও খোলতাই হয়েছে।

এই রমজানের মাসে ধর্মপ্রাণ মানুষ উপবাস ভাঙার সময় ইফতার করেন। আর সেই সময় হরেক খাবারের যোগান দেওয়ার জন্য বসে এই খাবারের মেলা। এমনিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসবাস যে সব এলাকায়, সেখানেই এই উৎসবের মাসে এমন খাবারের পসরা বসে বিকেল নাগাদ। তবে মধ্য কলকাতার নাখোদা মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় সেই খাদ্য উৎসবের ব্যাপারটাই কিংসাইজ। দোকানের সংখ্যা, পদের বৈচিত্র আর মানুষের উৎসাহের নিরিখে বোধহয় সবথেকে জমজমাট হাট।

তবে শুরুতেই একটি সতর্কীকরণ। পিটপিটে স্বাস্থ্যসচেতন আর নিখাকি টাইপ লোকের জন্য এই মেলা সঠিক জায়গা নয়। এই মেলার মজা পেতে, খাবার সংক্রান্ত সব ভয়, সংস্কার আর পূর্বধারণা বাড়িতে রেখে আসলোই ভালো। মেট্রোয় এম.জি. রোড স্টেশনে নেমে নাখোদা মসজিদের দিকে হাঁটতে শুরু করার সময়েই প্রথম কর্তব্য হলো ” to throw caution to the wind “!!

ইফতারের খাবার হিসাবে প্রথমেই মনে হবে হালিম-এর কথা। গম, নানা রকম ডাল আর মাংস দিয়ে তৈরি একটি উপাদেয় ও পুষ্টিকর খাবার। কিন্তু হালিমের যে এতো রকমফের আছে, সেটা তো জানতাম না ! বিভিন্ন দোকানের হালিমের স্বাদ বর্ণ গন্ধ আলাদা রকম। আপনার স্বাদ আর রুচি মতো বেছে নিতে হবে। কোনো দোকানের হালিমে মশলা ঝাল একটু কম। সাদা (flat) স্বাদ। কখনও সেই স্বাদ বেশ ঝালখোর বাঙালি জিহ্বার অনুকূল। কোথাও ডাল একদম গলিয়ে একটু গাঢ় গ্রেভি আবার অন্য কোথাও ডালের দানাগুলি দাঁতে পড়ে। মাংসের ব্যবহারেও তারতম্য। বেশিরভাগ জায়গায় মাংসের কিমা ব্যবহার হয়; কিন্তু এক দোকানে দেখলাম বেশ বড় মাংসের টুকরো সাঁতার থাকছে গ্রেভিতে।

নানারকম ভাজাভুজির শব্দে আর গন্ধে ম ম করছে বাতাস। নিরামিষ ফুলুরি, পাকোড়ার পাশে দেখলাম পালং শাক বেসনের batter-এ ভাজা হচ্ছে। সেটাও খানিক খাওয়া হলো। তবে বেশ আশ্চর্য্য লাগলো মাছ ভাজার পদ্ধতি দেখে। মশলায় মাখানো বিভিন্ন সাইজের কাঁচা মাছের টুকরো বিক্রি হচ্ছে ওজনে। আপনার পছন্দ মতো পিস্ দোকানদার ভেজে দেবেন ছাঁকা তেলে ! কাতলা মাছের চাহিদাই বেশি তবে এক-দু জায়গায় চিংড়ি ভাজাও নজরে পড়লো। একই ভাবে ভাজা মুরগিও বিকোচ্ছে দেদার। এছাড়াও মুরগির হাজার পদ বিক্রি হচ্ছে। আমরা মালাই চিকেন নামে একটা পদ টেস্ট করলাম। হাঁড় ছাড়া মুরগির ভাজা মাংস ফ্রেশ ক্রিম আর মশলায় মাখা হয়ে সামনে এলো। তারপর, যেমন লোকে বলে – বাকিটা ইতিহাস !!

এছাড়াও হাল্কা স্বাদের চ্যাপ্টা সিঙ্গারা নজর কাড়লো। সাধারণত আমরা দেখি যে ঠান্ডা তেলেই কাঁচা সিঙ্গারাগুলো ছাড়া হয়। তারপর ধীরে ধীরে তেল গরম হয় আর ভাজা হতে থাকে সিঙ্গারা। এখানে কিন্তু গরম তেলেই ছাড়া হচ্ছে। তাই বাইরের খোলটা খুব তাড়াতাড়ি কড়া ভাজা হয়ে যাচ্ছে – কিন্তু ভেতরের খোসা শুদ্ধ আলুর হালকা স্বাদের পুর থেকে যাচ্ছে নরম।

এই খাদ্য সরণি আবিষ্কারে এলাম বলেই না জানতে পারলাম যে ফিয়ার্স লেনের এক কোনায় সারা বছর পাওয়া যায় এক আশ্চর্য রকমের কাবাব। মাংসের বারিক মিহি মশলাদার কিমায় ছাতু বা অন্য কোনো binder মেশানো হয় না। তাহলে সেঁকার জন্য শিকের গায়ে কিমা ধরে কি করে? সেটাই মজা। হ্যাঁ, সুতো দিয়ে শিকের গায়ে জড়িয়ে রাখা হয় সেই মিহি কিমা – আর তাই এই কাবাবের নাম – সুতি কাবাব !! শুধু মাংস আর মশলার স্বাদ পাবেন জিহ্বায়। আপনার আর কাবাবের মধ্যে নেই কোনো ফোঁপর দালাল। পেঁয়াজ আর পাতিলেবু সহযোগে এই দোকানটি একশ’ বছরের বেশি সময় ধরে এই স্বর্গীয় কাবাব পরিবেশন করছেন শহরবাসীকে।

আরও একটা জিনিস দেখলাম, আর নিয়ে এলাম বাড়ি। “বাখরখানি রুটি” । নানারকম রুটির মেলায় মিলে গেলো সেই রূপকথার সোনার কাঠি। দুধ, ক্ষীর আর নানা উপাদানে তৈরি, যত্নে সেঁকা রুটিগুলি তিন-চারদিন আরামসে রাখা যায়। একটু মিষ্টির দিকে স্বাদ। কোনো ঝাল গ্রেভির সঙ্গে দারুন মানানসই হবে। এমনিও খাওয়া যায়।

লেখাটা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। আর বিশেষ কথা বাড়াবো না। উৎসাহীরা নিজেরাই দেখে শুনে বুঝে আসুন। শেষ করি মিষ্টি দিয়ে। ফিরনি আর শাহী টুকরা তো পাওয়া যাচ্ছেই। তার সাথে গরম গরম অমৃতি আর খুদে জিলিপিও আছে। একটি শতবর্ষ প্রাচীন মিষ্টির দোকান দেখলাম – যেখানে ক্ষীর আর ড্রাই-ফ্রুটস খোলামকুচির মতো উড়ছে। সেই দোকানটার টানেই আরেকবার যেতে হবে।

আরও একটা আচানক জিনিস ফুটে বিক্রি হচ্ছে। রোলার ফ্রুট আইসক্রিম। একটা বড় আইসক্রিম স্ল্যাব ঘুরে চলেছে – যার উপর নিয়মিত বিভিন্ন রকমের সিরাপ দেওয়া হচ্ছে। তার থেকেই গ্রেট করে আইসক্রিম পরিবেশন করা হচ্ছে । দোকানের সামনে মাছির মতো নানা বয়সের খদ্দেরদের ভিড় থেকেই মালুম হচ্ছে এই আইসক্রিমের জনপ্রিয়তা ।

আজ খাওয়ার দিকে মনযোগ দেব বলে ক্যামেরা নিয়ে যায়নি। সব ছবি মোবাইলে তোলা। তার মধ্যে খানিক হেরিটেজ হান্টিংও হয়ে গেল। বদন রায়ের বাড়ি ও মন্দির আর শ্রীরামকৃষ্ণের পদধূলি ধন্য ধর-বাড়ি দেখা হলো। দেখা হলো সেলিম মঞ্জিল, যে বাড়িতে গহরজান থাকতেন।

সাড়ে চারটে থেকে তিন – সাড়ে তিন ঘন্টা যে কথা দিয়ে কেটে গেলো, মালুম পেলাম না। প্রায় আটটা বেজে গেছে। খেয়ালই করিনি। বাড়ির জন্য খাবার কিনেছি। এবার ফেরার তাড়া। ১৫-ই জুন পর্যন্ত সময় আছে। ঘুরে আসুন। একলা নয়, দল বেঁধে যান – খাবার ও খরচ দুই-ই ভাগ করা যাবে। তাতে সুবিধে হবে।

এই আনন্দ বাজারে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল অনেকদিন – কিন্তু সুযোগ হচ্ছিল না। আজ ‘গুগুল’ অর্পিতার সহযোগিতা আর উৎসাহে সেই সুযোগ হয়ে গেলো। মহিলার পুত্রটি একটু বড় হলে মনে হয় বুক ঠুকে বলতেই পারে – “আমার মা সব জানে !!!!”

(সুর্মা – আতর আর মিঠাইয়ের দোকান সারা বছর থাকে।)