সিঙ্গারা

আচ্ছা কবিগুরু কি “সিঙাড়া”র কথা ভেবেই লিখেছিলেন – তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে” ?

এমন অদ্ভুত কথা কেন মনে হলো সেটা বলি। ময়দার খোলের ভেতরে ঠাসা পুর। ডোবা তেলে ভাজা। ব্যাস ! এই সাধারণ জিনিসটার মধ্যেই যেন ধরা আছে আসমুদ্র হিমাচলের জীবনের মূল সুর। ভারত এক খোঁজ-এর ইতিহাস।

রবিবাবুর শৈশবের জোড়াসাঁকো এলাকার সামগ্রিক চরিত্র আজ অনেটাই বদলে গেছে। তাই ওই এলাকায় যে সিঙাড়া পাওয়া যায় সেটা ঠিক কলকাতার বাঙালি সিঙাড়া নয়। উত্তর ভারতের সামোসা অনেকটাই কোনঠাসা করে ফেলেছে সাবেক সিঙাড়া-কে। এই শহরের আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।

বাগবাজার এলাকার কিছু দোকানে এখনো পাওয়া যায় বাঙালি সিঙাড়া। বাইরের খোলাটা হয় তুলনামূলকভাবে পাতলা আর ভেতরে থাকে খোসা সমেত আলুর পুর। সামোসার তুলনায় ঝাল, নুন, মশলা সবটাই হালকা, mellow। আলুর টুকরোর সঙ্গে দৈবাৎ একটা দুটো বাদাম আর শীতকালে তার সঙ্গে ফুলকপির মাখো মাখো স্বাদ গন্ধ। ছোটবেলা থেকে এই রকম সিঙাড়া খেয়ে এসেছি। এখন বেশির ভাগ দোকানেই যে সামোসা বিক্রি হয়, সেই বস্তুটির ভেতরের পুর যে কি দিয়ে তৈরী, তা দেখে চেনা মুশকিল। বহুত্ব ও স্বতন্ত্র চটকে প্রথম থেকে শেষ এক স্বাদ।

সামোসা বলুন বা সিঙাড়া – পন্ডিতরা বলছেন যে পদটি কিন্তু এদেশে এসেছে মধ্য প্রাচ্য থেকে। সভ্যতার উষা লগ্নেই হয়তো প্রথম তৈরী হয় এই সুখাদ্য। সে ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ফার্সি-তে পদটি “সাংবোসাগ” নামে পরিচিত ছিল, যার থেকে সামোসা তারপর সিঙাড়া এসেছে। একাদশ শতকে গজনীর সুলতানদের দরবারে এই পদটি রাজকীয় খাদ্যসম্ভারের অংশ ছিল বলে জানিয়ে গেছেন আবুল ফজল বাইহাকী। বিভিন্ন রকমের বাদাম, ড্রাইফ্রুট আর মাংসের কিমা দিয়ে তৈরী পুর ভরে ভাজা হতো। তাকিকিস্তানের মেষ-পালকদের কাছে পৌঁছুতে পৌঁছুতে কাজু কিসমিসের মেওয়া হারিয়ে মাংসের কিমা ভরা সাধারণের খাবারে পরিণত হল এই রাজকীয় খানা।

তারপর হিন্দুকুশ পেরিয়ে বিভিন্ন ভাগ্যন্নেষী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে উত্তর ভারতের এসে পৌঁছয় সাবেক সামোসা। গঙ্গার অববাহিকা অঞ্চলে পৌঁছে মাংসের পরিবর্তে সবজি, পনির দিয়ে তৈরী হতে শুরু করলো সামোসা। ধনে, জিরে, গোলমরিচ, আদা-র মতো মশলা যোগ হয়ে খাঁটি ভারতীয় হয়ে উঠলো সে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অঙ্গীভূত করে ভারতের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়লো। প্রত্যেক রাজ্যে – তার আলাদা স্বাদ। কোথাও সিঙাড়ার মধ্যে পনিরের পুর আবার কোথাও পুর মানে চাউমিন (হ্যাঁ সিঙাড়ার মধ্যে চাউমিন পুর!!)। একজনের কাছে শুনলাম যে দিল্লিতে নাকি চকলেট সামোসাও পাওয়া যায়। অবশ্য মিষ্টি ক্ষীরের সিঙাড়া তো আমরা সেই ছোটবেলা থেকেই খেয়ে এসেছি !

আমরা সিঙাড়ার সঙ্গে চাটনির কথা আগে শুনিনি। কিন্তু নানা জায়গায়গায় এর সঙ্গে যে চাটনি দেওয়া হয় সেটাও বিভিন্ন ধরেনের হতে দেখেছি। জবলপুর অঞ্চলে দেখেছি সামোসার সঙ্গে তেলে হালকা করে নরম করে নেওয়া কাঁচা লংকা দেওয়ার রেওয়াজ।

আরও একটা ব্যাপার খেয়াল করার মতো। আজ সিঙাড়ার মধ্যে যে আলুর পুর দেখতে আমরা অভ্যস্ত, সেটাই বা কত পুরোনো ? ইতিহাস বলে যে বাংলায় আলুর চাষ জনপ্রিয় করার প্রথম চেষ্টা শুরু হয় কলকাতায় এগ্রি-হর্টিকালচারেল সোসাইটি স্থাপনের পর, কেরি সাহেবের উদ্যোগে। তার আগে কি বাঙালি কি সিঙাড়া খেত ?

আগের আলোচনা থেকে এমন একটা ধারণা হতে পারে যে ভারতে এসে সিঙাড়া বোধহয় তার আমিষত্ব হারালো চিরতরে। এমনটা কিন্তু নয়। ইব্ন বতুতা এই আমিষ সিঙাড়ার একটি রূপ দেখেছিলেন মুহম্মদ বিন তুঘলকের শাহী ভোজসভায়। তার একটি বিবর্তিত চেহারা আজও “লুখমি” নামে প্রসিদ্ধ হায়দ্রাবাদ অঞ্চলে, যার মধ্যে মাটন কিমা ব্যবহার করা হয়। তবে সেটি দেখতে আয়াতকার; তিনকোনা নয়।

পাঁঠার মাংসের কিমা ভরা সিঙাড়ার কথা শুনেই অনেকের প্রাণ আনচান শুরু হতে পারে। ছাগল বা পাঁঠার মাংস যে বাঙালির বড় প্রিয়। সেই কবে ঈশ্বর গুপ্ত লিখে গেছেন – “রস ভরা রসময় রসের ছাগল / তোমার কারণে আমি হয়েছি পাগল।” এই কলকাতা শহরেই কয়েকটি দোকানে পাওয়া যায় মাংসের সিঙাড়া। কাছাকাছির মধ্যে সাবেক রূপবাণী সিনেমার একটু আগে বিধান সারণির উপর পূর্বাণী রেস্টুরেন্ট। খুব বেশি হলে গোটা চল্লিশেকের মতো সিঙাড়া ভাজা হয় – শুধু রোববার, সকালে। আটটা সাড়ে-আটটার মধ্যে পৌঁছে গেলে পেয়ে যাবেন। একটু বেলা হলেই কিন্তু মিস্।

খবর পাওয়ার পর রোববার দেখে পৌঁছে গেলাম জায়গা মতো। ঘড়িতে সাড়ে আটটা প্রায় বাজে। আমার পেছনেই পর পর কয়েকজন ঢুকলেন – সকলের মুখেই মাংসের সিঙাড়ার চাহিদা। বাড়ির জন্য কয়েকটা প্যাক করে নিলাম। আর একটা সিঙাড়া নিয়ে বসলাম রেস্টুরেন্টের একটা কোনায়। এক এক কামড়ে যেন ভারতের স্বাদ পাচ্ছিলাম। প্রায় হাজার বছরের ইতিহাস – এই দেশের পর-কে আপন করার মানসিকতা, তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা, তার বহুত্ববাদ – সব যেন এই এক সাধারণ চটজলদি খাবারের সঙ্গে মিশে আছে। মনে হচ্ছিল – যেন সার্থক ভারতীয়ত্বের রূপায়ণ যদি কোনো খাবারে পাওয়া যায়, তবে – হামিনাস্তও হামিনাস্তও হামিনাস্ত।