বাঙালি হিন্দুর বর্ণভেদ ও একটি গলির ইতিহাস

এক বৃদ্ধ চামারের যুবতী স্ত্রী। তাদের মধ্যে নিত্য খিটিমিটি লেগে থাকে।  একদিন চূড়ান্ত অশান্তি হওয়ায় পদী চামারানী বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।  এদিকে তাঁর স্বামী নিজের ভুল বুঝতে পেরে বৌকে অনেক খোঁজার চেষ্টা করে।  শেষে ব্যর্থ হয়ে ভবগুরের মতো জায়গায় জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে একদিন চন্দননগরের ফরাসি সরকারের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর অতিথিশালায় হাজির হয় দুটো ভাতের আশায়।  পদী এদিকে পরিচয় গোপন করে ইন্দ্রনারায়ণের অতিথিশালায় সাহায্যকারী হিসাবে কাজ নিয়েছে। ব্রাহ্মণ সহ নানা জাতের লোক তাঁর ছোঁয়া খেয়ে যাচ্ছে। বৃদ্ধ রুইদাস তার বৌকে অতিথিশালার সেবিকা হিসাবে আবিষ্কার করতেই পদীর আসল পরিচয় জানাজানি হয়ে গেল। বিশাল ঝড় উঠলো স্থানীয় সমাজে ।

চন্দননগরের হালদারবাবুরা ছিলেন বনেদি বড়লোক ও সমাজপতি।  ইন্দ্রনারায়ণের ক্রমবর্ধমান আর্থিক উন্নতি ও সামাজিক প্রতিপত্তিতে তাঁরা ছিলেন ঈর্ষিণান্বিত।  পদী চামারানীর ঘটনায় তাঁরা অযাচিতভাবে সুযোগ পেয়ে গেলেন ইন্দ্রনারায়ণকে অপদস্থ ও বিব্রত করার। হালদার বাবুরা এই ঘটনা থেকে রটিয়ে দিলেন যে ইন্দ্রনারায়ণ সব হিন্দুর জাত মারার ষড়যন্ত্র করছেন।  পুরো সমাজকে ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল। এদিকে ইন্দ্রনারায়ণের মনে মনে ইচ্ছে ছিল হালদারবাবুদের সরিয়ে গোষ্ঠীপতি হওয়ার।  সেই ইচ্ছের তো সমূলে বিনাশ হলোই, সঙ্গে সম্পূর্ণ সামাজিক বহিস্কার। অজান্তে হলেও, পাপ স্খলনের জন্য শাস্ত্রীয় বিধান মেনে সব রকম প্রায়শ্চিত্ত করলেন চৌধুরীবাবু। তবু হালদাররা তাঁকে সমাজে নিলেন না।

এই সময় “কাহানি মে টুইস্ট”।  নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের খাজনা বাকি পড়লো নবাবের ঘরে।  জারি হলো নদীয়ারাজের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।  টাকার জন্য কৃষ্ণচন্দ্র হাত পাতলেন ফরাসডাঙার দেওয়ানের কাছে।  শুরু হলো আরেকটি ফিল্মি দোস্তি।  বিপদের সময় টাকা দিয়ে মান রক্ষা করার বদলে প্রতিদান দেওয়ার জন্য ইন্দ্রনারায়ণের এই সামাজিক পীড়া দূর করার জন্য এগিয়ে এলেন কৃষ্ণচন্দ্র। বিস্তারিত আলোচনা করে তিনি বুদ্ধি দিলেন যে চন্দননগরের সমাজের এই অবরোধ কোনো শাস্ত্রীয় বিধান নয়, ভাঙতে পারে একমাত্র সামাজিক বিধান। আর নবদ্বীপের স্মার্ত পন্ডিতদের গোষ্ঠীপতি হিসাবে সেই বিধান দিতে পারেন একমাত্র মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র।  কি সেই বিধান?  খুব সহজ।  ইন্দ্রনারায়ণের চারটি কন্যাকে কুলীনদের শ্রেষ্ঠ চারটি “মেলের” চারটি ঘরে পাত্রস্থ করতে হবে।   হিসেবটা খুব সোজা।  চারটি কুলীন ঘরে কুটুম্বিতা হলে সামাজিক বহিষ্কার এমনি-ই উঠে যাবে।  কৃষ্ণচন্দ্রের কথা মতোই কাজ হলো আর সামাজিক অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে এলেন ইন্দ্রনারায়ণ।  কাজ হয়ে যাওয়ার পর নবদ্বীপ অধিপতি দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণের কাছে তৈলবট চাইলেন।  তৈলবট অর্থাৎ স্মার্ত পন্ডিতরা সামাজিকতা সংক্রান্ত ব্যবস্থা দেওয়ার জন্য যে অর্থ নিতেন।  জানেন, কৃষ্ণচন্দ্রকে দেওয়া সেই তৈলবট কী ছিল? একজন প্রতিভাবান কবির অভাবে কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর নবরত্ন সভা সাজাতে পারছিলেন না।  ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর আশ্রয়ে থাকা এক নবীন প্রতিভার মধ্যে কৃষ্ণচন্দ্র খুঁজে পেলেন তাঁর সেই রত্ন।  তৈলবট হিসাবে কবি-কে চেয়ে নিলেন ইন্দ্রনারায়ণের আশ্রয় থেকে।  নিয়ে গেলেন নিজের রাজধানী। সাজালেন তাঁর নবরত্নের সভা।  এই কবি-ই পরে লিখলেন অন্নদামঙ্গল আর উপাধি পাবেন রায়গুণাকর। কবি ভারতচন্দ্রের সঙ্গে কৃষ্ণচন্দ্রের আসনও পাকা হলো সাহিত্যের ইতিহাসে।   

কলকাতা তথা বাংলার সামাজিক ইতিহাস চর্চায় যোগেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায় একটি উল্লেখযোগ্য নাম।   তাঁর “স্মৃতিতে সেকাল” ছাড়াও বিভিন্ন সাময়িক পত্রে বিভিন্ন লেখা পুরোনো সমাজের অনুপুঙ্খ ছবি আমাদের সামনে তুলে ধরে। মূলত চন্দননগর নিবাসী যোগেন্দ্র কুমার, ১৮৮৮ সালে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় জনপ্রবাদমূলক আখ্যান হিসাবে একটি লেখা প্রকাশ করেন। নাম “তৈলবট”।  আগের গল্পটি সেই লেখার সংক্ষিপ্তরূপ। 

এই যে স্মৃতি শাস্ত্রের পন্ডিত ও নবদ্বীপের ব্যবস্থাশাসন  কথা বলা হলো, একসময় হিন্দু বাঙালির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমস্ত  সামাজিক জীবনের  সুতো বাঁধা থাকতো এঁদের হাতে।  স্মার্ত রঘুনন্দনের নাম এই শাস্ত্রে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।   তাঁর প্রণয়ন করা অষ্টবিংশতিতত্বের ব্যবস্থা অনুসারে আজ পাঁচশ’ বছর ধরে হিন্দু বাঙালির সামাজিক ও ধর্মীয় আচার নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। [i]

আমরা যে সময়ের কথা বলছি, তার আগেই বাংলার সীমান্তে ইসলামের আবির্ভাব।  ক্রমে ইসলামিক শাসন কায়েম হলো দেশে।  সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার চরম অবস্থা। এই সামাজিক অবস্থার মধ্যে থেকেই হিন্দুদের বিভিন্ন উপাসনা ধারার অভ্যন্তরীণ নিয়ম তৈরি করার একটা তাগিদ শুরু হয় সেই সময়ে। রঘুনন্দনের কাছাকাছি সময়ে কুলুকভট্ট নামে এক বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ কাশীতে মনুসংহিতার টিকা রচনা করেন।  রঘুনন্দন ও কুলুকভট্ট যখন স্মৃতিব্যবস্থার ভিত রাখছেন, সেই সময় রূপ গোস্বামী সনাতন গোস্বামী ইত্যাদি বৈষ্ণব নেতারা তাঁদের মত ও পথ নির্দিষ্ট করছেন।  এরপরেই কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের আবির্ভাব হবে এবং শাক্ত আরাধনার সুব্যবস্থা করবেন।

এর মধ্যে জাতিগত পার্থক্য ও ধর্মস্বাতন্ত্র নির্ণয় নিয়ে বিবাদ অশান্তি লেগেই থাকতো।  যেহেতু দেশের রাজারা মুসলমান ও স্থানীয় সামাজিক ব্যবস্থা সম্পর্কে খুব ওয়াকিবহাল নন, এই সব ঝামেলায় মুসলমান সর্দারদের সিদ্ধান্ত দেওয়া থেকে অব্যাহতির জন্য আলাদা “জাতিমালা কাছারি” স্থাপন করা হয়।   কুলগ্রন্থে লেখা আছে যে দত্তখাস নামে একজন মন্ত্রী এই জাতিমালা কাছারির বিচারক ছিলেন এবং তাঁর সেই বিচারসভাতেই রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের ৫৭তম সমীকরণ হয়েছিল।[ii]

ভারতের অন্য অংশের থেকে বাংলার বর্ণভেদের ইতিহাস আরও জটিল। সেই জটিল বর্ণভেদ ব্যবস্থা এই সব ঝামেলার মুলে।  জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে নানা কারণে। মূল চতুর্বর্ণ কাঠামোর বাইরেও বাঙালি হিন্দুর অসংখ্য জাতি ছিল আর ছিলেন আরও অনেক অনেক সংকর জাতি।  সকলকেই মূল কাঠামোর মধ্যে বাঁধার চেষ্টা ছিল শাস্ত্রকারদের। কখনো কোনো নির্দিষ্ট পেশার একদল মানুষ নিজেদের আগের বর্ণ থেকে আলাদা পরিচয়ে পরিচিত হয়েছেন। আবার কখনো স্থানীয় রাজনৈতিক কারণে একই বর্ণের দুটি আলাদা গোষ্ঠীর মধ্যে একদল নিচ ও অন্যদল উঁচু হিসাবে সামাজিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। এছাড়াও স্থানীয় স্তরে অভিজাত জমিদার শ্রেণী ও নব্য ব্যবসায়ী ধনিক শ্রেনীর মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন থেকেও প্রভাবিত হয়েছে বর্ণভেদের ইতিহাস।

নদীয়া নবদ্বীপের সংস্কৃতি কলকাতার সংস্কৃতিকে বহুলাংশে প্রভাবিত পড়েছে। এমনকি অনেক নদিয়ার সংস্কৃতি থেকে কলকাতার সংস্কৃতির উৎপত্তি বলেও লিখেছেন । খাওয়া দাওয়া, গান বাজনা নিয়ে অনেক উদাহরণ আছে। তাই সেই ধারায় জাতবিচার কেন্দ্রিক বিবাদও অচিরেই কলকাতায় জাঁকিয়ে বসলো। জাত নিয়ে বিবাদ আর সেই বিবাদ নিরসনের জন্য কাছারি বা আদালত স্থাপনের দৃষ্টান্ত হেস্টিংসের আমলেও দেখা গেলো।

এই ব্যবস্থার প্রসাদে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠলেন শাসকদের কাছের লোকেরা।  মহারাজ নবকৃষ্ণ দেব-কে বিচারপতি করে ১৭৭৬ সালে জাতিমালা কাছারি স্থাপিত হয় মহারাজার প্রাসাদের পেছনেই ।  হেস্টিংসের প্রশাসনে নবকৃষ্ণ যে কয়টি দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন, তার মধ্যে পুরোদস্তুর আদালত ছিল –  ২৪ পরগনার মাল আদালত বা রাজস্ব কোর্ট, ২৪ পরগনার তহশিল দপ্তর বা  কালেক্টরের কাছারি আর এই জাতিমালা কাছারি।[iii]

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জাত নিয়ে বিবাদ উপস্থিত হলে সাক্ষী সাবুদ সহ এখানেই মীমাংসা হতো সেই বিবাদের। মেয়র্স কোর্টে যেমন একজন প্রেসিডেন্ট (মেয়র) ও ৯ জন অল্ডারম্যান থাকতো, তেমন এই জাতিমালা কাছারিতেই থাকতেন একজন বিচারক ও কয়েকজন সাহায্যকারী বা assessor। প্রায় সব জাতের লোকদেরই  ব্রাহ্মণদের উপর রাগ থাকায় নবকৃষ্ণ প্রায় সারা জীবন এই আদালতের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।  মাঝে কাশিমবাজারের কৃষ্ণকান্ত নন্দীও বার দু’য়েক এই কাছারির বিচারক হয়েছিলেন। বলা হয় যে সেই সময় কান্তবাবু নিজের প্রভাব খাটিয়ে ও নবদ্বীপের পন্ডিতদের হাত করে, তেলি-কলুদের তাঁর স্বজাতি তেল ব্যবসায়ীদের উচ্চতর সামাজিক স্থান পাইয়ে দেন।[iv] 

নবকৃষ্ণের প্রাসাদের পেছন দিকের রাস্তাটির নাম কম্বুলিটোলা লেন। এই কাছারি ছিল সেই রাস্তার উপর । সেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রাস্তার একটি অংশ আজও “ওল্ড মেয়র্স কোর্ট” নামে পরিচিত।  আজ বাগবাজার টেলিফোন এক্সচেঞ্জ যে রাস্তায় অবস্থিত।

Abridged version of the article has been published in Anandabazar Patrika (17.03.2019)
https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/a-look-back-into-the-time-when-court-established-in-the-city-1.966930


[i] তৈলবট – জনপ্রবাদমূলক গল্প; যোগেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায় (বঙ্গদর্শন (অষ্টম সংখ্যা, সন- ১৮৮৮))

[ii] বিশ্বকোষ ঊনবিংশ খন্ড, নগেন্দ্রনাথ বসু

[iii] কলকাতা দর্পন-এর প্রথম খন্ড:  রাধারমণ মিত্র

[iv] বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য  সম্পাদিত  – ওয়েস্টবেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স, মুর্শিদাবাদ, কলকাতা ১৯৭৯,  পৃ ৭৬