নারকেলের সন্দেশ

মোমবাতি গুলো আজ কিছুতেই জ্বলছিল না। আমার মতো আর কাউকেই দেখলাম না দমকা হওয়ার সাথে কুস্তি করে মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। পাড়ায় সকলেই টুকটাক সুইচ টিপে টুনি লাইট জ্বালিয়ে ঘরে ঢুকে পড়লো।

গুটিগুটি পায়ে কার্তিক মাস এসে পড়লো বাংলা ক্যালেন্ডারের পাতায়। আশ্বিন ফুরালো। ফুরালো বিজয়ার পর্ব। প্রণাম, নাড়ু, নিমকি আর কোলাকুলির জন্য আরও এক বছর অপেক্ষা। কিন্তু ততদিনে কত কিছুই তো বদলে যাবে। তাই না? 

লক্ষ্মী পুজোর পরেই দূরের আত্মীয়রা আসতেন বাড়িতে বিজয়া করতে। আমরাও যেতাম, যে দু-এক জায়গায় যাওয়ার মতো ছিল। সামাজিকতা রক্ষা করায় বাবা কোনোদিনই খুব পটু নন। তাই পিসির শ্বশুর বাড়িতে বিজয়া করতে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিতে হতো। পিসির শ্বাশুড়ি মা যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন চালু ছিল আমাদের বিজয়া করতে খিদিরপুর যাওয়া। দমদম থেকে ধর্মতলা, তারপর ১২/বি বাসে খিদিরপুর পানবাজার। সেখান থেকে হেঁটে পদ্মপুকুর স্কোয়ার। যাওয়ার পথে গল্প শুনতাম – এই জায়গার নাম কবিতীর্থ। বনেদী পাড়া। মাইকেল, রঙ্গনাথ, হেমচন্দ্র এই পাড়ায় থাকতেন। 

দোকানের কেনা মিষ্টির থেকে বাড়িতে তৈরী জিনিস নিয়ে গেলে বেশি পছন্দ করতেন রাজলক্ষ্মী দেবী, আমার ছোট পিসির শ্বাশুড়ি মা। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারের গিন্নি। সেকালের পুরোনো পলেস্তারা ওঠা ইয়া মোটা থামওয়ালা একটা বাড়ির দোতলার কোনের ঘরে থাকতেন বৃদ্ধা। কিন্তু কি সুন্দর। ধবধবে সাদা থান পরতেন। পানের রসে লাল ঠোঁট। একটা দারুন কাজ করা পালঙ্কের উপর বসে থাকতেন রাজরানীর মতো। সেই পালঙ্কে উঠতে হতো দুটো সিঁড়ি বেয়ে।

মা প্রণাম করে উনার হাতে তুলে দিতেন একটা গোল টিফিন কৌটো। জিজ্ঞেস করতেন – ‘কি এনেছো? নারকেল ছাপা?’ 
তারপর গৃহসেবককে ডেকে বলতেন – ‘গীতশ্রীর দাদা বৌদি নারকেল ছাপা এনেছে। আমাকে এর থেকে একটা দে আর বাকিটা তুলে রাখ। আমি একটা খাই, ওরা দেখে যাক। ‘

টুকটাক আর কিছু সৌজ্যমূলক আলাপ সেরে আমরা চলে আসতাম পিসির ঘরে। আমার ফেরার সময় বলে আসা। মিষ্টি হেসে বলতেন – ‘আবার এসো। নারকেল ছাপা খুব সুন্দর হয়েছে। আমি খুব খুশি হয়েছি। ‘

মা বোধহয় ওই একটা কথা শোনার জন্যই সেই দমদম থেকে ঠেঙিয়ে খিদিরপুর যেত। আর এই বকের মতো সাদা সন্দেশ তৈরী করা কি কম ঝামেলা ? প্রথমে নারকেলের বাইরেটা এমন ভাবে পরিষ্কার করতে হবে যাতে কুড়োনোর সময় একটুও কালো না পড়ে। কুড়োতেও হবে খুব সাবধানে। তারপর উনুনে আঁচ কমিয়ে কড়াইতে দেওয়া হবে কুড়োনো নারকেল, চিনি দিয়ে পাকানোর জন্য। (তখন আর কোথায় গ্যাস স্টোভ!) একমুহূর্তের জন্যও হাত থামানো চলবে না। তাহলেই কড়াইয়ের নিচে ধরে গিয়ে লালচে হয়ে যাবে। এর পর সেই চিনি পাকানো নারকেল শিল-নোড়ায় পিষে মিহি করতে হবে। সেই মিহি মন্ড ছাঁচে ফেলে তুলতে হবে নারকেলের সন্দেশ। এক হাতে এতো কিছু করে তারপর দুপুর দুপুর ৩সি/১ বাসে চেপে বসা, গন্তব্য খিদিরপুর।

সামান্য নারকেলের সন্দেশ। তবু সেই সন্দেশের ছাঁচের মধ্যে কতজনের জীবনের আল্পনা। আমাদের বাড়িতে যে সব ছাঁচ আছে, তার মধ্যে অনেকগুলিই আরেক বৃদ্ধার হাতে তৈরী। তখন আমরা নিয়মিত শ্রীহট্ট সম্মিলনীর অনুষ্ঠানে যেতাম। সেখানে নারকেলের সন্দেশ, ক্ষীরের সন্দেশ আর এই সব ছাঁচ বিক্রি করতেন এক বৃদ্ধা। অল্প বয়সে একটি মেয়ে নিয়ে বিধবা হয়েছিলেন। তারপর দেশ ভাগ। পুঁজি বলতে ওই পিঠে সন্দেশ বানানোর জ্ঞান। সেই পুঁজিকেই সম্বল করে বিভিন্ন সম্পন্ন দেশোয়ালী গৃহস্থ বাড়িতে সন্দেশ,পিঠে বিক্রি করতেন। আর বসতেন শ্রীহট্ট সম্মিলনীর অনুষ্ঠানগুলিতে নিজের পসরা নিয়ে। এই করে মেয়েকে ডাক্তার করেছিলেন। 

খুব ছোট থেকেই মায়ের হাতে হাতে কাজ করি। প্রথমে শখ ছিল। এখন হয়েছে প্রয়োজন। একা হাতে এখন আর পুরোটা করে উঠতে পারে না। বয়স তো আশি ছুঁইছুঁই। তবু খুব প্রিয় মানুষদের জন্য এখনো বিজয়ার পর সন্দেশ বানান। অপেক্ষায় থাকেন কেউ হয়তো আসবে। কিন্তু আজকাল কেউ আর আসে না। আমাকে দিয়েই পাঠিয়ে দেন তাঁদের কাছে, যাদের কাছে পাঠানো যায়। অনেকে প্রাপ্তিস্বীকার করেন, অনেকে ভুলে যান, নানা কাজে। কিন্তু আমি বুঝি, মা এখনো মুখিয়ে থাকেন একটা বাক্যের জন্য। – ‘নারকেল ছাপা খুব সুন্দর হয়েছে। আমি খুব খুশি হয়েছি।’

October 2017