মাখনলাল দাস অ্যান্ড সন্স – নতুন বাজার

২০০৭ সালে কলকাতার সল্ট লেক স্টেডিয়ামে ডাক্তারবাবুদের এক বিশাল সমাবেশ হয়। সেই আমলে রেজিস্ট্রেশন থেকে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ – পুরোটাই অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে সংগঠিত করা হয়েছিল। সমাবেশের তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত কাজে সংযুক্ত ছিলাম বেশ কয় মাস। সংগঠনের একজন কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন ডাঃ গীতা ব্যানার্জি। অফিসের কোনো কর্মীর কাজে ভুল হলেই হাঁক দিতেন – “ব্রেন কাজ করছে না। ব্রেনে সুগার দাও !” ব্রেনে চিনি দেওয়া মানে চিনি খাওয়া। অর্থাৎ – মিষ্টি খেলে বুদ্ধি খোলে।

আজন্ম মিষ্টির পোকা আমি। মিষ্টি খাওয়ার আরো একটা অজুহাত পেয়ে গেলাম। পরে ভাল করে বইপত্র ঘেঁটে দেখলাম যে মিষ্টির উপলব্ধতা ও গুণমানের সঙ্গে বাঙালিদের বুদ্ধিমত্তার দারুন একটা যোগ আছে। শুনবেন ?

দেখুন, যখন সন্দেশের দাম সের প্রতি দুই আনা বা তিন আনা – তখন দেশে রামমোহন, বিদ্যাসাগর বা মাইকেল মধুসূদন জন্মালেন। এর পর যখন দাম বেড়ে ছয় আনা আট আনা হলো, তখন আবির্ভাব হলো বিবেকানন্দ বা রবীন্দ্রনাথের। 
এরপরও যখন দাম বেড়ে সন্দেশের সের এক টাকা দেড় টাকা হলো তখনও জন্মালেন আচার্য সত্যেন বোস, মেঘনাদ সাহা, সুনীতি চট্টোপাধ্যায়। তারপরও দুটাকা আড়াই টাকা পর্যন্ত সন্দেশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিল। জন্মেছেন শ্যামাপ্রসাদ, সুভাষ চন্দ্র। এরপর নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। স্বাধীনতার বেশ কিছুদিন পর তো সরকারি আদেশ বলে দেশে মিষ্টি তৈরী- ই বন্ধ করে দেওয়া হলো। ব্যাস – সেই যে বাঙালির ব্রেনে সুগার যাওয়া বন্ধ হলো, সে পথ আর খুললো না।

মিষ্টি খেলে যে বুদ্ধি খোলে, তার বড় প্রমান গুরু শ্রী যতীন্দ্রমোহন (যম) দত্ত এবং তস্য শিষ্য এই অধম স্বয়ং। গুরু ভূতের ইহকাল পরকাল নিয়ে চর্চা করেছেন, খুঁজে বের করেছেন যে হিন্দু যুগে চালের দর কত ছিল। তেমনি, আজ না হোক কাল, বিশ্বাস আছে যে আমিও বিশেষ কিছু মৌলিক গবেষণা করবো !!! যতদিন তা না হয়, তত দিন বরং একটু দ্বারিক – নকুড় – ভীম নাগের সঙ্গে নতুন বাজারের মাখনলাল দাসের দোকানেও একটু নিয়মিত ঢুঁ মারার চেষ্টা জারি থাক !!

এক রোববার সন্ধ্যা নাগাদ কয়েকজন বাউন্ডুলে হাজির হলাম দোকানে মৌসুমী সন্দেশের খোঁজে। শুধু শীতেই পাওয়া যায় মাখনলালের মৌসুমী। তার সঙ্গে পাওয়া যায় গুড়ের মনোহরা। এছাড়াও পাওয়া যায় ‘দেলখোস’ ‘চকোলেট তালশাঁস’, ‘পেস্তা সন্দেশ’।

এই সব মিষ্টি খেতে খেতেই আপনার মনে হবে, নতুন বাজারের (চিৎপুর) ভেতরে এই আশ্চর্য দোকানে এখনো যেন সিপাহী বিদ্রোহের সেই আমল থমকে আছে। কাঁচের শো কেসের পরিবর্তে কাঁসার পরাতে সাজানো মিষ্টি ডিসপ্লে হচ্ছে। মিষ্টি কেনার আগে চেখে দেখার জন্য দোকানদারের অনুরোধ আর ক্রেতাকে ‘বাবু’ বা ‘মা’ সম্মোধনে এক টুকরো ঊনবিংশ শতক আপনার সামনে উপস্থিত হবে।

গুগুল জানাচ্ছেন, মাখনলাল দাসের এই দোকান প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫০-এ। পাথুরিয়াঘাটার হাটে মিষ্টি বিক্রি করতেন বর্ধমানের এক গ্রাম থেকে আসা ময়রা রামচন্দ্র দাস। পুত্র মাধবচন্দ্র বাবার মতোই মিষ্টি বেচতেন ওই হাটে। অবস্থার পরিবর্তন হল মাধবচন্দ্রের ছেলে মাখনলালের সময় থেকে।পাঁচ প্রজন্ম পেরিয়ে রাম-ময়রার সেই দোকান আজ কলকাতার অন্যতম সন্দেশ-বিক্রেতা ‘মাখনলাল দাস অ্যান্ড সন্স’।