যুদ্ধ বিধ্বস্ত টোকিওর বেতারে আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রচার করতেন হরিপ্রভা তাকেদা

সময়টা ষাটের দশকের শেষ দিক । জলপাইগুড়ির কোনো এক স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্রে এক বৃদ্ধা মাথায় চপারের গুরুতর আঘাত নিয়ে ভর্তি হলেন। বাড়িতে ডাকাত পড়েছিল এবং তাদের আক্রমণে ভদ্রমহিলা সাংঘাতিক জখম হন। আঘাতের ধরণ ও রোগিণীর বয়স দেখে স্বাস্থকর্মীরা প্রাণ সংশয় আশংকা করলেন।  ওদিকে ভদ্রমহিলা একাই থাকেন।  এক বোনপো পরিবার নিয়ে থাকে দার্জিলিং।  তাঁকেই খবর দেওয়া হলো। পরে যখন আত্মীয়রা পৌঁছলেন, তখন দেখা গেল যে বৃদ্ধার পুরো মাথা ব্যান্ডেজ মোড়া, কিন্তু  খাটে বসে স্যুপ খাচ্ছেন ! এমনি তাঁর জীবনীশক্তি । উৎকণ্ঠিত ভাবে মাসির খবর জিজ্ঞেস করলেন তাঁরা।  সেই শুনে বৃদ্ধা হেসে উত্তর দিলেন – ” ওরে ঘাবড়াস না।  আমার কিছু হবে না।  আমি তো মেড ইন জাপান !”

জাপান দেশটার সঙ্গে খুব বেশি বাঙালির সাক্ষাৎ পরিচয় হয়নি সেকালে। হ্যাঁ জাপান বলতে বাঙালির মনে রাসবিহারী বসু আর সুভাষ চন্দ্র বসুর কথা মনে হয়।  তবে আমাদের গল্পের এই নায়িকা জাপান দেখেছেন বহু আগেই, সঠিক ভাবে বললে, প্রথমবার সেই ১৯১২ সালে।  সেই হিসাবে এই হরিপ্রভা তাকেদা হলেন প্রথম জাপানযাত্রী বাঙালি মহিলা।  কিন্তু আজকের দিনে হঠাৎ  এর গল্প কেন শোনাতে বসলাম আপনাদের ? একটু ধৈর্য্য ধরুন বলছি। 

হরিপ্রভা ছিলেন ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের বিশিষ্ট সদস্য এবং শিল্পোদ্যোগী শশীভূষণ  মল্লিকের কন্যা। তাঁদের আদি বাড়ি ছিল শান্তিপুর।  সরকারি চাকরি নিয়ে ঢাকায় যান এবং সেখানেই নাগেন্দ্রবালাকে বিয়ে করেন।  শশিভূষণের ব্রাহ্ম হওয়ার পেছনে আরেকটি ছোট গল্প আছে।  একদিন তিনি শহরের অদূরে জঙ্গলে একটি শিশুকে কুড়িয়ে পেয়ে ঘরে নিয়ে আসেন এবং তাঁকে পালন করবেন বলে স্থির করেন।  এই ঘটনায় তাঁকে সমাজ থেকে পতিত হতে হয় এমং তিনি ধর্ম পরিবর্তন করেন।  শুধু তাই নয়, তিনি ঢাকায় এই ধরণের অনাথ শিশুদের জন্য গড়ে তোলেন উদ্ধারাশ্রম, পরে যার নাম হয় ‘মাতৃ নিকেতন’।   

দেশের উন্নতির জন্য শশীভূষণ বিভিন্ন ধারণার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।  এর মধ্যে একটি হলো হলো দেশীয় পুঁজির ভিত্তিতে দেশীয় শিল্প গড়ে তোলা।  এই চিন্তা থেকে তিনি ঢাকায় একটি সাবান কারখানা স্থাপন করেন এবং সেই কারখানার চিফ কেমিস্ট হিসাবে ১৯০৩ সালে কাজে যোগ দেন জাপানি নাগরিক ও প্রযুক্তিবিদ উয়েমন তাকেদা ।

সেই আমলে জাপানি সমাজে পৈতৃক সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হতেন বড় ছেলে।  তাই অনেক জাপানি ভাগ্যন্বেষণে পাড়ি দিতেন দূরদূরান্তের দেশে।   ১৯০৩ সালে ২৪ জন জাপানি নাগরিক ভারতে এসেছিলেন কাজের খোঁজে – যার মধ্যে একজন ছিলেন উযেমন তাকেদা ।

শশিভূষণের আরেকটি বিশ্বাস ছিল যে ভারতকে যদি উন্নতি করতে হয়, তবে দেশের মানুষের মধ্যে  আন্তর্জাতিক চেতনা গড়ে তুলতে হবে এবং সেই চেতনাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য আরও বেশি করে আন্তর্জাতিক নাগরিকদের মধ্যে বিবাহের উৎসাহ দেওয়া উচিত।   

এই দ্বিতীয় ধারণাটির থেকেই মনে হয় বড় মেয়ে হরিপ্রভার সঙ্গে উয়েমন তাকেদার বিয়ের প্রস্তাব করেন তিনি। হরিপ্রভার সঙ্গে উয়েমনের বিয়ে হয় ১৯০৪ সালে, পরিবারের ব্যবস্থাপনায় এবং হরিপ্রভার সম্মতিতে ।  প্রায় ৮ বছর ঢাকায় কাটিয়ে তাকেদা দম্পতি প্রথমবার জাপান যাত্রা করেন ১৯১২ সালে। হরিপ্রভা জানিয়েছেন যে মূলত শ্বশুড়বাড়ির আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যেই তাঁর জাপান যাত্রা।  সেই জাপান ভ্রমণের বৃত্তান্ত অত্যন্ত অন্তরঙ্গ ভাষায় নথিবদ্ধ করেন তিনি যার থেকে সেই সময়ের জাপানের একটি আটপৌরে ছবি ধরা পরে। শ্বশুর বাড়িতে হরিপ্রভা যথেষ্ট ভালোবাসা পেয়েছিলেন।  তিনি লিখেছেন:

“বিদেশে এমন সরল স্বভাব, স্নেহপরায়না শ্বশুর শ্বাশুড়ি ঠাকুরানীর মার মতো যত্ন-ভালোবাসা পাইয়া ইহার সহিত বাস করিতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু সে সম্ভাবনা কোথায় ? ”

চার মাস সময় জাপানের বিভিন্ন জায়গায় তারা ভ্রমণ করে ঢাকায় ফিরে আসেন। তার দু বছর পর, “বঙ্গ মহিলার জাপান যাত্রা” নামে প্রকাশিত হয় তাঁর জাপান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ।  ডিমাই ৮ আকারে ৬১ পৃষ্ঠার এই ভ্রমণ কাহিনী ওয়ারির “ভারত মহিলা প্রেস”-এ মুদ্রিত হয় ।  বইটি “সম্ভবত” উপমহাদেশ থেকে প্রকাশিত প্রথম জাপান ভ্রমণের কাহিনী যা রবীন্দ্রনাথের “জাপান যাত্রী” প্রকাশের চার বছর আগেই দিনের আলো দেখে।     

বইটি প্রকাশের পর রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় প্রবাসীতে এর সম্পর্কে লিখেছিলেন।  এছাড়া অন্নদাশঙ্কর রায়,  বুদ্ধদেব বসুও কৈশোরে এ বই পড়ে মুগধ হয়েছিলেন।  তার পর এক সময় স্তিমিত হয়ে আসে এই আলোচনা।  লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান লেখিকা হরিপ্রভা। 

‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’ ছাড়াও তিনি ‘সাধ্বী জ্ঞানদেবী’ এবং ‘আশানন্দ ব্রহ্মনন্দ কেশবচন্দ্র সেন’ নামে আরও দুটি বই  লিখেছিলেন। ‘জাপানে সন্তান পালন ও নারীশিক্ষা’ শিরোনামে ভারতবর্ষ পত্রিকায় তার একটি নিবন্ধও ছাপা হয়েছিল ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে জাপান সরকার বিদেশে বসবাসকারী নিজের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নেন।  বোম্বে থেকে আবার জাপান ফেরার জাহাজে উঠলেন তাকেদা দম্পতি। কিন্তু আগের বারে যে শান্ত সুশৃঙ্খল জাপান দেখেছিলেন হরিপ্রভা, সেই অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ বদলে যায় এবারের সফরে। এই সময় রাসবিহারী বসু ও সুভাষচন্দ্র বসুর সংস্পর্শে আসেন হরিপ্রভা।   সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তিনি লিখে গেছেন তার আত্মকথা “যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপানে”-র পাতায়।

“১৯৪৩ সালে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর টোকিও আসার সংবাদে আমরা টোকিও যাই।  টোকিওতে সুভাষ বসুর সঙ্গে সাক্ষাতের কোনো উপায় না করতে পেরে আবার রাসবিহারী বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। এখানেই বসু মহাশয়ের সঙ্গে রেডিও ব্রডকাস্টার ব্যবস্থা হয় এবং তিনি নেতাজির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আমাদের ইম্পেরিয়াল হোটেলে যেতে বলেন।  অতঃপর বাংলা  ব্রডকাস্টের জন্য রাসবিহারী বসুর নির্দেশে রেডিও অফিস থেকে টেলিগ্রাম পেয়ে ৩রা ডিসেম্বর আমরা পুনঃ টোকিও যাই এবং ১৫ই ডিসেম্বর থেকে এই কর্মে নিয়োজিত হই। একদিন পরপর বাংলায় সংবাদ ও সমালোচনা প্রচারে ব্যবস্থা হয়।”   

নেতাজির সঙ্গে সাক্ষাতের দিনটির অনুপুঙ্খ বিবরণ পাই আমরা হরিপ্রভার লেখায়। 

“২৪শে নভেম্বর নেতাজির নিমন্ত্রনে আমরা ইম্পেরিয়াল হোটেলে যাই। … তথায় পৌঁছনো মাত্র টোকিওতে প্রথম বিমান আক্রমণের সাইরেন বেজে ওঠে। ৩টেয় রেইড বন্ধ হলে হোটেলে ফিরে গিয়ে নেতাজির সঙ্গে আহার করি। সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে আলাপ আলোচনা হয়।”   

নেতাজির সঙ্গে টোকিওতে। কালো শাড়ি পড়া হরিপ্রভা

এরপর ৯ই নভেম্বর গেইহেক্কিন হোটেলে নেতাজির সঙ্গে প্রবাসী ভারতীয়দের সম্মেলনেও উপস্থিত ছিলেন হরিপ্রভা।  সেখানে নেতাজির সঙ্গে ছবি তোলা হয় এবং নেতাজির মোটরে করেই সেদিন বাড়ি ফিরেছিলেন বলে জানাচ্ছেন তিনি।

ভেবে দেখুন, টোকিও শহরের নিশুতি রাত। চারিদিকে বোমা পড়ছে। তার মধ্যে একা এক বাঙালি মহিলা চলেছেন অস্থায়ী রেডিও স্টেশনের পথে। মাথায় হেলমেট পরনে শাড়ি।  বেতার তরঙ্গে ছড়িয়ে দিতে তাঁর মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষার বার্তা। কারণ আজাদ হিন্দ ফৌজের খবর ছিল সম্প্রচারের বিশেষ অংশ।  অবশ্যই মাতৃভাষায়। 

হরিপ্রভার উপর তৈরী প্রামাণ্য চিত্রে তাঁর বোনের ছেলে বিশিষ্ট সাহিত্যিক শ্রী সুরজিৎ দাশগুপ্ত জানিয়েছেন যে সেই সময় শত্রু দেশ জাপানের খবর রেডিওতে  শোনা ছিল অপরাধ। তবু অনেক রাতে, গোপনে, সুরজিৎ বাবু তাঁর মায়ের সঙ্গে জনৈক দ্বিজেন গোঁসাইয়ের বাড়ি গিয়ে সেই হরিপ্রভার খবর পড়া শুনতেন। সেই স্বর শুনে খুব কাঁদতেন তার মা, অশ্রুবালা। আর বলতেন – “যাক, দিদি তাহলে বেঁচে আছে !”

কিন্তু কেমন করে বেঁচে ছিলেন হরিপ্রভা সেই সময়?  সেই খবর নিতে আবার ফিরে যাই তার আত্মকথার পাতায়।

“অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে লাগল। ক্রমে রেললাইন ধ্বংস, রেকর্ড প্রস্তুতের কারখানা ধ্বংস।  আমাদের রেকর্ডিং বন্ধ হয়ে যায়। প্রতি রাতে এয়ার রেডের জন্য ঘুম নাই। সিঁড়ির পাশে স্বামীর স্যুট পরে ওঁর সঙ্গে মৃত্যুর প্রতীক্ষায় দুজনে বসে কাটাচ্ছি।”  

তবে এই রাতেরও ভোর হলো।  যুদ্ধ শেষ হলো।   তাকেদা দম্পতি ফিরে এলেন ভারতে।  উঠলেন ছোট বোন অশ্রুবালার কাছে, জলপাইগুড়িতে, যিনি নিজে ছিলেন একজন ডাক্তার। সেখানেই ১৯৪৮ সালে উয়েমেন তাকেদা মারা যান। উত্তর বঙ্গেই বাকি জীবনটা কাটিয়েছিলেন হরিপ্রভা একজন সাধারণ বিধবার মতো । কোনোদিন নিজের অতীত জীবন নিয়ে জনসমক্ষে আলোচনার উৎসাহ দেখাননি। চাননি টেনে নিতে নিজের দিকে প্রচারের আলো। হাতও পাতেননি কোনো সরকারের কাছে নিজের দেশভক্তির প্রতিদানের জন্য।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হরিপ্রভা তাকেদার নাম দেশ ও জাতি ভুলে গেছে।  তাঁর সম্পর্কে বলার লোকও খুব বেশি নেই।  সুরজিৎ বাবুও আর থাকেন না এই শহরে।  তবে হরিপ্রভার শেষ স্মৃতি বুকে নিয়ে রিজেন্ট পার্কের এক তালা বন্ধ ফ্ল্যাটের ভেতর এখনো সযত্নে সাজানো রয়েছে হরিপ্রভার বিয়ের খাট।  তাছাড়াও অভিযাত্রী হরিপ্রভার ভ্রমণ যাত্রার সঙ্গে এই শহরের একটা যোগ রয়ে গিয়েছে। প্রথমবার জাপান যাওয়ার সময় তাঁর জাহাজ ছেড়েছিল কলকাতা বন্দর থেকে।  আর ১৯৭২ সালে সালে মহাপ্রস্থানের পথেও উনি যাত্রা করলেন কলকাতার শম্ভুনাথ পন্ডিত হাসপাতাল থেকে। 

তথ্য সূত্র :

  • ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী – ২য় খন্ড; মুনতাসীর মামুন
  • প্রামাণ্য চিত্র:  জাপানি বধূ, পরিচালক  তানভীর মোকাম্মেল
  • সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান। প্রথম খন্ড; কলকাতা: শিশু সাহিত্য সংসদ।
  • শতাব্দি প্রাচীন এক নারী হরিপ্রভা তাকেদা : ফাহমিদা খান উর্মি

কৃতজ্ঞতা স্বীকার :

  • বিশিষ্ট সাহিত্যকর্মী ও সংগঠক  শ্রী সুশীল সাহা