শীতের ভোরে স্বাদের ওম – ‘সুফিয়া’-র নিহারী

জাকারিয়া স্ট্রিট আর রবীন্দ্র সারণির ক্রসিংয়ে কয়েকটা কুকুর ছাড়া আর কোনো প্রাণী নেই। দিনের অন্য সময় যে চরম ব্যস্ততা দেখা যায় – তার থেকে কয়েকশো যোজন দূরের এক কাল্পনিক জগৎ যেন। নাখোদা মসজিদের গেট বন্ধ। আধো অন্ধকারে সেই বিখ্যাত ফোয়ারাগুলো নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে মায়াবী চাতালে। একটু এগিয়ে ফৌজদারি বালাখানা যেন এক ভুতুড়ে বাড়ি। খোদাবক্স নবী বক্সের দোকানের ঝাঁপ বন্ধ। এক অলীক মায়াতরুর ডালপালা ছায়া ফেলে তিন শতকের পুরোনো রাস্তায়।

সাড়ে তিনটে থেকেই যেন একটু নড়াচড়া শুরু হলো। সুফিয়ার সামনে যে ভিখিরি শুয়ে ছিলেন,, তিনি উঠে চলে গেলেন। তার কিছুক্ষন পরেই খুলল দোকানের ঝাঁপ। দোকানের কর্মীরা প্রথমে জল নিয়ে এলেন। ধোয়া হলো দোকান আর সামনের জায়গা। এর পর ডালপুরির ময়দার তাল ভরা পরাত এলো মানুষের মাথায় চড়ে। ওদিকে আরও কয়েকজন শুরু করে দিয়েছেন ময়দার লেচিতে ডালের পুর ভরতে। ভোরের অন্ধকার ভেদ করে প্রথম আগুন পড়লো ফুটপাথের চুলায়। একজন দুজন করে খদ্দের জমায়েত হতে শুরু করে। সবই বাইক আরোহী ছেলে ছোকরার দল। তার মধ্যে দুই বুড়ো – অনেকটা সিং ভেঙে বাছুরের দলে ভিড়ে যাই।

আরও মিনিট দশেক পরে চার বেহারার কাঁধে চড়ে তিনি এলেন। যার প্রতীক্ষায় এই শীতের ভোরে অভিযানে বেরিয়েছে এতো লোক। হাঁড়ির ঢাকনা খুলতেই ধোঁয়ায় ভরে যায় চারদিক। নিহারীর খুশবুতে ভরে ওঠে ভোরের বাতাস।

নাখোদা মসজিদে ফজরের আজান শুরু হতেই গরম তেলে ঝপ করে পড়ল ডালপুরির প্রথম দফা। সুফিয়ার সব আলো জ্বলে ওঠে। আর কোথা থেকে যে অন্ধকার ভেদ করে এক গাদা মানুষ ছেঁকে ধরে সেই দেবদুর্লভ সুরুয়ার হাঁড়ি – যার মধ্যে দশ-বারো ঘন্টার ধরে ঢিমে আঁচে মাংস সুসিদ্ধ হয়ে তৈরি হয় নিহারী। শীতের কুয়াশা আর নরম রোদের মতো আরেক মরশুমি আজুবা। গ্যাস্ট্রোনোমিক ডিলাইট, যার টানে ভোর তিনটে থেকে লাইন দেয় মানুষ, কারণ পাঁচটা, সাড়ে-পাঁচটার পর আর পাওয়া যায় না।

ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশে খুব জনপ্রিয় প্রাতরাশ। ফারসি ভাষার নিহার শব্দটির অর্থ সকাল, এই খাবারটি সকাল বেলার নাস্তাতে খাওয়া হয় বলে এহেন নামকরণ করা হয়েছে।** এই শহরেও এর জনপ্রিয়তার আন্দাজ পাই যখন দেখি – গত বছরে ১০০/-র নিহারী এবছর ১৫০/-য় বিক্রি হচ্ছে !!!

নিহারীর জন্মস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যায় না। কেউ বলে হায়দ্রাবাদ আবার কেউ বলে আওয়াধের নবাবী রসুইখানায় এর জন্ম। আবার কেউ বলেছেন নিহারীর দেশ নাকি গালিবের দিল্লি। সেই তর্কে না ঢুকে বরং নিহারীর ঝোলে ডালপুরি চুবিয়ে মুখের ভেতর চালান করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই না ?

===========================
অথ নিহারী কথা
সুফিয়া ; জাকারিয়া স্ট্রিট / বিফ নিহারী / ১৫০/- প্রতি প্লেট। রোববার বেশি চাপ থাকে , তাই ভোর চারটে পর গেলে আর পাবেন না। 
ঋণ স্বীকার – সুজন এবং দু’জন অর্পিতা

==========================
তথ্যসূত্র : **ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী (২য় খন্ড)