পড়শীর বসত করে : কলকাতার চীনাদের নববর্ষ উদযাপন

“গল্পের শরিল, বাবু, পানি দে  তৈরি, বুঝলেন ? কোন ঠাঁইয়ে  শুরু হয়ে যে গল্প যে কোন ঠাঁয়ে চলি যায় – সে বোঝা ভারি শক্ত!!” এক মেলায় সদ্য আলাপ হওয়া বন্ধুকে এমন করেই গল্পের চরিত্র বুঝিয়েছিলেন এক গ্রামীণ।  সত্য, এর থেকে বাস্তব কথা বোধহয় আর নেই।  এই যে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে এই লেখাটা  পড়ছেন,  ধরুন তার কথাটাই।  আচ্ছা হেঁয়ালি থাক।  খোলসা করেই বলি।  এটাও কলকাতার ভেতর আরেক কলকাতার গল্প, যা সহজে চোখে পড়ে না।

সেটা ছিল হেস্টিংসের আমল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়িক কাজকর্মের পরিধি আরও বাড়িয়ে নিতে হেস্টিংস নজর দিলেন তিব্বত ও চীনের উপর।  নানা চেষ্টার ফলে কুয়িং সাম্রাজ্যের সঙ্গে শুরু হলো আদান প্রদান। আর এই বাণিজ্যের মূল পণ্যটি ছিল চীনের চা।

এই বৈদেশিক বাণিজ্যের সূত্র ধরেই কোম্পানির আমলে চীন থেকে প্রথম অভিবাসীর দল এসে হাজির হলেন কলকাতায়। ১৭৮০ সাল নাগাদ হেস্টিংস তাঁদের নেতা টং অচিউ -কে (Tong Atchew ) ৬৫০ বিঘা জমি দিলেন  বজবজের কাছে, চিনির কল আর আঁখের ক্ষেত করতে।  এই প্রকল্পে কাজ করার জন্য প্রথম ১১০ জন চীনা নাগরিক স্থায়ী ভাবে বাসা বাঁধলেন শহরের উপকণ্ঠে।   কিন্তু প্রকল্প নিয়ে অচিউ-র নানা সমস্যা চলতেই থাকলো।  এমনকি কোম্পানির কাছে ব্যক্তিগত জামিনে টাকা ধার করেন এবং সেই ঋণের শর্ত হিসাবে চীন থেকে আরও দক্ষ শ্রমিক নিয়ে আসেন এই শহরে।  অচিউ-র মৃত্যুর পর এই সব শ্রমিকরাই শহর কলকাতার বুকে গড়ে  তুললেন লিটল চায়না।

অচিউ  সাহেব নিজের কোনো দিনপঞ্জি লিখে যাননি। তবে তাঁর মৃত্যুর  ৬৫ বছর পর স্থানীয় চীনা সমাজের সুন্দর ছবি লিখে গেছেন কলসওয়ার্দী গ্রান্ট। সেই লেখায় বার বার কাঠের মিস্ত্রিদের কাজের প্রশংসা করা হয়েছে। চীনাদের একটি সৎ, কর্মঠ ও পরিচ্ছন্ন গোষ্ঠী হিসাবেই বর্ণনা করেছেন গ্রান্ট।  তবে তাঁদের আফিঙের নেশার কথাও  বিস্তারিত ভাবে লেখা রয়েছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দস্তাবেজের মধ্যে। আফিং ও চীনের এই সম্পর্ক থেকে কোম্পানি খুঁজে পেল ব্যবসার নতুন ফিকির।  বিভিন্ন জায়গা থেকে আফিং নিয়ে এসে কলকাতার ” Opium Exchange”-এ  সেগুলি নিলাম হতো।  তারপর জাহাজে সেই আফিং পাড়ি দিত চীন।  আর এই ব্যবসা থেকে বড়লোক হয়েছেন কলকাতা ও বোম্বের বহু বিখ্যাত পরিবার।  

এতো গেল ব্রিটিশদের চোখে চীনা-দের ছবি।  চীনারা কি ভাবে দেখেছিলেন এদেশে নিজেদের অবস্থাকে? সেই খবরও আছে।  কুয়িং সম্রাটের বাণিজ্য দলের সদস্য হুয়াং মাওকাই (Huang Maocai ) ১৮৭৯ সালেএসেছিলেন শহরে এবং সেই সময়ের কলকাতার জলের কল, রাস্তার বাতি ও  টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা সম্পর্কে খুব শ্রদ্ধাপূর্ণ প্রতিবেদন পেশ করেছিলেন নিজের লেখায়।  

বিংশ শতকের প্রথম দশকে যখন কাং ইউয়ি (Kang Youwei) কলকাতা এসেছিলেন,  তিনি দেখেছিলেন শহরে চীনাদের তিনটি মূল উপনিবেশ।  বৌবাজার, ট্যাংরা এবং বজবজ। অবস্থাটা আজও খুব একটা বদলায়নি।  বৌবাজারে মূলত ক্যান্টন প্রদেশের অধিবাসীদের বাস আর ট্যাংরা অঞ্চলে হাক্কা-র লোকেরা সংখ্যা গরিষ্ঠ।  দুই জায়গার চীনাদের মধ্যে একটা ঘটি বাঙাল সুলভ আকচাআকচি আছে।   তবে বৌবাজারের চীনা সমাজ অনেক বেশি খোলামেলা।  এলাকার কসমোপলিটন জনবিন্যাসের জন্যও হতে পারে। এলাকার মুসলিম, অ্যাঙ্গলো-ইন্ডিয়ান ও হিন্দিভাষী মানুষের সঙ্গে মিশে আছেন বৌবাজারের চীনারা। 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চীনারা নিজেদের অত্যন্ত দক্ষ কারিগর হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। যন্ত্র এবং হস্তশিল্প – সব দিকেই ছিল তাদের দখল।তার মধ্যে কাঠ ও চামড়ার কাজে ছিল তাদের দারুন হাতযশ।  এছাড়াও চীনারা ডেন্টিস্ট ও ধোপাখানার ব্যবসাও সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করেছেন এই শহরে। এই শহরে এক সময় চীনা কাঠের মিস্ত্রিদের কদর ছিল বড়লোক বাবুদের বাড়িতে।  সেই নৈপুণ্যের কিছু ঝলক এখনো দেখা যায় বৌবাজার আঞ্চলে কিছু চীনা মন্দিরের ভেতর কাঠের অতি সুক্ষ কারুকাজে। 

এই এলাকায় কয়েকদিন ঘুরে বুঝলাম যে এখানে চীনা সমাজ কিছু নির্দিষ্ট পেশা ভিত্তিক মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও আদান প্রদানের উপর গড়ে উঠেছে। একটি পেশা ভিত্তিক সংগঠন (association) সার সঙ্গে যুক্ত একটি ক্লাব, রেস্তোরা আর উপাসনালয় – এটাই মোটামুটি কাঠামো। অর্থাৎ কাঠের কাজ যারা করেন তাঁরা ট্যানারির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের আলাদা ব্যবসায়িক ও মেলামেশার সংগঠনে খুব একটা যান না।

শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর চীনা ভবনের  স্থাপনের জন্য এসেছিলেন অধ্যাপক টান ইউন শান (Tan Yun Shan )।  তিনি অবশ্য এই এলাকাকে  দেখেছিলেন ঘিঞ্জি, নোংরা জায়গা হিসাবে, যেখানে আফিঙের নেশা আর সমাজবিরোধী কার্যকলাপের আঁতুরঘর। শান্তিনিকেতনের ‘টান সাহেবের’ দৃষ্টির সঙ্গে হয়তো সাহিত্যিকদেরও  মতো অনেকেরই দেখাটা মেলে। বার বার চীনা মুখের মানুষ ফিরে এসেছেন সাহিত্যে ও সিনেমার পর্দায় ভয়ঙ্কর ভিলেন হিসেবে। বছর কয়েক আগে সমরেশ মজুমদারের কাহিনী অবলম্বনে “অর্জুন: কালিম্পঙে সীতাহরণ” নামে একটি ছবিতে তো আমাদের স্কুলের এক প্রাক্তনী, ডেভিড চ্যান (বোধহয় ৮২/৮৩ ব্যাচের) খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় পর্যন্ত করেছিলেন। 

স্কুলে কথা প্রসঙ্গেই বলি, আমাদের সঙ্গে পড়তো কয়েকটি চীনা ছেলে।  তাদের সঙ্গে খুব জমাটি বন্ধুত্ব না গড়ে উঠেলেও, এখনো মনে আছে যে তারা খেলাধুলায় ছিল অত্যন্ত চৌখস। বার্ষিক স্পোর্টসের দিন প্রায় সব পুরস্কার-ই তারাই নিয়ে যেত।  তারপর স্কুল ছাড়ার পরেও  দু’এক বার রোববার করে চাইনিজ ব্রেকফাস্ট খেতে গেছি।  তবে এবার অভিজ্ঞতাটা অন্যরকম।  গত  ০৫.০২.২০১৯ অর্পিতার সঙ্গে বৌবাজারের চীনা পাড়ার নব বর্ষের উৎসব দেখতে গিয়েছিলাম।   বেশ অন্যরকম একটা উৎসব।  

চীনাদের বছরের হিসেবটা বেশ গোলমেলে। একে বলা হয় “lunisolar year” – মানে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে চাঁদের গতি আর সূর্য্যেকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর গতি – দুটি বিষয়ের উপর-ই নির্ভর করে। তাই নতুন বছরটি জানুয়ারির শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম তিন সপ্তাহের মধ্যে উদযাপিত হয়। বিভিন্ন পৌরাণিক ব্যাখ্যায় এক একটি বছর এক একটি প্রাণীর নামে উৎসর্গিত হয়। এ বছরটির তারা বলছেন “Year of the Pig”।

মূলত এলাকার কম বয়সী তরুণেরা “লায়ন ডান্স”-এর  এক একটি দল তৈরী করে। যদিও পুরো অনুষ্ঠানে সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকে একদম শিশু থেকে বয়স্ক সদস্যদেরও। দলের পরিচয় বহন করতে প্রতিটি দলের থাকে আলাদা আলাদা জার্সি।  দলে থাকে দুটি করে সিংহের মুখোশ, যা পরে বাদ্য যন্ত্রের তালে তালে তারা গৃহস্থের বাড়ির সামনে গিয়ে নাচে।  বছরের শুরুতে বাড়ির সামনে এই নাচ গৃহস্থের সৌভাগ্য সূচিত করে বলে বিশ্বাস।   এই পরিষেবার পরিবর্তে গৃহস্থের পক্ষ থেকে নাচুনে সিংহের প্রাপ্য হয় কিছু নগদ ও অন্যান্য উপহার।     

তবে উপহার দেওয়ার কায়দাটাও বেশ অভিনব। বাড়ির দোতলা বা আরও উঁচু থেকে একটা লাঠির ডগায় সুতো বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় নগদ আর এক থোকা লেটুস পাতা।  ছেলের দল একজনের উপর একজন উঠে পিরামিড তৈরি করে।  পিরামিডের একদম মাথায় থাকে সবচেয়ে হালকা সদস্য। তার মাথায় থাকে সেই সিংহের মুখোশ।  মুখোশের মুখের অংশটি  কায়দা করে হাঁ করে সেখান দিয়েই ধরতে হয় উপহার বাধা সুতো।  তারপর হ্যাঁচকা টানে সেটা ছিড়ে ফলে পৌঁছে দিতে হয় অন্য একজনের হাতে।  পুরোটাই ভারসাম্য বজায় রেখে – না হলে যে পুরো পিরামিডটি ভেঙে পড়বে !

যত সহজে বললাম – ব্যাপারটা মোটেও তত সহজ নয়।  কারণ সিংহের মুখ উপহারে কাছে এলেই গৃহস্থ সেটা সরিয়ে নেন বা আর একটু উঁচু করে দেন।  তখন পুরো পিরামিডটি হয়তো আরেকবার সাজাতে হয় ছেলেদের।  এও এক ধরণের মজা। 

পুরো অনুষ্ঠানটা দেখে মহারাষ্ট্রে জন্মাষ্টমীর দিন “দহি হান্ডি”-র  কথা আপনার মনে পড়বেই পড়বে। আরও মনে পড়বে দেশ ছেড়ে বিদেশে কয়েক শতাব্দী কাটিয়ে দেওয়া এই জনগোষ্ঠীর সংগ্রামের কথা –  নিজেদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় বাঁচিয়ে রাখার জন্য। আমি যেন তাদের সেই সেই পূর্বপুরুষের মাটির প্রতি টান-টা  অনুভব করলাম, যা শেষ হয়েও শেষ হয় না।  নিজেও রিফিউজি পরিবারের সন্তান বলেই হয়তো !

তবে আমার তো জিজ্ঞাসার অন্ত নেই।  সিংহকে লেটুস পাতা খেতে দেখে একজনকে পাকড়াও করে প্রশ্নটা করেই ফেললাম। সেই ছোকরা যা বললো, তার থেকে এটুকু বুঝলাম যে ক্যান্টোনিজ চীনা ভাষায় “লেটুস পাতা”  আর  “বড়লোক হওয়া”  দুটি শব্দের ধ্বনি সামঞ্জস্য থাকায় উপহারের সুতোয় লেটুস পাতার থোকা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সত্যি মিথ্যে জানি না।  তবে ব্যাখ্যাটা বেশ মজার, তাই না ? 

উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাজি ফাটানো।  বাজি মানে চিনে পটকা।  আমরা আজকাল যাকে কালী-পটকা’ নামে ডাকি।  একটা এলাকার সমস্ত বাড়ি থেকে গিফট নেওয়া হয়ে গেলে, গলির মুখে জ্বালানো হয় এই পটকাগুলি  – লাইন বেঁধে। 

উপহার হিসাবে কিছু জায়গায় দেখলাম বিয়ার আর হুইস্কির বোতল দেওয়া হচ্ছে।  মাটিতে পরপর সাজানো বোতলগুলি নাচতে নাচতে মুখের মধ্যে পুড়ে নিচ্ছে সিংহ। সেও আরেক কায়দা।  তারপর দলের সদস্যরা রাস্তাতেই শুরু করছেন সেই পানীয়ে গলা ভেজানো।  দেখে মনে পরে যায় আরেক ইতিহাস।   ঠিক কলকাতা হয়তো নয়, তবে গঙ্গার উল্টো দিকে সালকিয়াতে এক টম ফ্যাট নামে চীনা সাহেবের রাম তৈরির ডিস্টিলারি ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর সেই কারখানা ও কারখানার যন্ত্রাপাতি সহ প্রায় ১০হাজার গ্যালন রাম নিলাম হওয়ার নোটিস দেখেছি ১০ই জুন ১৭৮৪ তারিখের “কলকাতা গ্যাজেটের ” পাতায়।

তবে হারিয়েও অনেকটাই হয়তো হারায় না। কিম্বার্লি সেহ-র (Kimberly Hsieh) নাম শুনেছেন ? আমিও শুনি আগে। স্কুলের এক সিনিয়র জানালেন যে ওঁদের ব্যাচের Hsieh ko Chung-এর ( ছোট করে, চাকা চুং) রয়ে গিয়েছিলেন কলকাতায়। যদিও তার বাকি তিন ভাই চলে গেছেন ক্যানাডা। এই চাকা চুং-এর মেয়ে কিম্বার্লি সেহ। তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে গ্রাজুয়েশন করে এখন IISC – বেঙ্গালুরু-তে আছেন। সম্ভবত প্রথম চীনা বংশোদ্ভূত ভারতীয় বৈজ্ঞানিক। কলকাতার চীনা সমাজ তাঁকে নিয়ে খুব গর্বিত। আর সেই গর্বের শরিক আমরাও। কিম্বার্লি তো আমাদেরই একজন !!

ভারত চীন যুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়ে এদেশের চীনা বংশোদ্ভুত নাগরিকদের উপর সংগঠিত অন্যায় অবিচারের প্রসঙ্গ না ছুঁয়ে গেলে কলকাতার চীনাদের গল্পটা শেষ হয় না। সেই অত্যাচারে শুধু সরকার নয়, অংশ নিয়েছে এই শহরের সাধারণ নাগরিকরাও। এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত শুধু একটা “নীল আকাশের নিচে” তৈরী করে লাঘব হয় না। সেই সময় থেকেই চীনারা ছাড়তে শুরু করেন দেশ।  খোঁজ নিয়ে দেখেছি যে আমার সহপাঠী চীনা ছেলেরাও পাড়ি জমিয়েছে ক্যানাডা।  এই নিয়মেই কলকাতার মোট চীনাদের জনসংখ্যা এখন মাত্র কয়েক হাজার।  আর এই মুষ্ঠিমেয় কয়েকজনের থেকে যাওয়াই যেন বাঁচিয়ে রেখেছে উপনিবেশিক কলকাতার কসমোপলিটান চরিত্র, , যার অনেকটাই আজ উগ্র জাতীয়তাবাদের অশ্লীল হুঙ্কারে আমরা হারিয়ে ফেলেছি ।। 

তথ্যসূত্র :

তথ্যসূত্র :
India, China, and the World: A Connected History
By Tansen Sen
The Chinese of Calcutta by Jawhar Sircar
(from : Calcutta: The Living City, Vol. II ; edited by Sukanta Chaudhuri)
Selections From Calcutta Gazettes of the Years1784 -1788
বিশেষ কৃতজ্ঞতা : অর্পিতা চন্দ ; অর্পিতা চন্দ ; Food Historian and Explorer of Old Calcutta