গুটকে কচুরি, ১১ই মাঘ আর আদি ব্রাহ্ম সমাজের গল্প

রবীন্দ্র সরণি বা অতীতের রোড তো চিৎপুর ধরে শেষ কবে হেঁটেছেন ? প্রয়োজন খুব একটা হয় না। তাই যাওয়াও পড়েনা ওদিকে। কিন্তু এককালে এটাই ছিলে শহরের প্রধান রাস্তা। কাজে, অকাজে তীর্থদর্শনে – সব প্রয়োজনেই ধরতে হতো এই রাস্তা।

আজকাল অবশ্য ওদিকটায় খাবারের খোঁজেও অনেকে ঢুঁ মারেন। এই যেমন আমি। জোড়াসাঁকো থেকে খানিকটা দক্ষিণে এগিয়ে (নাকি পিছিয়ে ?) গেলে “কানাইয়া কচুরি”। এখানে পাওয়া যায় শহরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ “গুটকে কচুরি” – যে কচুরি শুধু হাতের চাপে আকার পায়। বেলুন-চাকির চাপ সহ্য করতে পারেন না এই সোহাগিনী।

প্রথমে একবার অর্ধেক ভেজে নিয়ে, পরিবেশনের আগে আবার ভাজা হয়। কড়া মুচমুচে গরম কচুরি আর আলুর তরকারির জন্য শীতের রোববার সকালে সাতটার মধ্যেই বিশাল লাইন। অধিকাংশ ক্রেতাই অবাঙালি। তবে আমার মতো কচুরি খাওয়ার জন্য মধ্যমগ্রাম থেকে জোড়াসাঁকো যাওয়ার পাব্লিকও তো আছে !!

দোকানি ভদ্রলোক সদালাপী। ভিড় সামলেও ব্যবসার ভালো মন্দ নিয়ে দুকথা বললেন (ভালোর কথা বেশি – মন্দর কথা প্রায় নেই) । দাম নেওয়ার সময় আবার দুটি জিলিপির পয়সাও নিলেন না !! আবার আসতে বললেন, বন্ধুদের নিয়ে !!

ভরপেট কচুরি জিলিপি খেয়ে ফিরছি। আর ভাবছি বাঙালি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এই অভিবাসী উত্তরভারতীয় সম্প্রদায়ের পার্থ্যক্য। ভোর ভোর গরম কচুরি খাবো বলে শ্যামবাজার হাতিবাগান পাড়া ঘুরে বিফল হয়ে, প্রায় বাধ্য হয়েই এলাম জোঁড়াসাঁকো। হরিদাস মোদক থেকে সেন মহাশয় – সকলেই জানিয়ে দিলেন সাড়ে আটটা ন’টার আগে কচুরি হবে না। এতো সকালে কচুরির কথা জিজ্ঞেস করেই যেন অন্যায় করে ফেলেছে – ভাবখানা এমন। আর এখানে সাতটার আগেই প্রায় পঞ্চাশ ষাট জন সন্তুষ্ট গ্রাহক উদরপূর্তি করে ফিরে গেছেন !!

কিছু হচ্ছে না হবে না মানসিকতা থেকে বেরিয়ে কিছু হওয়ানোর চেষ্টাটাই যেন কমে যাচ্ছে আমাদের। একটু তিতকুটে স্বাদ লেগে থাকে মুখে। এর মধ্যে হাঁটতে হাঁটতেই মার্বেলের মূর্তি তৈরির দোকানগুলির ঠিক আগে একটা ভাঙাচোরা পুরোনো বাড়ির সামনে নিয়ে সাইনবোর্ডে নজর পড়ে। 
“রাজা রামমোহন রায় কর্তৃক স্থাপিত / প্রথম ব্রাহ্ম সমাজ মন্দির 
আদি ব্রাহ্ম সমাজ / ইং ১৮৩০ / বাং ১১ ই মাঘ ১৩৩৬ “

চমকে উঠি। আরে, গতকাল-ই তো ছিল ১১ই মাঘ!! কই এই বাড়ি নিয়ে তো কোথাও কোনো উচ্চবাচ্চ দেখলাম না !! অধঃপাত আর আত্ম বিস্মৃতির ধুলো সরিয়ে মনে পড়ে “কলকাতা দর্পণ”-এর দ্বিতীয় খন্ড।

দু’পা দূরেই আজ যে মাতৃ মঙ্গল প্রতিষ্ঠান হাসপাতাল, সেটি ছিল এককালে ফিরিঙ্গি কমল বোসের বাড়ি। ভদ্রলোক ক্রিস্টান ছিলেন না। কাজ করতেন ডি’সুজা এন্ড কোম্পানি নামে একটি পর্তুগিজ ফার্মে। সেই থেকেই লোকের মুখে হিন্দু কমললোচন (অন্য মতে রামকমল) বসু বাঙালির উদ্ভাবন পটুত্বে হয়ে গেলেন “ফিরিঙ্গি” কমল বোস !! কমল বোসের বাবা চন্দননগরে ফরাসিদের তহশীলদার ছিলেন। এই বাড়ির সদর মহলের সামনাসামনি দুটি ঘর ভাড়া নিয়ে রামমোহন ১৮২৮ সালে স্থাপন করেন “ব্রাহ্মসভা”। তার দুই বছর পর ১৮৩০ এর ২৩ জানুয়ারি কমল বোসের বাড়ির উত্তর দিকে নতুন বাড়িতে পাকাপাকি উঠিয়ে নিয়ে যান সেই সংগঠন। দিনটা ছিল ১১ই মাঘ।

এই সেই ৫৫/১ আপার চিৎপুর রোডের বাড়ির, যার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। গত কাল গেছে ১১ই মাঘ। ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বীদের “মাঘোৎসব”। এক গুচ্ছ অনুষ্ঠানের কথা দেখেছি এবিপি-র কলকাতা কড়চার পাতায়। কিন্তু এই হতশ্রী প্রায় ভগ্ন মার্বেলের গুদামটির কথা কোথাও নেই। কদিন পর এই বাড়ির গায়েও হয়তো ঝুলবে পৌরসভার “বিপজ্জনক বাড়ি”-র নোটিশ। (খেয়াল করলাম না – এখনি আছে কি না ) আর তার কদিন পর জনসাধারণনের নিরাপত্তার খাতিরে ভেঙে ফলে নতুন উন্নয়নের স্মারক তৈরি হবে রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠিত এই বাড়িতে।

শুধু একটা রোদ জলে মুছে যাওয়া কাঠের ফলক আর ভাঙা মার্বেল গুঁড়োর বস্তার আড়ালে থাকা এই ধুলো মাখা সাইনবোর্ড – আমাদের শপিং মল সংস্কৃতির দিকে নীরবে বিদ্রুপ করে। আমরা কি বুঝতে পারি ? কাছের কোনো মন্দিরের মাইক থেকে কানের কাছে বেজে চলে হিন্দি ভজন “ওম জয় শিব ওমকারা”!! হয়তো সেই বিদ্রুপ বোঝার সংবেদনশীলতাই আমরা হারিয়ে ফেলছি।