মধুপর্ক

আর্য্য সভ্যতার প্রথম যুগে অতিথি সেবার জন্য বছর দুয়েক বয়সের গরুর মাংসকে অতি উপযোগী বলে মনে করা হতো। বৈবস্বত মনুর পুত্র পুষধ্র নামে রাজার যজ্ঞে অজস্র গো বধ করার ফলে অতিসার রোগের (পেটখারাপ, ডায়েরিয়া, ডিসেন্ট্রি) আবির্ভাব হয়। তখন থেকে গো বধ নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু হলো। ঋগ্বেদের নিষেধ বাক্যটিতে (৮/১০১/১৫) বলা হয় যে – এই গাভী রুদ্রগণের মাতা, বসুগনের দুহিতা, আদিত্যগণের ভগিনী এবং অমৃতরূপ দুগ্ধ, ঘৃত প্রভৃতির জন্মস্থান। যাদের জ্ঞান আছে, সেই প্রজ্ঞাবান সজ্জনদের আমি এই কথা বলছি – এই নিষ্পাপ অদিতিকে তোমরা বধ করো না। কালক্রমে বিভিন্ন কারণে গোমাংস ভোজন একেবারে উঠে গেল, কিন্তু প্রাচীন নিয়মের কিছু কিছু চিহ্ন রয়ে গেল আমাদের ধর্মীয় – সামাজিক আচারে।

বিয়ের সময় মধুপর্কের অনুষ্ঠান শেষ হলে প্রথা অনুযায়ী নাপিত বরকে জিজ্ঞেস করে ” ওঁ গৌ র্গো গৌরঃ ” বর উত্তর করেন “না”। এই আচারটির মূল সেই পুরোনো প্রথায়। প্রাচীন কালে মাংস ছাড়া মধুপর্ক হতো না। আর মধুপর্কের জন্য গো মাংস ছিল প্রশস্ত। বর আসার সময় একটি গাভী বেঁধে রাখা হতো। আর মধুপর্কের অনুষ্ঠানের শেষে সম্প্রদাতা গাভীটি ও একটি খড়গ নিয়ে বরকে এই প্রশ্নটিই করতেন। ইচ্ছে হলে বর বলতেন “হ্যাঁ ” অথবা “না”। বর্তমানে বর সবসময় “না” বলেন – আর তারপর শুরু হয় নাপিতে ছড়া, যাকে বলে “গৌর বচন” !!

মধুপর্ক তৈরি হয় সোনার, রুপার অথবা কাঁসার পাত্রে ঘি, দই, মধু , শর্করা, জল, একত্রিত করে, মন্ত্রেই বলা আছে জল কম দেওয়ার জন্য। বিয়ের অনুষ্টান ছাড়াও পুজোতেও মধুপর্ক তৈরী হয়। অনেকে মনে করেন যে বিয়ের অনুষ্ঠানে নারায়ণ আসেন, তাই মেয়ের বিয়েতে নিরামিষ পদ দিয়েই অতিথি সেবা করা হয়। যেমন শোভাবাজারের দেববাড়ির প্রথা।

সেদিন শোভাবাজার গিয়েছিলাম একটা জায়গার খোঁজে । সেই খোঁজাখুঁজির মধ্যে পেয়ে গেলাম শোভাবাজারে মহারাজ নবকৃষ্ণের সাবেক বাড়ির পেছনেই শতাব্দীপ্রাচীন চিত্তরঞ্জন মিষ্টান্ন ভান্ডার (হিসেবে মতো ১১১ বছর)। হালকা মিষ্টির স্পঞ্জ রসগোল্লার জন্য বিখ্যাত এই দোকানে বিক্রি হচ্ছে মধুপর্ক। চারটি ফ্লেবারে। একটি করে সব কটি ফেভার চেখে দেখলাম। বেশ ভালো। না না, খুব ভালো – দারুন ভালো !! সময় সুযোগ করে খেয়ে আসুন। 
(তথ্যসূত্র : 
• বিয়ের শব্দকোষ হরিপদ বণিক সম্পাদিত 
• বিশ্বকোষ, প্রথম খণ্ড – শ্রীরঙ্গলাল মুখোপাধ্যায় ও শ্রীত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় সঙ্কলিত।